বিভীষিকাময় রজনী

বিভীষিকাময় রজনী

রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১ টা। মোবাইল ফোনের ব্যাটারি শেষ সঠিক সময়টা নেহা জানে না। খুব দ্রুতই পা এগোচ্ছে কারণ বাড়িতে বাবা খুব চিন্তা করছেন হয়তো। 

 

পরনে হালকা সবুজ জমা সঙ্গে গলায় ওড়না, চোঁখে কাজল আঁকা আর ঠোঁটে হালকা লিপজেল। বড্ড পরিপাটি, ঘন কেশ, কানে ছোট্ট টপ। দেখতে মায়াবতী। 

বাবার একমাত্র মেয়ে নেহা, কোনোদিন বাঁধা পায়নি নিজের স্বপ্ন পূরণে। বর্তমানে পড়াশুনার পাশাপাশি একটা ছোটখাটো জব করে। সেখান থেকে ফিরতেই আজ দেরি হচ্ছে নেহার। 

 

১০ টার পর শহরের অলিগলিতে মেয়েদের চলাচল মোটেও নিরাপদ না। শুনশান রাস্তা, সাথে কুকুরদের আনাগোনা। ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতে আর কি চাই! 

 

এদিকে নেহার বাবা ফোনে তাকে না পেয়ে চিন্তায় এ ঘর ও ঘর করছেন। করিম সাহেব ভাবছেন–

“আগে তো এত দেরি হয়নি,আজ কেন এখনো বাড়ি ফিরল না। ফোনটাও অফ বলছে। হে আল্লাহ তুমি আমার মেয়েকে রক্ষা করো। ওর মায়ের মত যেন কিছু না হয়। আল্লাহ তুমি আমার মেয়েকে হেফাজত করো।” বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন। 

 

হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজ। দরজা খুলেই দেখেন নেহা কেমন আতঙ্কে আছেন। বিড়ম্বনা না করে বলেন –

“মা তুই ঠিক আছিস? কিছু হয়নি তো?”

“না বাবা এবারের মত বেঁচে গেছি।”

“আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ। এই নে পানিটা খেয়ে নে।”

 

নেহা শান্ত হলো, আর দেয়ালে তাদের ফ্যামিলি ফটো টার দিকে তাকালো। করিম সাহেব বুঝতে পেরে বললেন -

“এবার বলতো কি হয়েছিল? এত দেরি হলো কেন?”

“বাবা!”

“বল, কোনো সংকোচ ছাড়া।”

“আজকে অফিস থেকে বের হতেই দেরি হেয়ে গেছিলো বাবা, আমি তোমায় জানাতে চেয়েছিলাম কিন্তু দেখি ব্যাটারি শেষ। রাস্তায় জ্যামও ছিল প্রচুর। তাই আমি শর্টকার্ট নিয়ে আসতে গিয়ে এই সমস্যা। প্রথমে সব ঠিকই ছিল, হঠাৎ মনে হচ্ছিল আমায় কেউ ফলো করছে। আমি সাহস করে আসে পাশে তাকালাম কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে পাইনি। আমি আরো জোরে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর দুইটা বাইক আমার সামনে আসলো, আমি ভয় না পেয়ে হাঁটছিলাম এই। ওরা এরপর বাইক থেকে নেমে আমার সাথে সাথে হাঁটতে থাকে, আর বাজে বাজে কথা বলে। আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম, সাথে আম্মুর কথাও খুব মনে পড়ছিল। এইভাবেই হয়তো জা’নো’য়ার গুলো আম্মুকে…”

নেহা থেমে গেলো মাথা নিচু করে।

“মা ওরা তোর কোনো ক্ষতি করেনি তো!”

“না বাবা, একটা চমৎকার ঘটনা ঘটেছে।”

“এই পরিস্থিতিতে চমৎকার ঘটনা!”

“হ্যাঁ বাবা। জানো জা’নো’য়ার গুলা যখন আমার দিকে এগিয়ে আসছিল তখন কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ হয়,আমি জানি না ওটা কিসের শব্দ ছিল। এমন শব্দ আমি আগে কখনো শুনিনি। ওরা আমার পেছনে কি যেন দেখলো,আর তাদের চেহারায় ভয়ের ছাপ দেখলাম। আমি অবাক হলাম যে তারা ভয় পাচ্ছে এবং পেছনে পিছিয়ে যাচ্ছে। আমি পেছনে তাকালাম কিন্তু কিছুই দেখলাম না। ততক্ষণে তাঁরা বাইক নিয়ে উল্টো দিকে চলতে শুরু করেছে, আর তারা একে অপরকে বলছে –

‘ভূত! ভূত! পালা পালা।’

কিছু না বুঝে আমিও দৌড় দিলাম।”

“মা মেয়েকে রক্ষা করেছে পাগলি।”

“কিহ! তুমি এই যুগে এসে এগুলো বিশ্বাস করো যে ভূত বলতে কিছু আছে!”

“ভূত তো নেই,কিন্তু মৃত মানুষের আত্মা তো আছে। ভালো খারাপ মানুষের আত্মা।”

“কি সব বলো তুমি। যদি এমনি হবে তাহলে মাকে সেদিন কেন কেউ বাঁচায় নি বলতে পারো?”

“আমি জানি না, সেদিনের রাতটা বিভীষিকাময় একটা রাত। আজো মনে হয় আমি রাগ না করলে আজ তোর মা আমাদের সাথেই থাকতো।”

“রাগ করলে তুমি,মা হারালাম আমি।”

“সেদিন আমি যদি তার সাথে বাচ্চা গুলাকে খাওয়াতে যেতাম তাহলে ওমন কিছুই হতো না।”

“কোন বাচ্চা”

“পথশিশু। তোর মা অনেক উদার ছিল,মানুষের কষ্ট তাকে কষ্ট দিত। অন্যের কান্না তার ঘুম কেড়ে নিত। তাই সে পথশিশুদের খাওয়াতে চেয়েছিল তোর জন্মদিনের দিন। কিন্তু আমি তোকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চেয়েছিলাম। বলেছিলাম প্রথম জন্মদিন মেয়ের আজ কোথাও যাওয়ার দরকার নাই,কিন্তু তোর মায়ের জেদ সে যাবেই। আমারো রাগ পায় আর বলে ফেলি একাই যেতে। এই কথা শুনে সে কেক নিয়ে একাই যায়, তখন রাত ৯:৩০ টা বাজে। পাশের ফ্লাইওভারের নিচে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার পথে মানুষ রূপী জা’নো’য়ার গুলার হাত থেকে বেঁচে বাড়ি ফিরতে পারেনি।”

করিম সাহেবের চোঁখে জল টলমল করছে,নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মেছে তার। কারণ এই ঘটনার জন্য সে নিজেকেই দায়ী মনে করে। নেহার আম্মুর জেদের চেয়ে সেদিন করিম সাহেবের রাগ রাগ বেশি ছিল ঠিকই, কিন্তু সেদিনের পর থেকে রাগের কোনো ছিটেফোঁটা তার জীবনে আসেনি। এরপর নেহার জন্মদিনও আর পালন করা হয়নি কোনোদিন।

“বাবা! আজ যদি আমার কিছু হয়ে যেতো,তবুও তোমাকে এমন অপরাধী ভাবতে?”

করিম সাহেব চুপ করে রইলেন।

“বাবা দেখো, তুমি আমি এমনকি কেউ জানে না এর পরের সেকেন্ডে কি হবে। তাই আল্লাহর উপর ভরসা করো, আর নিজেকে সামলাও। এমন চিন্তা ভাবনা করতে করতে যদি তোমার কিছু হয়ে যায় তখন আমার কি হবে?”

“তোর মুখ চেয়েই তো বেঁচে আছি মা।”

“আচ্ছা এবার বলো কি রান্না করেছো? বড্ড খিদে পেয়েছে।”

নেহা স্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইলো, যেন তার বাবা ভুলে যায় আজ কি হয়েছিল আর যেন নিজেকে অপরাধী না ভাবে। নিজের ভিতরে ভয়কে আড়াল করে হাসাতে চাচ্ছে বাবাকে।

“ফ্রেশ হ তুই,আমি খাবার দিচ্ছি।”

“আচ্ছা।”