তিলোত্তমার কথা

তিলোত্তমার কথা

প্রথম– ক্লাস-টিউশন করে এসে তিলোত্তমা খুব টায়ার্ড। অনিমেষের সকাল থেকে কোনো মেসেজও আসেনি।

তিলোত্তমা একের পর এক মেসেজ দিয়ে যাচ্ছে। এক ঘণ্টা পরে অনিমেষের মেসেজ

  • বারবার মেসেজ দিচ্ছো কেন? কি সমস্যা তোমার? জানোনা, ব্যস্ত থাকি।
  • তোমার কোনো খোঁজখবর নেই তাই।
  • আমার খোঁজ সবসময় নিতে হবেনা। তোমার মতো এতো সময় নেই আমার।
  • অনিমেষ......
  • দেখো তিলোত্তমা, তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল। আমি আগামী মাসে ইউএস যাচ্ছি । কবে ফিরবো ঠিক জানিনা।
  • তুমি ইউএস যাচ্ছো মানে? কবে কখন এসব ঠিক হল?
  • কয়েক মাস ধরেই তো চেষ্টা করেছি । কিছু দিন আগে স্কলারশিপটা পেয়েছি,আজকে সবকিছু কনফার্ম ।
  • আমাকে এতোদিনে কিচ্ছু বলো নাই তুমি! আমাকে এখনো জানাচ্ছো তুমি!
  • জানানোর সময় পাইনি তুমি। আর তাছাড়া এসব ব্যাপারে তোমাকে বললেই কি তুমি সব বুঝবে?তোমার কোনো আইডিয়া আছে,কতো স্ট্রাগল করে আজ আমি সাক্সেস পেয়েছি।
  • ও হ্যাঁ, এজন্যই বুঝি ৬ মাস হয়ে গেছে তোমার কোনো দেখা নাই।
  • হ্যাঁ নাই। আর কিছু?
  • আমাদের বিয়েটা?
  • এখন বিয়ে করা ইম্পসিবল। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও৷
  • অনিমেষ
  •  

আর কোনো রিপ্লাই আসেনা অনিমেষের থেকে। কল কেটে দিচ্ছে বারবার।

অনিমেষের হুট করে ইউএস চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না তিলোত্তমা। অনিমেষের জব প্রিপারেশনের জন্য দুজনের মাঝে সারাদিন কথা কম হতো। তিলোত্তমাও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়। প্রায় ৬ মাস ধরে একপ্রকার দেখাসাক্ষাৎ ফোনকল কিচ্ছু হয়না। শুধু রাতে দুজনের টুকটাক মেসেজিংয়ে কথাবার্তা হয়। এইতো কাল রাতেও বিয়ের প্ল্যানিং করলো দুজনে মিলে,কিভাবে পরিবারে সবাইকে রাজি করাবে এসব। মাঝেমধ্যে অনিমেষকে নিয়ে সন্দেহ হতো তিলোত্তমার, ঝগড়া অবশ্য করতো না কখনোই তিলোত্তমা। তিলোত্তমার প্রতি অনিমেষের অভিযোগের শেষ ছিল না। তবু সম্পর্কটা ভেঙ্গে যায় নি৷

দ্বিতীয়–

অনিমেষের ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রতীক কতোগুলো ছবি আর ভিডিও পাঠায়। সবটা জানার পর তিলোত্তমা রাগে-দুঃখে ফোনটাই ভেঙে ফেলে। তিলোত্তমা অনিমেষকে দুবার কফিশপে যে মেয়ের সাথে দেখে সন্দেহ করেছিল তারই সাথে অনিমেষ ইউএস যাচ্ছে। এক বছরের রিলেশনশিপের পর গত পরশু দুজনে রেজিস্ট্রি বিয়েও করেছে গত পরশু, সেদিন সারারাত অনিমেষের সাথে তিলোত্তমার কথা হয়েছিল। কি অবলীলায় তিলোত্তমার সাথে এখনো কন্টিনিউ করে যাচ্ছে অনিমেষ। তিলোত্তমার সাথে পাঁচ বছর রিলেশনে অনিমেষের এই বিশ্বাসঘাতকতা! তিলোত্তমার অনুভূতি কি অনিমেষের কাছে পৌঁছায়নি কখনো নাকি সুদেষ্ণার আগমনে অনিমেষের কাছে তিলোত্তমা ফিকে হয়ে গেছে! তিলোত্তমার এই চিৎকার কি অনিমেষের হৃদয়ে আলোড়ন তুলছে না? ভালোবাসার শ্রেষ্ঠতম প্রতিমূর্তি সুদেষ্ণা? তিলোত্তমা শুধু একটা নাম, যার কোনো অস্তিত্বই নেই অনিমেষের জীবনে!

অন্তিম–

-কাল দেখা করো প্লিজ। একটা ট্রিটও কিন্তু দিতেই হবে অনিমেষ, তোমার বিদেশযাত্রার ফেয়ারওয়েল ট্রিট।

  • সন্ধ্যায় আসবো কাল তোমার ক্যাম্পাসে।

তিলোত্তমার কথায় অনিমেষ দেখা করতে রাজি হয়। তিলোত্তমা সাদা রঙের একটা শাড়ি পরে আসে। চোখে হালকা কাজল,ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট একটা লাল রঙের টিপ আর খোঁপায় বেলীফুল। একটা নারীর পরিপূর্ণ সাজ। শুধু সিঁথিতে সিঁদুরটুকু নেই৷ অগ্নিসাক্ষী রেখে অনিমেষ একদিন রাঙিয়ে দিতো এই সিঁথি। অনিমেষ অন্য একজনের স্বপ্ন পূরণ করেছে। আজ সিঁদুরের অধিকার সুদেষ্ণার। অনিমেষই তিলোত্তমাকে বঞ্চিত করে সুদেষ্ণাকে অধিকার দিয়েছে। সুদেষ্ণার তবু অধিকার নেই, শাস্তি সুদেষ্ণাও পাবে।

ফ্লাস্ক থেকে একটা কাপে চা ঢেলে অনিমেষের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় তিলোত্তমা -আমার হাত চা খেতে চেয়েছিলে অনিমেষ। আজ আমি নিজে তোমার জন্য এই স্পেশাল চা বানিয়ে এনেছি, এই নাও অনিমেষ।

  • যাওয়ার আগে তাহলে কোনো ইচ্ছাই অপূর্ণ রইলো না আমার।

অনিমেষ হাসতে হাসতে চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর তিলোত্তমা গভীর দৃষ্টি তাকিয়ে আছে। -কি দেখছো অমন করে তিলোত্তমা?

  • তোমাকে দেখছি অনি।
  • হ্যাঁ ভালোভাবে দেখো। একটু কাছে এগিয়ে আসে অনিমেষ। তিলোত্তমার হাতে হাত রাখে।

-তোমার চোখে এই মুহূর্তে অন্তত অসীম মহাকাশ দেখতে পাচ্ছি,অনিমেষ। ভালো থেকো,অনিমেষ।

  • কি সব বকছো?
  • একটা কবিতা শুনবে, অনি? বোধহয়, এই পর্যন্তই আমার গানের স্বরলিপি ছিল বোধহয়,এই পর্যন্তই কথাগুলো জমে ছিল বোধহয়,এই পর্যন্তই আমাদের পথচলা ছিল। মুক্ত তুমি আজ মুক্ত আমার আকাশ ,অরণ্য আর সমুদ্র মুক্ত আমার কবিতার সমস্ত ছন্দ।

মৃত্যুর মুখে পৌঁছে গেছে অনিমেষ,নীলচে আভা তৈরি হচ্ছে মুখে,ঠোঁটে ফ্যাকাশে ভাব গাঢ় হচ্ছে ধীরে ধীরে।তিলোত্তমা নীল আকাশের পাখির মতো উড়তে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে। শুধু থেকে যায় অনিমেষের টুকরো চাহনি, ছোট ছোট শব্দ, একরাশ অব্যক্ত প্রশ্ন, ভাঙা চায়ের কাপে লেগে থাকা সায়ানাইড মেশানো চায়ের ছোট্ট ছোট্ট বিন্দু আর বেলীফুলে বেঁধে রাখা চুলে তিলোত্তমা একা হাঁটছে।