এই ব্যস্ততম জীবনের ঘুর্ণিপাকে মাঝে মাঝে প্রেরণা ও অনুপ্রেরণার অভাববোধটাকে অনুভব করাটা আমাদের প্রাত্যহিক রুটিনে অস্বাভাবিক কোনো কারণ নয়। মানসিক অবসাদগ্রস্ততা, নান্দনিক ও সৃজনশীলতায় প্রতিবন্ধকতা কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্বাভারে নতজানু পরিস্থিতি এবং নবোদ্যম খুঁজে পাওয়ার তৃষ্ণা অতি গুরুত্বপূর্ণ; যা উপযোগীতা, উৎপাদনশীলতা ও সুস্থতার জন্য বাঞ্ছনীয়। ফলপ্রসূ, বিশ্রাম নেওয়া, পর্যাপ্ত হাঁটা, বই পড়াএবং গান শোনা একটু সহজ পন্থা, কিন্ত এর কার্যকর পদ্ধতিগুলো মস্তিষ্ককে পুনর্জাগরণে এবং জ্ঞানবোধের কর্মক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই আর্টিকেলে উল্লেখ থাকবে কীভাবে এই কৌশলগুলো মানসিক পুনর্জাগরণ ও দীর্ঘস্থায়ী অনুপ্রেরণায় সহায়ক হতে পারে।
১. ঘুম মস্তিষ্কের পরম বন্ধু: বিশ্রাম তার বিকল্প
আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘুম নিয়ে সমস্যায় একদমই ভুগছেন না এমন মানুষের সংখ্যা একদমই নগন্য। অনেকের মতে রাতের ঘুমানো কার্যকরী আর দিনে ঘুমানো অলসতার লক্ষণ। কিন্ত গবেষণায় দেখা গিয়েছে, স্বল্প বিরতিতে নেওয়া ঘুম যা বিশ্রাম মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং মানসিক কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। ঘুম মানবজীবনের স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণে,, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধিতে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যথার্থ ভূমিকা পালন করে, যা মানসিক অবসাদ কাটিয়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী এবং বিবেচ্য উপায়। তাই ঘুম দিনে কিংবা রাতে যখনই হোক তাকে অলস ভাবলে চলবে না।
বিজ্ঞান কি বলছে ঘুম নিয়ে?
মনোযোগ বৃদ্ধির অন্তরায়: স্বল্প সময় অর্থাৎ ১০-২০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত ঘুম কিংবা বিশ্রাম আমাদের মস্তিষ্কের মনোযোগ উন্নত করতে এবং কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তাই বলা যায়, বিশ্রাম কিংবা স্বল্প সময়ের ঘুম মস্তিষ্কের মনোযোগ বৃদ্ধির অন্তরায়।
স্মৃতিশক্তির জাগরণমন্ত্র: আমাদের মানব মস্তিষ্ক প্রতিটি মুহুর্তেরই তথ্য গ্রহণ করতে থাকতে এবং তার বিশাল ডাটাবেসে তা সংরক্ষণ করার চেষ্টাও করে। ঠিক তখন ঘুম মস্তিষ্কের সেইসকল নতুন তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে সহায়তা করে।
অনুভূতি নিয়মন: আমরা সহজাতভাবেই অবেগ কিংবা অনুভূতিপ্রবণ। অন্যান্য প্রাণী থেকে এটা আমরা বেশীই উপলব্ধি করতে পারি তাই মাঝে মাঝে আমরা হাতছাড়া করে ফেলি কখন কোন অনুভূতির প্রকাশ সমুচিত নিয়ে আর তখন আমাদের মস্তিষ্কে আলাদা করে পেরেশানীগ্রস্থ হয় যা আমাদেরকে ক্রমশ ধাবিত করে হতাশা কিংবা অবসাদগ্রস্ততার দিকে। তাই অনুভূতির রদবদলের সময় মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়াটা আমাদের স্ট্রেস কমাতে এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে।
রুটিনমাফিক জীবনযাপনের পাশাপাশি ঘুমের গুণগত মান নিশ্চিত করতে দুপুরের দিকে ছোট বিরতি নিয়ে বিশ্রাম নেওয়া উচিত, যাতে এটি রাতের ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে।
২. হাঁটতে হবে নিয়ম করে:
অলসতার ছোবলে ও প্রযুক্তিগত উন্নতিতে এখন বসেই করতে হয় নানান কাজ, তাই হাঁটা হয়না নিয়ম করে। আলাদা রুটিন এর অন্তর্ভুক্ত হলেও নানান অযুহাতে আজ নয় কালকেই রয়ে যায় হাঁটা এর সিডিউল। তবে শারীরিক সম্পাদনার মধ্যে বিশেষত হাঁটা আমাদের মানসিক স্বচ্ছতার পাশাপাশি আবেগগত সুস্থতায় বিরাট ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে খোলা আকাশের নীচে উন্মুক্ত পরিবেশে হাঁটা মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে, স্নায়ুর কার্যকলাপ উদ্দীপিত করে এবং কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) হ্রাস করে, যা আমাদের সার্বিক মস্তিষ্কের কার্যকারিতাকে আরো উন্নত করতে সাহায্য করে।
মানসিক ও আবেগগত উপকারিতায় হাঁটা:
সৃজনশীলতার উন্নতি: গবেষণায় বলা হয়েছে, আপনি যখন হাঁটবেন আপনার সকল ইন্দ্রিয় তখন সচল থাকবে যার ফলস্বরূপ মানসিক চাপ কমিয়ে আমাদের মস্তিষ্কের সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনাকে আরো উৎসাহিত করে এবং নতুন ধারণা ও জ্ঞান আহরণের তৃষ্ণার জন্ম দেয়।
আবেগগত উন্নতি: আমাদের শরীরে একধরণের হরমোন আছে যার নাম এন্ডরফিন। যা সুখের অনুভূতি তৈরি করতে এবং মানসিক চাপ হ্রাস করতে সাহায্য করে। আর এই এন্ডরফিন নিঃসরণ বাড়ায় যখন আমরা কোনো শারীরিক সম্পাদনা তথা হাঁটার মধ্যে থাকি।
মানসিক স্বচ্ছতা: সকাল থেকে রাত অবধি যদি একটা মানুষকে একই স্থানে বসে তার কাজ সম্পাদন করতে বলা হয় তাহলে সে কি সেটি সঠিকভাবে পূর্ণ মনোযোগের সহিত শেষ করতে পারবে? উত্তর হবে না। কারণ একজন মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে একটানা বসে কখনোই কাজ করতে পারে না। কারণ এতে তার মানসিক অবসাদের সৃষ্টি হয়, ক্লান্তি জেঁকে বসে, আর মনোযোগ এর ব্যাঘাত তো ঘটেই। তাই এই সকল সমস্যার বিপরীতে হাঁটা উত্তম পন্থা। স্বল্প সময়ে একটু হেঁটে পুনরায় কাজ শুরু করলে ক্লান্তি দূর হয়, মানসিক অবসাদ কমে এবং পুনঃ মনোযোভ পাওয়া যায়।
একজন ব্যাক্তির শারীরিক সহ মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য সকালে, দুপুরের বিরতিতে, সন্ধ্যা কিংবা রাতে হাঁটার অভ্যেস গঠন করতে হবে। যার ফলে যেকোনো কাজে ক্ষীণ হয়ে আসা প্রেরণা-অনুপ্রেরণারা জাগ্রত হবে।
৩. উদ্দীপনায় পড়ুন বই:
আপনি কি জানেন? বই আমাদের বন্ধু! এটি একটি শক্তিশালী মস্তিষ্কের অনুশীলনও। যা আমাদের মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে, সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে পুনর্জ্জীবিত করে, শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন প্রকারের লেখা ও তথ্যবহুল বিষযয়াদির সান্নিধ্যে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত, কল্পনাশক্তি জাগ্রত এবং নতুন ধারণা গঠনে সহায়তা করে।
পড়ার সাথে অনুপ্রেরণা যখন বিনামূল্যে:
প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি: আমরা কোনো ঘটনা শ্রবণ করেই কতো কিছুর সমালোচনা, পক্ষপাতিত্ব করে ফেলি। কিন্ত যা অল্প সময়েই ভুলে যাই কিংবা ভুলপ্রমাণিত হলে আরো ভেঙে ফেলি। এর বদলে যখন সেই ঘটনা নিজে পড়ি তার বিভিন্ন ধারণা ও দৃষ্টিকোণ বুঝি আর তার মাধ্যমে আমাদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সৃজনশীল সমস্যা সমাধান সহজেই উন্নতি লাভ করে।
অবসাদ থেকে মুক্তি: আমরা ছোট ছোট বিষয় লক্ষ করি বিধায় হুটহাট অবসাদের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে যাই। যার ফলে আমাদের মানসিক চাপ হু হু করেই বৃদ্ধি পায়। আর এই ছোট ছোট বিষয়ের অবসাদ থেকে চটজলদি মুক্তি পাওয়ার প্রধান ও সর্বোত্তম পন্থা হলো আকর্ষণীয় বই পড়া। যা অবসাদকে মুক্তি দিয়ে মানসিক চাপ থেকে তাৎক্ষণিক রেহাই দেয় এবং আমাদের মনকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করে।
কল্পনাশক্তি জাগ্রত: মানব মন কল্পনাবিলাসী। কল্পনায় ডুবে থাকা আমাদের সহজাত বৈশিষ্ট্য। আর এই কল্পনাশক্তি জাগ্রত করে বিভিন্ন ধরণের গল্প,কবিতা,উপন্যাস,প্রবন্ধ,ইতিহাস, দার্শনিক সহ বিভিন্ন ধরণের লেখা বই। যা আমরা পড়ি, আর মস্তিষ্ক আমাদের কল্পনায় সেই মোতাবেক অবয়ব তৈরী করে নিত্যনতুন।
দীর্ঘমেয়াদী অনুপ্রেরণা বৃদ্ধির জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই। নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে মানসিক উদ্দীপনা বজায় রাখতে সাহায্য করে তার পাশাপাশি মস্তিষ্ককে সচল রেখে জ্ঞানে পুষ্ট করে আমাদের।
৪. গানের প্রভাব : আবেগ ও মানসিক উৎকর্ষের নিয়ামক
গান মানুষের আবেগ ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে যার ফলে আমরা হরহামেশাই গুন গুন করে মৃদুসুরে গেয়ে থাকি গান। কোনো কোলাহলে,ভ্রমণে,আড্ডায়,অনুষ্ঠানে, একাকীত্বে এমনকি ওয়াশরুমেও মনের জান্তে-অজান্তে গাওয়া হয় কিংবা শোনা হয় গান। বিভিন্ন সুরের গান মানুষের মস্তিষ্ককে ভিন্নভাবে উদ্দীপিত করতে পারে, যা একদিকে মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে,আর অন্যদিকে মানসিক চাপকে হ্রাস করতে সাহায্য করে।
কগনিটিভ ও মানসিক প্রভাবে গান:
একাগ্রতা জাগরণ: গান এর জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বাদ্যযন্ত্রের সুর দ্বারা গাওয়া গান আমাদের মনোযোগ উন্নত করে এবং গভীর মনোযোগের সাথে কাজ করতে ভূমিকা রাখে।
আবেগ উন্নতকরণ: আবেগ অনুযায়ী বিভিন্ন গান আমাদের মানসিক চাপ কমিয়ে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে, যা অনুপ্রেরণা বৃদ্ধিতে সহায়ক। যেমন আনন্দের সময়ে আনন্দদায়ক গান, খুব একাকীত্বে কিংবা চরম মন খারাপে প্রশান্তিদায়ক গান।
সৃজনশীলতা বৃদ্ধি: যারা গান করে তারা সাধারণত নিয়ম করে প্রতিদিনই রেওয়াজ করে থাকে বিভিন্ন সারগম-শাস্ত্রীয় রাগ-সুর এর মাধ্যমে, এতে তাদের গলার উন্নতির পাশাপাশি মনোযোগও বৃদ্ধি পায়। ঠিক তেমনই বিশেষ করে ধীর-গতির শাস্ত্রীয় কোনো গান বা লো-ফাই বিট আমাদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও সমস্যার সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়।
কাজের জনরা,পরিবেশ,ধরণ, ও আমাদের আবেগ-অনুভূতি-মেজাজ অনুযায়ী গান নির্বাচন করা হলে এটি একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে কাজ করতে করবে।
পরিশেষে:
যখন আমাদের মধ্যে প্রেরণা এবং অনুপ্রেরণার অভাববোধ স্পষ্টভাবে দেখা দেয়, তখন কিন্ত অতি সহজে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কৌশল-পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করা হলে আমাদের মানসিক পুনর্জাগরণ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে। শারীরিক কার্যকলাপ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক উদ্দীপনা এবং সংগীতের ইতিবাচক প্রভাবগুলোকে সূক্ষ্মভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে অনুপ্রেরণা বজায় রাখা সহজভাবেই সম্ভব হতে পারে। আর এই কৌশলগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনে করলে মানসিক ক্লান্তি, অবসাদ, হতাশা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা এবং দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ কর্মক্ষমতা বজায় রাখা আমাদের জন্য সহজ হবে।
লেখা- সুমাইয়া ইসলাম সিনথীয়া
পোস্টার- সুমাইয়া ইসলাম সিনথীয়া
