পহেলা ফাল্গুনে অন্যদিনের চেয়ে একটু আগেই ঘুম ভেঙে যায় আমার। বালিশের তলা থেকে মোবাইল বের করে দেখি মাত্র সকাল ৭টা বাজে। চন্দ্রিমার সাথে দেখা হওয়ার আরও কয়েক ঘণ্টা বাকি।ঠিক সকাল ১১টায় দেখা করবে বলেছিল কিন্তু আমার অপেক্ষা করার ধৈর্য নাই। বাসায় রোজ আমাদেরকে নিয়ে ঝামেলা লেগেই আছে,আজকেপ এর ব্যতিক্রম হয়নি। সহ্য করতে চন্দ্রিমাকে কল করলাম।
চন্দ্রিমা তখন গভীর ঘুমে, বেচারী কোনোদিনই সকালে ঘুম থেকে উঠে না। ডান হাতে বালিশের তলা থেকে মোবাইল বের করে দেখে শান্তনুর কল। কল রিসিভ করে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ বলো,এই সময়ে হঠাৎ কি হলো? ওপাশ থেকে শান্তনু বলে- তুমি কি আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে পারবে? আমি এই মুহূর্তে তোমার সাথে দেখা করতে চাই। চন্দ্রিমা-কেন কি হয়েছে?১১টায় তো আমাদের দেখা হওয়ার কথা। শান্তনু- বাড়িতে সমস্যা হচ্ছে খুব, আজ একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।তুমি আজকের জন্য ঘুমটা একটু স্যাক্রিফাইস করো, প্লিজ।
চন্দ্রিমা- কি? তোমার জন্য আমি এখন আমি আমার ঘুম স্যাক্রিফাইস করবো! শান্তনু- শুধু আজকের জন্যই তো স্যাক্রিফাইস করতে বলছি। চন্দ্রিমা-ওকে,আমি আসছি। চন্দ্রিমা প্রথমে ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসে। শান্তুনার বাসায় প্রায় এক বছর ধরে সমস্যা চলছে,দুদিন পরপর শান্তনু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলে নিজেই পিছিয়ে যায়।এবারেও তেমনটা হবে ভেবে চন্দ্রিমা ঘুমিয়ে পড়ে আবার।
এদিকে চন্দ্রিমা আসছে না দেখে শান্তনু বারবার কল করে যাচ্ছে। শান্তনুকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করিয়ে শেষ চন্দ্রিমা আসে।চন্দ্রিমার চোখেমুখে ভয় আজ! কি হয়েছে তোমার? তোমাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলেছি আর তুমি! এতো দেরি করে আসলে কেন? শান্তনু জিজ্ঞেস করে।
- কিছু হয়নি। রাস্তায় জ্যাম ছিল তাই দেরি হয়েছে। (রাস্তায় জ্যাম থাকার কথা কেন বলেছে সেটা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন।) চন্দ্রিমা প্রায় হেসেহেসে বললো, বাসায় কি খুব সমস্যা হচ্ছে?
- হ্যাঁ কালকে রাতে তো আমার ওপর দিয়ে ছোটখাটো একটা ঝড় বয়ে গেল। বাসায় কেউ আমাদের সম্পর্ক মেনে নিচ্ছে না। বাসায় আর থাকা সম্ভব না।
- তুমি কি চাইছো?
- আমি তোমার সাথে থাকতে চাইছি চন্দ্রিমা,ব্যস এইটুকু। তুমি কি চাও? চন্দ্রিমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে শান্তনু।
- তুমি যেটা চাইছো আমিও সেটা চাইছি।
দুজনে বিয়ে করে শহর থেকে দূরে এসে পাহাড়ের উপরে ছোট্ট বাসায় থাকার প্ল্যান ক করে। পাহাড়ে থাকার প্ল্যানটা অবশ্যই চন্দ্রিমার নিজের। সেদিন রাতেই কিসের একটা শব্দে চন্দ্রিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।বাইরে তখন কেউ ফিসফিস করে বলছে, "আমি তোমাকে ভালোবাসি"। তারপরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি চন্দ্রিমাকে। হয়তো কোনো খাদে পড়ে মারা গেছে কিংবা কুকুর-শেয়ালেরা খেয়ে ফেলেছে!
চন্দ্রিমা অনেকদিন ধরেই তার প্রথম স্বামী অভিককে আশেপাশে দেখতে পাচ্ছিলো যে কিনা বিয়ের কয়েকমাস পরেই রোড এক্সিডেন্টে মেরে যায়। চন্দ্রিমা আর অভিক দুজনেই ভালোবেসে বিয়ে করে। অভিকের মৃত্যুর পর থেকেই চন্দ্রিমার অস্বাভাবিক কার্যকলাপ শুরু হয়ে আজকে চন্দ্রিমার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে শেষ হয়!
পাহাড়ের ৭০০০ হাজার ফুট ওপরের ঢালু জমিটার এককোণায় একটা দুই কামরার কাঠের ঘর। ঘরে বিশাল দুটো কাচের জানালা।
তার একটা হাট করে খোলা। হু-হু করে পাহাড়ি ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। সেই খোলা জানালার সামনে শীতের পোশাক না পড়ে বসে আছে চন্দ্রিমার প্রেমিক।কনকনে ঠান্ডা হাড় কাঁপানো হাওয়ায় তার ভ্রুক্ষেপ নেই, ফায়ারপ্লেসে আগুন নেই, হিটারও অন নেই, হাতে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপ নেই, ঘরে অ্যালকোহলের বোতল নেই, ঠোঁটে গোল্ডফ্লেক কিং নেই।
শুধু আছে পাতার সড়-সড় শব্দ, আর নয়তো একরাশ নীরবতা। ওহ! আর একটা জিনিস নেই!
শান্তনুর প্রেমিকা আর নিজের দেহে নেই। শুধু ছবির ফ্রেমে আটকে আছে। হাওয়ায় সেটা দুলে ওঠলো।
