ধ্যানে জ্ঞান

ধ্যানে জ্ঞান

"সুস্থ দেহ সুন্দর মন, কর্মব্যস্ত সুখী জীবন।"

অর্থাৎ সুখী হতে হলে কর্মব্যস্ত হতে হবে এবং কর্মে মন দিতে হলে সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজন। উল্লেখ্য, এই স্বাস্থ্য হতে হবে আপনার শারীরিক স্বাস্থ্য ঠিক একইভাবে মানসিক স্বাস্থ্য। আমাদের দেশে শারীরিক সুস্থতাকে বিশেষ বিবেচনায় রাখলেও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আমরা এখনো তেমন যত্নশীল হয়ে উঠিনি। তার প্রধান কারণ হিসেবে আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে দায়ী বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত দিক থেকে প্রতিটি মানুষের উচিত তার মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া।

একটু ভাবুন, আপনি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত, খাবার খুঁজছেন কিন্তু ওই মুহূর্তে কোথাও খাবার খুঁজে পাচ্ছেন না। আপনি নিশ্চয়ই তখন ক্ষুধার জ্বালায় উদরপীড়ায় ভুগবেন? এবং এই ক্ষুধা কি দীর্ঘদিন লালন করা সম্ভব? মেজাজ খিটখিটে হবে আশেপাশের সব মানুষের উপর রাগ হবে।

এবার ভাবুন, আপনি নিয়মিত খাবার খেতে পারছেন। ক্ষুধার কষ্ট অনুভবই করতে হয়না। তবুও আপনার মেজাজ কেন খিটখিটে! অফিস থেকে ফিরে পরিবারের সাথে রাগ করছেন। কেন রাগ করছেন নিজেকে প্রশ্ন করলে উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। সহজ কোনো ঘটনাকে কঠিন মনে হচ্ছে। অথচ দুইদিন বাদেই তা আবার আপনার নিকট সহজ বলে পরিণত হচ্ছে যা আসলে পূর্বে থেকেই সহজ ছিলো। বন্ধুদের সাথে অহেতুক মনোমালিন্য হচ্ছে। তাহলে বুঝতে হবে আপনি একজন ক্ষুধার্ত ব্যাক্তি। আপনার মস্তিষ্ক খাবার চায়, তাকে খাবার দিন। কেনোনা মস্তিষ্কই আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়ার দায়িত্বে রত। তাই তাকে পুষ্ট রাখা জরুরি, তুষ্ট রাখা জরুরি।

আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে মস্তিষ্ক কোন ধরণের খাবার খায়? মস্তিষ্ক সব খাবারই খায়। এই যেমন আপনি বাসায় ফেরার পথে যানবাহনের হর্নের শব্দ শুনছেন এটিও একটি খাবার তবে তা দূষিত খাবার।

এই পর্যায়ে আপনার প্রশ্নটি বোধহয় এমন, মস্তিষ্ককে কোন ধরণের খাবার দেয়া উচিত?

তাহলে অবশ্যই আপনাকে গাড়ির হর্নের পরিবর্তে পাখির সুমধুর ডাক শুনতে হবে। অথবা টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ কিংবা নদীর ঢেউ এর ধ্বনি। এতো কিছুর জন্য ইচ্ছে হচ্ছে ঘরছাড়া হয়ে প্রকৃতিতে মিশে যেতে। কিন্তু তার তো সুযোগ নেই। একদম শুরুতেই বলা হয়েছে কর্মব্যস্ত সুখী জীবন। কর্মের তাগিদে যেহেতু আপনি প্র্যাত্যাহিক জীবনে প্রকৃতিকে অনুভব করতে পারছেনই না। তবে তার বিকল্প কী হতে পারে?

বলছিলাম মেডিটেশন বা চিন্তনের কথা। মেডিটেশন শব্দটির সাথে আমরা সকলেই মোটামুটি পরিচিত। মেডিটেশন বা চিন্তন একটি প্রাচীন প্রথা হলেও বর্তমান সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে সুস্থ রাখতে মেডিটেশন একটি জনপ্রিয় শব্দ। নিয়মিত মেডিটেশনে ব্রেনের নিউরনগুলোর মাঝে বিস্ময়কর সংযোগ ঘটে, শরীরও শিথিল হয়।

মেডিটেশন কেন করবেন বা এর উপকারিতা?

ড. হার্বাট বেনসনের দীর্ঘদিনের গবেষণামতে, শরীর শিথিল হলে হার্টবিট, উচ্চরক্তচাপ ও দেহে ব্যাথার অনুভূতি কমে। দমের গতি ধীর হয়, দেহে অক্সিজেন গ্রহণের পরিমাণ কমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। ফলশ্রুতিতে শরীর নিজ থেকেই রোগমুক্তি প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে তোলে। এছাড়াও মেডিটেশন,

❐ শরীর শিথিল করার মাধ্যমে প্রশান্তি এনে দেয়। শরীর শিথিল হওয়ার প্রথম প্রাপ্তিই হলো প্রশান্তি।

❐ প্রশান্তি আনয়নের মাধ্যমে রাগ - ক্ষোভ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি আগের তুলনায় কমতে থাকে।

❐ মেডিটেশন নির্দিষ্ট সময় ধরে করতে হয় যার ফলে ধৈর্য বাড়ে। এবং ধৈর্য বাড়ার ফলে রাগ আরও কমে যায়।

❐ মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, স্মৃতিশক্তি বাড়ে। ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা মনে রাখায় মেডিটেশন অগ্রগামী ভূমিকা পালনকারী।

❐ মানসিক ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। সারাদিনের ক্লান্তি অবসাদ দূর হয় মেডিটেশনের মাধ্যমে।

❐ হতাশাগ্রস্ত মানুষের জন্য মেডিটেশন সাইকোথেরাপির মত কাজ করে।

❐ ছাত্রজীবনে মেধাবিকাশের জন্য মেডিটেশন এর ভূমিকা ব্যাপক।

❐ মাইগ্রেনের ব্যাথা উপশমে নিয়মিত মেডিটেশন কার্যকরী ফল দেয়। এছাড়াও ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে মেডিটেশনের জুড়ি মেলা ভার।

❐ মেডিটেশনের মাধ্যমে মস্তিষ্ক আরাম পায় বিধায় অনিদ্রাজনিত সমস্যা কমে। এছাড়াও অনিদ্রার একটি প্রধান কারণ দুশ্চিন্তা। মেডিটেশনের মাধ্যমে দুশ্চিন্তাও দূর হয়।

মেডিটেশন বা চিন্তনের উপকারিতা জানার পর যদি মনে করেন এটি আপনার নিয়মিত চর্চায় রাখা জরুরী। তাহলে জেনে নিন মেডিটেশন কীভাবে করবেন? কখন করবেন?

❐ মেডিটেশনের জন্য ভোর এর দিক টা সবথেকে বেশি উপযোগী। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিরিবিলি পরিবেশে বসে আপনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধ্যানমগ্ন হতে পারেন। নির্দিষ্ট সময় হতে পারে (১৫ মিনিট, ৩০ মিনিট কিংবা আপনার প্রয়োজন মোতাবেক সময়)। বলে রাখা জরুরী, ধ্যানে পূর্ণ মনযোগ দিতে আপনি সফট মিউজিক বাজাতে পারেন।

❐ মেডিটেশনের জন্য হালকা রং এর পোশাক পরিধান করুন। মনে রাখতে হবে এটি আপনার মস্তিষ্ককে আরাম দানের একটি প্রক্রিয়া। হালকা রং এর পোশাক পরিধানে আমরা স্বভাবতই আরাম অনুভব করি। হালকা রং চোখেও শান্তি আনে।

❐ মেডিটেশনের জন্য বসার নিয়মও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন আসন সম্পর্কে অবগত হতে হবে।যেমন; পদ্মাসন, সুখাসন, সিদ্ধাসন ইত্যাদি। এসব আসনের নিয়ম আপনি ইউটিউবে পেতে পারেন। এছাড়াও আপনি যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন সেভাবে বসতে পারেন তবে ধ্যানের সাথে প্রাসঙ্গিক রাখা জরুরী।

❐ প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে ধ্যান করলে তা সবথেকে বেশি কার্যকরী ফল দেয়। তাই সম্ভব হলে গাছপালা ঘেরা পার্কে বসে ধ্যানমগ্ন হতে পারেন।

❐ স্বাচ্ছন্দ্যমতো বসার পর চোখ বুজে একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর মনোনিবেশ করুন, প্রকৃতিকে কল্পনায় আনুন। কল্পনা করুন বৃষ্টিতে ভিজছেন কিংবা পাহাড়ে বসে আছেন মেঘের ঝাপটা আসছে।পাশাপাশি ধীরে ধীরে শ্বাসকার্য চালু রাখুন। শ্বাস উপরের দিকে টেনে ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এভাবে কয়েকবার করতেই থাকুন।

❐ নিয়মিত ভোরে, সম্ভব না হলে সুবিধামতো সময়ে মেডিটেশন আপনার দৈনিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রাখুন।

নাফিসা তাবাসুম,
কন্টেন্ট রাইটার, 
রাইটার্স ক্লাব বিডি।