গন্তব্য (Part - 01)

গন্তব্য (Part - 01)

আমি কাব্য, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ বাড়ি থেকে ডাক এলো—যেতেই হবে। পরশু থেকে ফাইনাল এক্সাম শুরু। কি করবো, একদমই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এদিকে মা খুব করে যেতে বলেছে, না বলাও যাচ্ছিল না। সব মিলিয়ে টালমাটাল অবস্থার উপক্রম হয়েছে। একবার ভাবলাম, "কি করি, কি করি?" তারপর হুট করেই রওনা দিলাম। আমি খুব একটা ভেবে কাজ করিনা, হুটহাট যা মাথায় আসে, সেটা করি। এখন রাত নয়টা বাজে। ভেবেছিলাম, আজ স্টেশনে একটু ভিড় কম হবে, কিন্তু না—স্টেশন এর চারপাশে অসংখ্য মানুষের ভিড়। কত নতুন মুখ, কত অজানা গল্প। আমার আবার কেনো জানি, রাতে দূরের রাস্তায় যাওয়া আসা করতেই বেশি ভালো লাগে। যদিও মা ভীষণ বকা দেয়। বকবে নাইবা কেনো? মেয়েমানুষ রাতবিরেতে একা একা বের হওয়া তো নিরাপদ নয়। তবে আমার আবার এতো চিন্তা করতে ভালো লাগে না। যা হবার, তা পরে হবে। এখন তো পরিবেশটা উপভোগ করি—নিঃশব্দ রাত, ঝিঝিপোকার ডাক, মাঝে মাঝে নাম না জানা পাখির ডাক, আর ট্রেনের ঝকঝক শব্দ। ঝকঝক! হাহা। ছোটবেলায় শামসুর রাহমানের "ট্রেন" কবিতায় পড়েছিলাম, ট্রেন নাকি ঝকঝক শব্দ করে। তখন তো ট্রেন নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না, কিন্তু এখন ট্রেন আমার সব থেকে বেশি ভালো লাগে। কারণ, একমাত্র এখানে এসে অনেক ধরনের মানুষের দেখা মেলে।
প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে, বসে আছি। ট্রেন নাকি আরো ৩০ মিনিট দেরিতে আসবে। আজ নিশ্চয় মা ভীষণ বকবে। ট্রেনের অপেক্ষায় হুমায়ূন আহমেদের একটা গল্প পড়ছিলাম—ওনার লেখা গল্পগুলো বরাবরই আমার ভালো লাগে। কিছুক্ষণ পরে ট্রেনের ঘণ্টা বেজে উঠলো। এর বেশ কিছুক্ষণ পরেই ট্রেন মহাশয়ের দেখা পেলাম। ট্রেনে উঠতে উঠতেই একটা আপুর ব্যাগ ছিনতাই হয়ে গেলো। আপুটির কান্না দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এরা এমন কেন? কারো অতি মূল্যবান জিনিস নিয়ে তাকে কষ্ট দিয়ে কি সুখ পায় তারা?
আজ যতোটা ভালো মন নিয়ে হোস্টেল থেকে বেরিয়েছিলাম, ততটাই মন খারাপ হয়ে গেলো। কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ কীভাবে আনন্দ পেতে পারে, এটা ভাবতে ভাবতে আমি জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দেখতে বেশ ভালো লাগে। ঢাকা থেকে বাড়ি যেতে ৭-৮ ঘণ্টা লাগে। মাকে জানাইনি যে আমি রাতে বের হয়েছি। ভাবলাম, বাড়ি গিয়ে মাকে চমকে দেবো। মায়ের সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ অন্যরকম মধুর। মায়ের জন্যই এ পর্যন্ত আমার সব স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। অন্যথায় তো অনেক আগেই বিয়ে হয়ে যেত এবং সম্ভবত ৩-৪টা বাচ্চাও থাকতো। আমার বাবা, ছোট থেকেই বেশ রাগী, অনেক ভয় লাগে তাকে। আজ শুরু থেকেই ট্রেনটা ভীষণ  ধীরে চলছিল, কিন্তু এত ধীরে তো আগে কখনো চলতে দেখিনি।
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। সামনে সিটে একজন লোক বসে ছিল এবং অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে কিছু অদ্ভুততা ছিল, যেন কিছু বলতে চাচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে, এক বৃদ্ধার কান্নার হালকা শব্দ ভেসে আসলো। আমি চেষ্টা করছিলাম বোঝার, তবে কিছুই স্পষ্ট হচ্ছিল না। 
অদ্ভুত এক শূন্যতা চারপাশে বিরাজ করছিল। সব কিছু থমকে গিয়েছিল, সময়ও যেন স্থির হয়ে গেছে। হঠাৎ ট্রেনের শব্দ আরও জোরে বাজতে শুরু করলো। কেমন যেন এক অস্থিরতা, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে মনে হচ্ছিল। তারপর, ট্রেনটি ঢাকার স্টেশন থেকে ছেড়ে গেলো। জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশে কিছু তারার ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল। সময় যেন আরও বেশি অদ্ভুত হয়ে উঠছিল।
ট্রেনটি ধীরে ধীরে চলছিল। জানালার বাইরে অন্ধকার চারপাশ। ঝকঝকে শব্দ আর মাঝে মাঝে পাখিদের অদ্ভুত ডাকের মাঝে এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। মায়ের ফোনে বলা শেষ কথাগুলো বারবার মনে হচ্ছিল আমার—কেন তিনি এত জরুরি ভাবে যেতে বললেন? মনে মনে খুব অস্থির লাগছিল, কিন্তু কিছুতেই কারণটা বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
এক সময় ঘুম ঘুম ভাব এলো। ঠিক তখনি, পাশের সিটে বসা লোকটা আবার আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে অদ্ভুত চাহনি। সে নিচু গলায় বললো, “তুমি জানো না, কিন্তু তুমি যা ভাবছো, তা সত্যি নয়।”
আমি চমকে গেলাম, “মানে? আপনি কী বলতে চাইছেন?”
লোকটা আর কিছু বললো না। হাসলো—একটা অদ্ভুত হাসি, যেন সে কিছু জানে যা আমি জানি না।
এরপর হঠাৎ ট্রেনের আলো নিভে গেল। একটা ঝটকা দিয়ে ট্রেন থেমে গেল অজানা কোনো জায়গায়। যাত্রীদের মধ্যে হইচই শুরু হলো। আমি উঠে জানালার বাইরে তাকালাম। কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছিল না—কেবল অন্ধকার।
পাশের লোকটা তখনও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার তার কণ্ঠে কেমন যেন রহস্যের ছোঁয়া। সে বললো, “তোমার গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সত্যিটা জানতে হবে। কিন্তু তুমি প্রস্তুত তো?”
আমি কিছু বলার আগেই ট্রেন আবার চলতে শুরু করলো। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, এই রুটটা আমি আগে কখনো দেখিনি। চারপাশে কুয়াশা জমে আছে।
হঠাৎ, আমার ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে মায়ের নাম ভেসে উঠলো। কল রিসিভ করতেই মা’র ভয়াল গলা শুনলাম, “তুই কোথায়? ট্রেন থেকে নেমে যা! এখনই! ট্রেনটা আর কখনো গন্তব্যে পৌঁছাবে না।”

গল্প: গন্তব্য (Part-01)
লেখায়: জেবা আনিকা