পুরোনো বাড়িটা ভেঙে ডেভোলোপারের কাছে দেবে বলে হুলুস্থুল আয়োজনে তোড়জোড় চলছে বিগত কয়েকদিন ধরে। অরণী দত্তা, একজন প্রৌঢ়া, স্মৃতিকাতুরে নারী। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর পুরো বাড়ির মালিক তিনিই। তবে মাঝ বয়সে এসে বাড়িটার দেখভাল আর ভালো করে করতে পারছেন না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফ্লাট করবেন, নিজের জন্য চারটা রেখে বাকী চারটা বিক্রি করে দেবেন। আর যা অর্থ আসবে কোনো হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যায় করবেন।
বাড়ির সব ঘরের আসবাবপত্র মেরামত, পরিষ্কার, রং বদলিয়েছেন ইতোমধ্যে। এবার উপস্থিত হলেন তার কিশোরী বয়সের স্মৃতির আঁতুড় ঘরে; যেখানের প্রতিটি আসবাবপত্রে লুকিয়ে আছে অজস্র স্মৃতি, গল্প, অনুভূতি। একে একে সব আসবাব পরিষ্কার করতে করতে চোখ পড়লো আলমারির উপরের বস্তাবন্দী কতোগুলো বই-ডায়েরীর উপর। তার সহযোগি নোটনকে দিয়ে সেই বস্তাবন্দী বই-ডায়েরী নামিয়ে সে নিজে পর্যবেক্ষণ করে প্রতিটা বই-ডায়েরী ছুঁয়ে, হাত বুলিয়ে দেখতে লাগলো। দেখতে দেখতে একটি হাতের লেখা চিরকুট আর একটি ফটোগ্রাফ ও একটি শুকনো বেলী ফুলের মালা চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো তার। চিরকুটে লেখা ছিলো “অরণী, আমার মহারাণী। আমাকে যত্নে রাখবে জানি, তাই তো ছবিটা দিলাম। আমার মতো ছবিটিরও যত্ন নিও। মনে রেখো, ভালোবাসি। - তোমার মহারাজা ”
চিরকুটটি পড়ে কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙে নোটনকে বিদায় দিলেন। অতঃপর কামড়ার দরজাটা বন্ধ করে ফটোগ্রাফ আর সেই চিরকুটটা হাতে নিয়ে জানালার নিকটে গেলেন। তারপর আকাশের পানে চেয়ে বলতে আরম্ভ করলেন, “তোমার সাথে আমার কোনো বিচ্ছেদ হয়নি, তবুও আমাদের মাঝে এক আকাশ সমপরিমাণ দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিলো। যার ফলস্বরূপ দেখা-সাক্ষাৎ কোনোটায় আর হয়ে ওঠেনি আমাদের। তোমাকে যে সবটুকু ভুলে গিয়েছিলাম কিংবা একবারের জন্যেও তোমার তুমিটাকে আমার মনে পড়েনি ব্যাপারটা ঠিক তেমনও নয়। মিথ্যে বলবো না, তোমাকে মনে পড়া মাত্র ভুলে যাওয়ার ব্যার্থ চেষ্টাও করেছিলাম। তবুও এখনো তোমায় প্রচন্ডরকমে মনে পড়ে।
বহু বছর গড়িয়ে সময় বদলেছে, আমি ষোড়শী থেকে এখন চল্লিশের ঘরে। তবুও তোমায় মনে রেখেছি, মনে থেকে গেছো কোনো একটা কোণায়। সেদিন আচমকা তোমায় দেখলাম, তোমায় দেখামাত্র দু-চোখের পাপড়িগুলো ভারী হয়ে গেলো, চোখের মাঝে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অশ্রু টলমল করতে আরম্ভ করলো। এটা কেমন অনুভূতি এতো বছর পরেও উত্তর খুঁজতে সন্ধিহান হই।
বিচ্ছেদ হয়নি তোমার-আমার তবুও একটা দূরত্ব আমাদের করেছে দুই ভিন্ন পথের পথিক। তবুও তুমি আমার বড্ড আপন মানুষ, বড্ড কাছের কেউ। তোমায় যে নিজেরই কোনো অস্তিত্ব ভাবতাম এর জন্যই হয়তো তুমি মিশে আছো আমার প্রতিটা রন্ধ্রে, প্রতিটা স্মৃতিতে, আমার হয়েই।
তোমার কি মনে আছে সৌহার্দ্য, আমায় একবার বেলীফুলের মালা দিয়েছিলে উপহার। সেই মালাটা আজও যত্নের সাথে বাক্সবন্দী সাথে তোমার অস্পষ্ট অক্ষরের হাতে লেখা সেই চিরকুট! আসলে জানো কি তোমার আমার সম্পর্কটা অনেকটা সেই বেলী ফুলের মালার মতো। সুঁতা ছিঁড়েছে, কিন্ত সুবাস এখনো নাকে লাগে।
হয়তো বেলীর সৌরভের ন্যায় তোমার আমার স্মৃতি গুলো বেঁচে থাকবে। অতঃপর অযত্নে কিংবা আমার প্রস্থানে হারিয়ে যাবে তোমার মতো করে। আর তারপর?
- তারপর সৌহার্দ্য আর অরণী এর অনুভূতি মাখা গল্পটাও কোনো এক সময়ে বিলীন হয়ে যাবে অতীত নামক জীবনের অন্য কোনো গল্পে।”
অরণীর হুঁশ ফিরলো দরজায় ঠক ঠক শব্দের মাধ্যমে, আর সে তড়িঘড়ি করে আবার বস্তাবন্দী বই-ডায়েরীর মাঝে মিশিয়ে দিলো চিরকুট-ফটোগ্রাফ-আর শুকনো বেলীর মালা।
লেখা- সুমাইয়া ইসলাম সিনথীয়া
পোস্টার- সুমাইয়া ইসলাম সিনথীয়া
