একটু ভাবুন দুই বর্ণের একটি চমকপ্রদ শব্দের কথা। যা আপনাকে এখন একটি সমুদ্রের নীল জলরাশির কাছে বসে থাকতে অনুভব করাতে পারে। কিংবা আপনার মনে হতে পারে আপনি হাঁটছেন কোনো জনমানবহীন নৌসর্গিক অঞ্চলে। শব্দটি চাইলেই আপনাকে গাছগাছালি ঘেরা, ফুলের গন্ধে মাতানো আপনার কল্পনার সেই দুই তলা বাড়ির এক বেলকনিতে নিয়ে যেতে পারে। যেখানে আপনি বেলার শেষদিকের এক ফালি রোদে বসে চা পান করছেন। এতক্ষণে বোধ হয় শব্দটি আপনার কাছে প্রতীক্ষিত হয়ে উঠেছে। ঠিক ধরেছেন, বলছিলাম দুই বর্ণের শব্দ 'বই' এর কথা। যা আপনার মনের খোরাক জোগাতে সবথেকে বেশি কার্যকরি। তবে তার জন্য আপনার মনকে প্রথমে ক্ষুধার্ত হতে হবে।
আজ সম্পূর্ণ আলোচনা জুড়েই থাকবে বই, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার উপায় এবং বই পড়ার বিভিন্ন উপকারিতা।
মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষের পাঠ অভ্যাসের তথ্য পাওয়া যায়। মানুষ বই পড়ে মনের খোরাকের জন্য, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য, জ্ঞানের আলোয় নিজেকে দীপ্তিময় করে তোলার জন্য। বই পড়া কারোও কারোও প্রধান শখও বটে। কিন্তু কিভাবে মানুষ অনেক সময় ধরে নিজেকে বই পড়ায় নিমজ্জিত রাখতে পারে ভাবছেন বোধহয়। এখানে প্রধান কারণ হলো মনযোগ। আপনি যখন কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে সক্ষম হবেন আপনার মস্তিষ্ক তখন আনন্দ পাবে এবং আপনাকে বলবে "চালিয়ে যাও"। ঠিক এভাবেই বই পোকা-রা ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়তে পারে। পৃথিবীর সফলতম মানুষগুলো তাদের জ্ঞানের পিপাসা ঠিক এভাবেই মিটিয়ে থাকতেন। ওয়ারেন বাফেট (Warren Buffett) তাঁর পেশা জীবনের শুরুতে প্রতিদিন ৬০০-১০০০ পৃষ্ঠা নিয়মিত পাঠ করতেন। বিল গেটস (Bill Gates) প্রতি বছর ৫০ টি বই শেষ করেন। মার্ক কিউবান (Mark Cuban) প্রতিদিন ৩ ঘন্টা বই পড়েন। ইলন মাস্ক (Elon Mask) তার রকেট বিদ্যা বই পড়ার মাধ্যমেই অর্জন করেছেন।
আমাদের প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর মতে, "যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য সে জাতি ধনের ভাঁড়েও ভবানী।" অতঃপর বই পড়া যেখানে জ্ঞানর্জনের প্রধান উপায়। তাহলে ভাবুন বই পড়ার গুরুত্ব ঠিক কী পরিমাণ?
জেনে নেয়া যাক বই পড়ার বিভিন্ন উপকারিতা অর্থাৎ কেন আপনি বই পড়বেন!! প্রশ্নটি বরং হওয়া উচিত কেন আপনি বই পড়বেন না?!
'বই পড়া'-র অন্যতম উপকারিতা হলো এটি মানসিক উত্তেজনা বা চাপ কমায়। আপনার শরীরের মতো মস্তিষ্কেরও ব্যায়ামের প্রয়োজন হয়। বই আপনার মস্তিষ্কের ব্যায়ামের কাজ খুব সহজেই সাধন করে। মস্তিষ্ককে আপনার শরীরের একটি পেশি হিসেবে বিবেচনা করে নিয়মিত এই ব্যায়ামের মাধ্যমে তাকে শক্তিশালী করে তুলতে পারেন।
বই পড়ে শব্দভান্ডারে নতুন অনেক শব্দের সংগ্রহ বৃদ্ধি করা যায়। যা আপনার শব্দচয়নকে করে তুলবে অনেক নান্দনিক। এমনকি তা আপনার পরীক্ষার খাতাতেও বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে।
'বই পড়া' স্মৃতি শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। আপনার ভালো লাগা কোনো গল্পের চরিত্রের সাথে যখন বাস্তবের কাউকে মিলে যেতে দেখবেন। তাৎক্ষণিক আপনি উক্ত চরিত্রসমূহকে স্মরণ করতে পারবেন।
'বই পড়া'-র আরেকটি মজাদার বিষয় হচ্ছে; এর মাধ্যমে আপনি অন্যের জ্ঞান থেকে খুব সহজেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।
আপনি যখন বিষন্নতায় ভুগবেন, হাতের কাছের একটি বই নিয়ে পড়া শুরু করুন। ভালো লাগতে শুরু হবে এবং মানসিক প্রশান্তি আসবে। যার দরুন বইকে "মেডিটেশন ফর সোল (Mediation for Soul)" বলে বিবেচনা করা যায়।
'বই পড়া' মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। যার ফলে পাঠ্যপুস্তকের বিভিন্ন টপিকেও মনোযোগ প্রদানে পারদর্শী হয়ে ওঠা যায়।
'বই পড়া' কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ আপনি আপনার রিডিং টেবিলে বসে থাকাকালীন চাইলেই পাহাড়ি কোনো ঝর্ণার পানিতে গা ভিজিয়ে আসতে পারবেন বই পড়ার মাধ্যমে।
এবার আসা যাক, আপনি কিভাবে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
প্রথমে আপনি মনস্থির করে ফেলুন আজ থেকে প্রতিদিন আপনি ৩০ মিনিট বই পড়বেন।
'বই পড়া একটি ভালো কাজ' এই ধারণা পোষণ করুন, এতে করে আপনার মন আপনাকে একটি ভালো কাজের জন্য উৎসাহিত করবে। এবং একবার আনন্দ পেলে বারবার আপনার এই ভালো কাজটি করতে ইচ্ছে হবে।
শুরুতে বই সম্পর্কে আপনার ধারণা কম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে আশেপাশের বন্ধুদের থেকে ধারণা কুড়াতে পারেন কিংবা বইয়ের মোড়কীকরণের মাধ্যমে নিজেকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করুন। এই ধাপে "ডোন্ট জাজ আ বুক বাই ইট'স কভার" সুপ্রেমেসিতে বিশ্বাস না করাই ভালো। কারণ একজন লেখক তার বই এর প্রচ্ছদে বইটির মূলকথা তুলে ধরার চেষ্টা করে। তাই আপনি প্রথম পর্যায়ে প্রচ্ছদের মাধ্যমে আকৃষ্ট হলে বইটি সংগ্রহ করে ফেলতে পারেন।
শখের কাজ করতে আমরা সবাই ভালোবাসি।
'বই পড়া'কে আপনি আপনার প্রিয় শখের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন যেন বই পড়ার অভ্যাস টা বহাল থাকে।
আপনি বাইরে কোথাও যাওয়ার আগে অবশ্যই একটি বই সাথে নিয়ে বের হবেন। যেন ট্রাফিক জ্যামের মতো বিশ্রী সময়ে আপনি হঠাৎ বইয়ের পাতা উল্টে পাল্টে দেখতে গেলেও দুই-একটি সুন্দর বাক্য পড়া হয়ে যায়। এবং এর থেকেই শুরু হবে আপনার আগ্রহ।
আপনার বন্ধু নির্বাচনের সময় অবশ্যই বই পড়ুয়া, সৃজনশীল, চিন্ত মননশীল ব্যাক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। এতে করে আপনি নিজেকে প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করতে সক্ষম হবেন।
আপনার কোনো ঘটনা কিংবা স্থান সম্পর্কে বিশেষ কৌতুহল থাকলে অন্যান্য উপায়ে তা জানার বদৌলতে সে বিষয়ের উপর বই সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন। মনে করুন আপনি আপনার প্রিয় স্থানটি ঘুরে আসতে পারবেন বইয়ের পাতায় ভর করে।
আপনি ভাবুন, বই পড়ে আপনি নিজের মতো করে দৃশ্যপট আঁকতে পারছেন। মুভি কিংবা ভিডিওগ্রাফি আপনার মস্তিষ্ককে এই সুযোগ দিবে না।
আমরা সবাই নিজেদের ব্যাক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে বেশ পছন্দ করি। 'বই পড়া' কে আপনি ব্যাক্তিত্বের অংশ মনে করতে পারেন। যা আপনার ব্যাক্তিত্বে এনে দিতে পারে এক ভিন্ন মাত্রা।
অবসর সময়ে লাইব্রেরি থেকে ঘুরে আসাও বই পড়ার অভ্যাসের জন্য খুব প্রভাবশালী একটি কাজ। লাইব্রেরি কে গুনীজনরা হাসপাতালের সাথে তুলনা করেন। আপনি যেমন অসুখ হলে, রোগ সারাতে চিকিৎসা কেন্দ্রে যান। ঠিক তেমনি লাইব্রেরি আপনার মনের জন্য চিকিৎসা কেন্দ্রের অনুরূপ। তাই সুযোগ পেলেই লাইব্রেরি থেকে ঘুরে আসুন।
বই পড়ে আপনি বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে, কারো সহযোগিতা ছাড়া নিজেই অনেক কিছু শিখতে পারেন বলে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হলেও বই পড়ুন। কেনোনা প্রমথ চৌধুরীর মতে " সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।"
অতঃপর, পৃথিবী বইয়ের হোক। বইগুলো হোক আমাদের মনের ক্ষুধা মেটানোর প্রধান উপকরণ।
নাফিসা তাবাসুম,
কনটেন্ট রাইটার,
রাইটার্স ক্লাব বিডি।
