"No Smoking" (২০০৭) – ধোঁয়ার চাদরে জড়ানো অস্তিত্বের এক অন্তহীন অন্বেষণ

"No Smoking" (২০০৭) – ধোঁয়ার চাদরে জড়ানো অস্তিত্বের এক অন্তহীন অন্বেষণ

একটি ঘর। আলো কম। দেওয়ালে ধোঁয়ার ধাক্কা। নিঃশব্দে জমে থাকা এক অদ্ভুত আতঙ্ক, যেন চোখের কোনে লুকিয়ে থাকা দুঃস্বপ্নটা ধীরে ধীরে চুঁইয়ে পড়ছে হৃদয়ে। দরজার ফাঁক দিয়ে আসে এক চাপা হাসি, অর্থহীন, অথচ ব্যথাবোধ জাগানো। এই তো, "No Smoking"। সিনেমা নয়, যেন এক দমবন্ধ মানসিক স্নানঘর, যেখানে প্রত্যেক নিঃশ্বাসে মিশে থাকে প্রশ্ন ‘আমি কে?’

 

কে এই K?

 

সেই মানুষ, যে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। একজন অবসেসিভ ধূমপায়ী এতটাই আত্মমগ্ন যে চারপাশের ভালবাসা, অনুরোধ, এমনকি ঘৃণাও যেন তার কাছে ব্যঙ্গাত্মক হয়ে ওঠে। স্ত্রী বাঁচাতে চায় তাকে, সমাজ ত্যাগ করতে চায়, কিন্তু তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনি তোলে, “আমার শরীর, আমার ইচ্ছা!” সাহস? না কি আত্মঘাতী নির্বুদ্ধিতা?

 

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই অহংকার তাকে কোথায় নিয়ে যাবে? ধোঁয়া কি কেবল উবে যাওয়া কোনো বস্তু, না কি এক অদৃশ্য জাল, যা তাকে টেনে নিয়ে যাবে নিজেরই অস্তিত্বহীনতার দিকে?

 

আশ্রম, “প্রায়শ্চিত্ত আশ্রম”

 

এ যেন মুক্তির প্রতিশ্রুতি নয়, বরং আত্মার সমর্পণের এক নির্মম চুক্তি। কাশ্যপ তার লেখনীতে তৈরি করেছেন এক মহাভারতীয় গোলকধাঁধা, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা প্রতিটি মুহূর্তে ঘোলাটে হয়ে ওঠে। দর্শককে তিনি দেন না কোনো জবাব, তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, বারবার, নির্মমভাবে।

 

প্রতিটি দৃশ্য যেন একটি ধাক্কা

 

আলো নয়, যেন আঁধারের ফাঁদ। সংগীত, যেন মস্তিষ্কের ভিতর কাঁপিয়ে দিয়ে ওঠা এক কম্পন। পোশাকগুলো, চলনগুলো, সংলাপ, সবকিছুতেই যেন এক অস্বস্তিকর আর্টিফ্যাক্ট। প্রতিটা মুহূর্ত দর্শককে ঠেলে দেয় চিন্তার আরেক স্তরে, এটা কি শুধুই নেশা ছাড়ার গল্প, না কি আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত বিনাশ?

 

K, একেবারে অন্যরকম। তার মুখে নেই বীরত্ব, চোখে নেই প্রেমিকের উষ্ণতা। সে যেন জীবনের কাছে হেরে যাওয়া একজন, যার জয়-পরাজয় দুটোই ধোঁয়ায় মিশে গেছে। এই চরিত্রের মধ্যে সে নিজেকে খুলে দিয়েছে, পোড়া ছাইয়ের মতো।

 

এক লোক বলে ওঠে, “সিগারেট খাও তো? একদিন নিজের ছায়াও তোমার শত্রু হয়ে উঠবে।”

 

শুধু সংলাপ নয়, যেন দর্শকের আত্মার উপর ছুরি চালানো এক অনুভূতি। পরাবাস্তব মুহূর্তগুলো যেন আমাদের মানসিক পাঁজরে ঠকঠক করে নাড়া দেয়।

 

এই সিনেমা বলতে চায় না, “ধূমপান ক্ষতিকর।” সেটা তো বিজ্ঞাপনের কাজ। “No Smoking” আমাদের বলে, এই আসক্তি, এই অনিয়ন্ত্রিত ইচ্ছা, কিভাবে ধীরে ধীরে চুষে নেয় একজন মানুষের আত্মপরিচয়। সম্পর্ক, বিশ্বাস, ভালবাসা, সব মুছে যায় ধোঁয়ার চিহ্নে।

 

শেষ দৃশ্যটি, আয়নার সামনে K, কিন্তু আয়নায় তার প্রতিফলন নেই। শুধু ধোঁয়া।

 

এ যেন এক সারাংশ, এক চরম সত্য—তুমি হয়তো আছো, কিন্তু তুমি আর তুমি নও। নিজেকেই চিনতে পারো না। এবং এই অচেনা হয়ে যাওয়াটাই, বোধহয় সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।




“No Smoking” একটি চলচ্চিত্র নয়, এ এক মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা, যেখানে পথও কুয়াশাচ্ছন্ন, আর গন্তব্যও প্রশ্নবিদ্ধ।

 

জীবন যদি এক দীর্ঘ শ্বাস হয়, তবে এই সিনেমা যেন তার ভিতর জমে থাকা ধোঁয়ার দলা, অস্বস্তিকর, দমনকারী, কিন্তু ভীষণভাবে বাস্তব।

 

লেখক,

সাদি রেজা।