বুক-ফটোগ্রাফির টিপস & ট্রিকস

বুক-ফটোগ্রাফির টিপস & ট্রিকস

যতো দিন যাচ্ছে মানুষ ধীরেধীরে নানান রকম ক্রিয়েটিভ কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছে, বেরিয়ে আসছে সৃজনশীলতার নতুন নতুন ক্ষেত্র।
 
তেমনই একটা সৃজনশীল কাজ হচ্ছে, "বুক-ফটোগ্রাফি", সহজ বাংলায় " বইয়ের ছবি তোলা"। এটা নিয়ে আজ বেশ বিস্তারিত লিখবো। আমি বুকফটোগ্রাফির সাথে পরিচিত হই ২০১৭ সালে, ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে। মূলত বুকস্ট্রাগ্রাম থেকেই বুকফটোগ্রাফির ব্যাপারে জানি। ২০১৭-২০২১ এই ৪ বছরে অনেক কিছু শিখেছি, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বিগেনারদের জন্য থাকছে কিছু টিপস & ট্রিকস !
তাহলে শুরু করা যাক,
 
বইয়ের ছবি তুলতে গেলে আপনাকে শুরুতে কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে সেগুলো হলো,
 
১। Theme
২। Background & Props Selection
৩। Focus Point
৪। lighting, Angle, Photography & Device
৫। Editing & Watermark/Logo
 
Theme: এখানে আপনার ছবির বিষয় বস্তু হলো "বই"। ছবির থিম কেমন হবে সেটা নির্ভর করতে পারে ছবি তোলার জন্য নির্বাচিত বইটির বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর,
 
= বইয়ের প্রচ্ছদের কালার প্যালেট
= বইয়ের জনরা
= বইটি যেই কাহিনী নিয়ে তার প্রধান চরিত্র
 
Background & Props Selection: থিম নির্ধারণের পরে আসে প্রপস এবং ব্যাকগ্রাউন্ড অথবা ব্যাকড্রপ সিলেকশন। ছবির থিম ফুটিয়ে তুলতে যেসব টুকিটাকি আনু্যাঙ্গিক জিনিস প্রয়োজন হয় তাকেই প্রপস বলে। প্রপস অবশ্যই থিমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। যেমন, আপনি মিসির আলী সিরিজের কোনো একটি বইয়ের ছবি তুলতে চাইছেন এবং ছবিতে মিসির আলিকে ফুটিয়ে তুলতে চাইছেন। তাহলে অবশ্যই আপনাকে এমন প্রপস নিতে হবে যেগুলো মিসির আলি চরিত্রটি ব্যবহার করেন, তার স্বভাব এবং কাজকে রিপ্রেজেন্ট করে।
 
ব্যাকগ্রাউন্ড দুইরকমের হতে পারে, ১. ন্যাচারাল এবং ২. আর্টিফিশিয়াল
 
ন্যাচারাল ব্যাকগ্রাউন্ড হলো আপনার চারপাশের পরিবেশের লিভিং এলিমেন্ট। যেমন ধরুন আপনি কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছেন। উপরে নীল আকাশ, নিচে বালু আর সামনে সমুদ্র দেখে আপনার চোখে একটা ফ্রেম ধরা পড়লো। আপনার সাথে থাকা বইয়ের একটা সুন্দর ছবি তুলে ফেললেন এই ব্যাকগ্রাউন্ডে। হ্যা, এমন ব্যাকগ্রাউন্ডে কিন্তু ছবির জন্য কোনো প্রপস দরকার হয়না! আপনার চারপাশের পরিবেশের সুন্দর যেকোনো স্থান কিন্তু হয়ে যেতেই পারে আপনার পরবর্তি ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড।
 
আর্টিফিশিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ড বুকফটোগ্রাফার নিজে তৈরী করেন। এখানে অবশ্য কিছু জিনিসের প্রয়োজন পরে। আর্টিফিশিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য প্রথমে রং নির্বাচন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছবির থিমের সাথে যায় এমন রং আপনি নির্বাচন করতে পারেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাকগ্রাউন্ড কালার হলো, " সাদা " । যারা প্রথম প্রথম ছবি তুলছেন, শুরুতেই জটিল কিছু সিলেক্ট না করে সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি তুলতে পারেন, কারণ এতে ছবি সবচেয়ে সুন্দর এবং উজ্জ্বল আসবে। অনেকে ছবি তোলা আয়ত্ত্বে এসে গেলেও সব সময় সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডেই বইয়ের ছবি তুলতে ভালোবাসেন, আবার অনেকে নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট এর উপর থাকেন। এটা সম্পুর্ন ব্যাক্তিরুচির উপর নির্ভরশীল। প্রচ্ছদের সাথে মিলিয়ে ছবি তুলতে চাইলে কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড কালারের যথেষ্ট সামঞ্জস্যতা রাখতে হবে। বাজারে ফটোগ্রাফির জন্য প্রিন্ট করা অনেক ধরণের ব্যাকড্রপ পেপার/শিট পাওয়া যায়, চাইলে পছন্দমতো সেগুলিও ব্যবহার করা যেতে পারে।
 
Focus point: এরপর আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে ছবির ফোকাস পয়েন্ট। এখানে ফোকাস পয়েন্ট হবে “বই” এবং একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের পজিশন। ভুলভাল পজিশনে বই রাখার জন্য আপনার সুন্দর ছবিটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে । প্রপস গুলোও সেভাবেই সাজাতে হবে যেনো ছবির অন্য এলিমেন্ট গুলো বইয়ের চেয়ে বেশি ফোকাস না পায়।
 
lighting, Angle & Photography: বুকফটোগ্রাফি ন্যাচারাল লাইটে করাই ভাল, কারণ ছবি যথেষ্ট উজ্জল আসে। কেমন ছবি তুলতে চাচ্ছেন আলো-ছায়া বুঝে সব কিছু সেট করবেন। এবার ছবি তোলার পালা। আপনার প্রিয় ডিভাইস দিয়ে ছবি তুলবেন। অধিকাংশ বুকফটোগ্রাফাররাই মোবাইল দিয়ে ছবি তোলেন, আমিও সেই দলের অন্তর্ভুক্ত। যারা একেবারেই নতুন নতুন ছবি তুলছেন তারা মোবাইল সোজাসুজি বা আড়াআড়ি ভাবে ধরে সরাসরি উপর থেকে নিচের দিকে ৯০ ডিগ্রি এঙ্গেলে ছবি তুলতে পারেন। মোটামুটি আয়ত্ত্বে এসে গেলে বিভিন্ন এংগেল থেকে ছবি তুলতে পারেন। অনেকের হাত কাপে যার কারণে ছবি ব্লার হয়ে যায়, তারা মোবাইল স্ট্যান্ড, ট্রাইপড ব্যাবহার করতে পারেন।
 
Editing: ছবি তোলা শেষ, এবার এডিটিং। গুগল প্লে-স্টোরে অনেক দারুন দারুন এডিটিং এপ আছে। যেমনঃ Snapseed, PicsArt, Adobe Photoshop Express, Inshot ইত্যাদি। আপনি আপনার পছন্দমতো যেকোনো এপ ব্যবহার করতে পারেন। এসব এডিটিং এপ এ অনেক ফিল্টারের অপশন থাকে, আপনি পছন্দমত নির্বাচন করতে পারেন। সব সময় ফিল্টার ব্যাবহার না করে এপ এর অনান্য অপশন গুলোও ব্যবহার করতে হবে, তাহলে যেকোনো ছবিকেই এডিট করে আপনি আই প্লিজিং বানিয়ে ফেলতে পারবেন। মোটামুটি আয়ত্ত্বে এসে গেলে ছবির বিভিন্ন কারেকশন করেও এডিটিং কমপ্লিট করতে পারেন। ইদানিং ফেসবুকে যেকোনো ইউনিক আইডিয়া, কাজ চুরি হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা প্রায়ই দেখি, এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হচ্ছে লোগো/ ওয়াটারমার্কের ব্যবহার। লোগো না ইউজ করলেও, ওয়াটার মার্ক হিসেবে আপনার নিজের নাম ব্যবহার করলেও এই সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। ওয়াটার মার্ক এমন পজিশনে বসাতে হবে যাতে ছবির সৌন্দর্য ও নষ্ট না হয় আবার ক্রপ করলে যাতে বাদ ও না পড়ে। Picsart, Photoshop Express, inshot ব্যাবহার করে আপনি ওয়াটারমার্ক বসাতে পারবেন।
 
এমনিতে বুকফটোগ্রাফির কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই, একজন চাইলেই নিজস্ব স্টাইলে ছবি তুলতে পারেন। তবে সেটা অবশ্যই বেসিক জিনিসগুলো শিখে তারপর। আর যেকোনো কিছু শিখতে গেলে প্রচুর রেফারেন্সের দরকার হয়, অনেক সময় বিভিন্ন মানুষের ক্রিয়েটিভ, ইউনিক কাজ গুলো দেখেও অনেক নতুন নতুন আইডিয়া মাথায় চলে আসে। কেউ কেউ রেফারেন্স ঘাটার কথা শুনলেই ধরে নেন এখানে কপি করার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু এটা ভুল। কারোর কাজই হুবুহু কপি করাটা ঘোরতর অন্যায়, এখানে কোনো সৃজনশীলতা প্রকাশ পায় না। রেফারেন্সের জন্য Instagram, Pinterest এবং Google জনপ্রিয় মাধ্যম। ইন্সটাগ্রামে বিভিন্ন বুকস্টাগ্রাম একাউন্ট ফলো করলে অনেক রেফারেন্স চোখে পড়বে। তবে Pinterest এবং Google সবচেয়ে ভালো মাধ্যম কেননা শুধুমাত্র সার্চ করলেই পৃথিবীর হাজার হাজার বুকফটোগ্রাফি এসে পড়বে। এছাড়াও ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপেও সেরা সেরা বুকফটোগ্রাফার রা প্রতিদিন দারুণ দারুন ছবি পোস্ট করছেন। বিভিন্ন বুকিশ গ্রুপ গুলো তে এড হয়ে বিভিন্ন বুকফটোগ্রাফারদের কাজ দেখতে পারেন এবং নিজের কাজ পোস্ট করতে পারেন।
 
Common Mistakes: আমরা প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু শিখছি, তবে এর মাঝেও কিন্তু ভুল থাকতেই পারে। ছবির মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এলিমেন্টের ব্যাবহার, অতিরিক্ত এডিটিং (HDR filter ব্যবহার, বেশি ডার্ক করে দেয়া ইত্যাদি) , ভুল এঙ্গেল এ ছবি তোলা, ছবিতে মডেল থাকলে অতিরিক্ত ফোকাস দেয়া, ইত্যাদি এই ভুলগুলো বিগেনাররা অহরহ করে থাকে। এমনও অনেক ছবি দেখেছি যেখানে ছবিতে বইটাই এককোণে পড়ে আছে বা বইটা খুজে নিতে হয়। এটাকে বুকফটোগ্রাফি ভাবাটাও অন্যায়।
 
Tips & Trick:
= প্রপস খোজা সবচেয়ে সহজ। কারণ আমাদের চারপাশে অনেক কিছু আছে যা বুকফটোগ্রাফিতে প্রপস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। জন্মদিন বা যেকোনো উপলক্ষে ফুলের তোড়া গিফট পেলে সেটা ২/৩ দিন পরে ফেলে না দিয়ে সংরক্ষণ করুন। পাতাগুলো আলাদা করে জালি ব্যাগে ভরে কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে নিন আর ফুল বা পাপড়ি বইয়ের ভাজে রেখে দিন, এগুলোই প্রপস হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। একই ভাবে বাসার টবের গাছের ঝরে যাওয়া ফুল, পাতা কালেক্ট করতে পারেন
 
= প্রতিমাসে অনেকের বাসাতেই চালের বস্তা কেনা হয়। এখন চাল প্যাকেজিং এ মজবুত পাটের বস্তা ব্যাবহার করা হয়। অনেকে ব্যাকড্রপ হিসেবে, প্রপস হিসেবে চট ব্যাবহার করেন তারা এই বস্তা রিসাইকেল করতে পারেন। বস্তা ভালো করে ধুয়ে, শুকিয়ে এরপর ইস্ত্রী করে নিলেই হলো!
 
= সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য স্টেশনারি দোকানে যেই আর্ট পেপার পাওয়া যায় ব্যবহার করতে পারেন। ১০-২০টাকা দাম পড়বে। এছাড়াও অনান্য কালার এর আর্ট পেপার ব্যাবহার করতে পারেন।
 
= হলুদ হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠার বই, ছেড়াফাটা ডিকশনারি, মাটির কাপ-পিরিচ, কাঠ, বেত বা বাশের তৈরী ঝুড়ি বা ট্রে, টবের গাছ যেমন মানিপ্ল্যান্ট, ইঞ্চিপ্ল্যান্ট, জিপসি ইত্যাদি প্রপস হিসেবে অনেক মানানসই। ভিন্টেজ ছবি যারা তুলতে পছন্দ করেন তারা ছবিতে বিভিন্ন পুরোনো জিনিস প্রপস হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
 
= ছবিতে আলো-ছায়া থাকলে অন্যরকম একটা ভাইভ আসে। বাসার যেই স্থানে রোদ আসে সেখানে ছবি তোলা্র চেষ্টা করুন, জানালার গ্রিলের কারণে যেই ছায়া পড়বে সেটা ছবিতে একটা আলাদা ইফেক্ট তৈরী করবে। চাইলে কৃত্রিম ভাবেও ছায়া তৈরী করতে পারবেন, Picsart app এর Mask ফিচারটা ব্যাবহার করে।
 
= বই না পড়েই ছবি তোলাটা বর্জনীয় কারণ বইয়ের ভেতরে কি আছে জানা না থাকায় ছবিটাও পার্ফেক্ট হবে না। একান্তই প্রয়োজন হলে বইটি সম্পর্কে ইন্টারনেট থেকে কিছু রিভিউ পড়ে নিন।
 
= চাইলে ফটোগ্রাফি পোস্ট করার সময় বইটির রিভিউ বা আপনার পাঠানুভুতি শেয়ার করুন।
 
তোহ আর দেরি কেন? তুলে ফেলুন আপনার প্রিয় বইটার ছবি! এখানে আমি যা শিখেছি তা অনেকাংশেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি সহজভাবে। চাইলে আপনারাও আপনাদের অভিজ্ঞতা আর টিপস শেয়ার করতে পারেন কমেন্টে!