বসন্তের শেষে উষ্ণতার বার্তা নিয়ে এসেছে গ্রীষ্ম। তবে উষ্ণতা যেন রূপ নিচ্ছে দাবদাহে। প্রকৃতি হঠাৎ এতো নিষ্ঠুর কেন? রোদ যেন হয়ে উঠেছে বহ্নিশিখা। এই বহ্নিশিখায় ষড়ঋতুর ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ যেন পুড়ে যাচ্ছে, ছাই হয়ে যাচ্ছে, বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। মানুষ যখন একটু শীতল ছায়া, একটু লিলুয়া বাতাসের দিকে পথ চেয়ে বসে, তখন চোখে পড়ে প্রকৃতিতে একটি রঙের মারাত্মক ঘাটতি। সবুজ রঙ! আর তাই যেন লিলুয়া বাতাস 'হিট ওয়েভে' পরিণত হয়ে অভিশপ্ত করে তুলছে জনজীবন।
● কী এই 'হিটওয়েভ'?
'হিট ওয়েভ' হচ্ছে এমন একটি পরিস্থিতি, যখন দীর্ঘদিন যাবত বাতাসের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশ সহ অনেক স্থানেই বর্তমানে 'হিট ওয়েভ' শব্দটি রাজ করে চলছে। এমনকি প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই হিট ওয়েভ। গত ২০ এপ্রিল থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত হিট স্ট্রোকে সারাদেশে প্রায় ৩৩ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়,১ জানুয়ারি থেকে ১৭ই এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে ৩০ জনের মৃত্যু ঘটে হিট স্ট্রোকে। এ যেন এক যমদূত এসে কেড়ে নিচ্ছে স্বাদের প্রাণ।
● কোন বিষয়গুলো হতে পারে এই হিট ওয়েভের কারণ?
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে তাপতরঙ্গ তৈরি হয়। এবং যখন এটি বায়ুমণ্ডলে একটি শক্তিশালী উচ্চ-চাপ সৃষ্টি করে তখন কিছু কিছু এলাকায় এই তাপের প্রবাহ বেশ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে। তাছাড়া শীতকালের তুলনায় গ্রীষ্ম ঋতুর আবহাওয়া ধীরগতিতে পরিবর্তন হয় বিধায় বায়ুমন্ডলে তাপ প্রবাহের এই উচ্চ চাপও বেশ ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। এবং এই তাপ প্রবাহ মেঘ গঠনে বাধা দেয়, যার ফলে বৃষ্টির সম্ভাবনা কমে আসে। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া ও প্রকৃতিতে তার স্থিরতা ধরে রাখার পেছনে মূখ্য একটি কারণ হচ্ছে বনাঞ্চল ও গাছপালার অভাব। গাছপালা ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে প্রকৃতিতে অক্সিজেনের ভারসাম্য বজায় রাখে। গাছপালা কমে গেলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পায় যা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জন্য প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী। অতঃপর প্রকৃতিতে যমদূত হিসেবে আগমন ঘটে হিট ওয়েভেরভের।
● বাংলাদেশে হিট ওয়েভের উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ:
❐ এ দেশের আয়তন অনুসারে বনভূমি থাকা আবশ্যক ২৫ শতাংশ। অথচ বর্তমানে বনভূমি রয়েছে ১৫ শতাংশ প্রায়।
❐ ২০০১- ২০২০ পর্যন্ত এ দেশে বনভূমি উজাড় হয়েছে ৯৪ হাজার একর। তন্মোধ্যে ২০২০ সালেই ৫০ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে।
❐ বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট অর্থাৎ এ দেশের রক্ষাকবচ 'সুন্দরবন' প্রায় ধ্বংসের পথে। ২০০৯ সালে এর আয়তন ছিলো ৬ হাজার একর, যার বর্তমান আয়তন ৪ হাজার একরে নেমে এসেছে।
❐ গাজীপুর ও টাঙ্গাইলে প্রায় ৬০ হাজার একর বনভূমি রিসোর্ট স্বত্ত্বাধিকারীদের দখলে।
● হিট ওয়েভের মোকাবিলায় নিজেদের করণীয়:
❐ হিট ওয়েভ চলাকালীন সময়ে শরীরের আদ্রতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন।
❐ দোকানের প্রক্রিয়াজাত কোল্ড ড্রিংকসের পরিবর্তে ঘরে তৈরি বিভিন্ন ফলের শরবত পান করুন।
❐ গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। দিনের বেলা বাইরে যাওয়ার সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি, ছাতা, ও সম্ভব হলে পোর্টেবল ফ্যান সঙ্গে রাখুন।
❐ শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে দিনে অন্তত দুইবার গোসল করুন।
● এই তীব্র গরমে যেসকল কাজ করবেন না:
❐ অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পান করা যাবে না। এতে করে পাকস্থলীর রক্তনালী সংকোচিত হয়ে যায়, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
❐ বাইরে থেকে ঘরে ফিরেই গোসল করা যাবেনা। ৫ থেকে ১০ মিনিট ঘরের তাপমাত্রার সাথে শরীরের তাপমাত্রার সমন্বয় হওয়ার পরে তবেই গোসলে যাবেন।
❐ অতিরিক্ত গরম খাবার ও ভাজাপোড়া একেবারেই পরিত্যাগ করুন। বিকল্পে ফ্রুট সালাদ, ভেজিটেবল সালাদ তৈরি করে খেতে পারেন।
● হিট ওয়েভ প্রতিরোধে প্রকৃতির জন্য যা করবেন :
❐ হিট ওয়েভ সম্পর্কিত আজকের এই আলোচনা পড়ার পর পাঠকের নিকট আবেদন থাকবে আপনার বারান্দায়, ছাদে কিংবা বাড়ির আঙিনায় উপযুক্ত স্থানে অন্তত একটি গাছ হলেও রোপণ করবেন।
❐ বর্ষাকালে বেশি বেশি গাছ রোপণ করুন, এতে করে গাছের যত্নভার প্রকৃতিই নিতে পারবে। বর্ষাকাল ব্যাতিরেকেও বছরের প্রত্যেকটা সময়-ই কোনো না কোনো গাছের জন্য উপযুক্ত। তাই বর্তমান সময় সাপেক্ষে এই ঋতুর কিছু গাছ রোপণ করতে পারেন।
❐ গাছ রোপণের জায়গায় সীমাবদ্ধতা থাকলে আপনার শোবার ঘর কিংবা বসার ঘরে রাখতে পারেন আকর্ষণীয় কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট। এর মধ্যে 'স্নেকপ্ল্যান্ট' বেশ জনপ্রিয় যা প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে এমনকি রাতেও এ গাছের অক্সিজেন সরবরাহ কার্য সচল থাকে।
অতঃপর গাছ লাগান, গাছের যত্ন নিন, পৃথিবীর যত্ন নিন।
নাফিসা তাবাসুম,
কনটেন্ট রাইটার,
রাইটার্স ক্লাব বিডি।
