মায়ের সেই কণ্ঠটা এখনো কানে বাজছে -
"তুই কোথায়? ট্রেন থেকে নেমে যা! এখনই! ট্রেনটা আর কখনো গন্তব্যে পৌঁছাবে না।"
কল কেটে গেল। আমি চুপচাপ বসে রইলাম কিছুক্ষণ। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। চারপাশে অজানা এক ছায়া আমাকে ঘিরে ধরেছে বলে মনে হচ্ছে। মানুষজনের চিৎকার-চেঁচামেচি চলছেই, কিন্তু সবকিছু যেন অনেক দূর থেকে আসছে। ট্রেন চললেও শব্দটা কেমন বিকৃত হয়ে গেছে। পাশের লোকটা তখনও তাকিয়ে, তার চোখে যেন ভয় নয়- ভয়ের আনন্দ।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছিল, এই ট্রেনে আমি একা নই। কিন্তু যেসব মানুষ আছে, তারা...কেমন যেন মানুষের মতো না!
হঠাৎ পেছন থেকে এক বাচ্চার কণ্ঠ ভেসে এলো-
"আপু, আপু! তুমি নামবে না?"
আমি তাকালাম। কেউ নেই। শুধু হাওয়ায় ভেসে আসা একটা কণ্ঠ...
আমার পা নিজে থেকেই চলতে শুরু করল। আমি দরজার দিকে এগোচ্ছি।
কিন্তু দরজা কোথায়?
যেখানে দরজা থাকার কথা, সেখানে একটা আয়না! আর আয়নায় আমি নেই।
কেউ নেই। বুক ধড়ফড় করছে। ট্রেনের গায়ে তখন ভেসে উঠলো একটা অদ্ভুত নাম- "অনন্তপুর এক্সপ্রেস"।
আমি তো রংপুর এক্সপ্রেসে উঠেছিলাম! এটা আবার কোন রুট?
পাশের লোকটা আবার হাসল। এবার সে দাঁড়িয়ে আমার কানে কানে বলল-
"তুমি তো গন্তব্যে যাচ্ছো না... তুমি যাচ্ছো তোমার শেষ স্মৃতির খোঁজে..."
আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। ছুটে জানালার দিকে তাকালাম।
আকাশের তারাগুলো সব উল্টোদিকে যাচ্ছে! ট্রেন চলছে, কিন্তু সময় যেন উল্টো দিকে। আমার মাথা ঘুরছিল। হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। সব যাত্রী শান্ত। কেউ মোবাইলে ঝুঁকে, কেউ হেডফোনে গান শুনছে। সবকিছু আবার যেন স্বাভাবিক। পাশে তাকিয়ে দেখি- সেই অদ্ভুত লোকটা নেই।
"হ্যালুসিনেশন?" মনে হচ্ছিলো! কিন্তু এটা ভেবেই নিজেকে সান্তনা দিচ্ছিলাম যে কিচ্ছু হয়নি, সবকিছু স্বাভাবিক আছে। নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম।
ঠিক তখনই ট্রেনের কন্ট্রোল রুম থেকে ঘোষণা এলো -
"পরবর্তী স্টেশন- গন্তব্য।"
আমি থমকে গেলাম।
-গন্তব্য?
এই নামে আবার কোনো স্টেশন আছে নাকি?
আশেপাশে তাকালাম-
কেউ কিছু বলছে না। সবাই একমনে বসে আছে। দরজা খুলে গেল। আমি নেমে পড়লাম। কিন্তু নামতেই অনুভূত হলো মাটি যেন মাটি নয়- আমি কুয়াশার ওপর দিয়ে হাঁটছি।
ঝাপসা আলোয় একটা সাইনবোর্ড দেখা গেল:
"স্বপ্ন-মৃত্যু-ভ্রমণ"
আর নিচে ছোট হরফে লেখা:
"আপনি যে টিকিটটি কেটেছেন সেটা আপনার জন্য নয় এবং দয়া করে ভুলে যাবেন না এর কোনো রিটার্ন টিকিট নেই।"
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই কে যেন পেছন থেকে আমার হাত ধরল। ঘুরে দেখি- সেই আপুটা, যার ব্যাগ ছিনতাই হয়েছিল। কিন্তু তার মুখটা গলে আছে, চোখ নেই, কেমন এক অদ্ভুত হাসি...সে শুধু বলেই চলেছে - "তুমি আমায় চিনলে না? আমি তোমার সেই অতীত, যেটা তুমি প্রথম ষ্টেশনে ছেড়ে এসেছিলে!" তার ভয়ানক মুখ দেখে সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি চিৎকার করে উঠলাম, ভাবতে থাকলাম "আমার কিছু হয়নি তো! আমি কি স্বপ্ন দেখছি !"
ঠিক তখনই আরেকটা গলা শোনা গেল -
"এই আপু, আপু! ঘুমাইয়া পড়ছেন?"
চোখ খুলে দেখি, ট্রেনের টিটি দাঁড়িয়ে আছেন, টিকিট চেক করতে এসেছেন। আমি জানালার পাশে বসা। চারপাশে সব একদম স্বাভাবিক।
একটা ছোট বাচ্চা আমার দিকে জুস বাড়িয়ে দিল আর বললো - "আপু, খাবা? আমার আম্মুর বানানো জুস!"
আমি কিছুটা স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলাম।
সামান্য হেসে বললাম, "থ্যাঙ্ক ইউ বাবু, কিন্তু আমার লাগবে না।"
এসময় সবাই একটু অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছিল আমার দিকে। ঠিক তখনই মোবাইলে একটা নোটিফিকেশন এলো - "Next Station: গন্তব্য"
আমি আবারও চুপ হয়ে গেলাম।
- এখানেই কি শেষ! নাকি অন্যকিছু অপেক্ষা করছে আমার জন্যে?
এবার কি সত্যিই আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই...
গল্প: গন্তব্য (Part- 02)
লেখায়: Zeba Anika
