“ বয়স হইছে, বড় হইছি এখন কি আর ঈদের কেনাকাটা করার উপায় আছে!”
“ আমাদের মতো ফ্যামিলির তো ছোট বেলায়ও সেটার সুযোগ নেই।”
“ আজকে দেখলাম চৌধুরীর ছেলে সবুজ নতুন মোটরসাইকেল নিয়ে বাজারে দাড়ায় আছে। খোদার কি বিচার, যারে দেয় তারে সবটা দেয়; আর যার নাই তো কিছুই নাই।”
“ ভাবিস না এগুলা, যা হয় ভালোর জন্য হয়।”
— এই বলে সিধু, সেলিমকে সান্ত্বনা দিল।
সিধু আর সেলিম চাচাতো ভাই। দুজনেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে; সিধু বড় আর সেলিম ছোট। তবুও মাঝে মাঝে বাস্তবতার চার দেয়ালের অন্ধকারে সিধু নিজেকে হারিয়ে ফেলে; নিজেকে তুলনা করতে শুরু করে অন্যদের সাথে। দুই ভাই মানুষের জমিতে কাজ করে, দিনে এনে দিন খায়। সিধুর মা বাবা বছর কয়েক আগে মারা গেছেন আর সেলিমের বাবা অসুস্থ, মা নেই। সিধুর সংসারে সে-ই একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি। বাচ্চা, বউ, ছোট বোন নিয়েই তার পরিবার। সেলিম তার বাবার চিকিৎসার খরচ চালায়, আর তার বড় দুই ভাই সংসার চালায়। যদিও সেলিম অনেক কথা শোনে কারণ সংসারে কোনো টাকা দিতে পারে না; বাবার ওষুধের টাকা জোগাড় করতেই তার পড়াশুনা বন্ধ করতে হয়েছে।
সিধু আর সেলিম একসাথেই কাজ করতে গেছে আজ, সেই থেকেই তাদের ভাগ্যের প্রতি করুণা হয়; যেনো তারাই সৃষ্টিকর্তার করুণার পাত্র, নির্মম পরিহাসের উদাহরণ। খেটে খাওয়া মানুষেরও যে ঈদ আছে, তাদেরও যে আনন্দ করতে মন চায়, পরিবারের সকল সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে চায়, একটু সুখ চায়। দিন শেষ চায় এক টুকরো প্রশান্তি, চিন্তা মুক্ত নিদ্রা, আর ঝামেলা মুক্ত জীবন। বেশি কিছু নয়, তারা হয়তো লক্ষ লক্ষ টাকা চায় না, চায় না বিশাল আলিশান বাড়ি, রেস্টুরেন্টে বিলের লম্বা লিস্ট — চায় হয়তো মাথা গোঁজার একটু আশ্রয়, দিনের তিন বেলা সবার খাবার, ছোট ছোট ইচ্ছে গুলোর একটু আধটু পূর্ণতা ; এইতো সামান্যতেই তাদের জীবন সুন্দর, নির্ভেজাল, শান্তির, আনন্দের।
ঈদের কেনাকাটা হোক বা কোরবানির গোস্ত – খুঁজলে বোধহয় দেশে অনেক অনেক মানুষ পাওয়া যাবে যাদের পরিবারে দুইটার কোনোটাই পৌঁছায় না। চোখের কোণায় না পাওয়ার ব্যথা তাদের জীবন বিষণ্ন করে তোলে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটাও দিন শেষে হতাশায় নিমজ্জিত হয় এই ভেবে যে পরিবারের বড়দের কথা বাদ দিয়ে হলেও ছোট বাচ্চা গুলোর শখ, ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে তারা ব্যর্থ। তেমনই সিধু আর সেলিম হতাশায় ডুবে তো ছিল, কিন্তু প্রকাশের কোনো অধিকার ছিল না কারণ তারা বড়,তারা ছেলে, তাদের উপরেই সংসারের দায়িত্ব। তাদের জীবনে চলার পথ আছে অথচ সেই পথ মসৃণ, সরল নয়। কঠিনত্ব, দারিদ্রতা, শান্তিতে বাঁচার ইচ্ছে, সমাজের অবহেলা তাদের ঘিরে রেখেছিল।
অন্যদিকে, সবুজ — বাবার একমাত্র ছেলে, বলতে গেলে বাপের বিগড়ানো ছেলে। টাকার মূল্য তার আছে নেই, বিনা বাধায় সব উড়িয়ে দিচ্ছে অপ্রয়োজনীয় শখ আহ্লাদে। সিধু ও সেলিম তার সাথে নিজেকে একবার তুলনা করে, আরেকবার নিজেকেই নিজের সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। একদিন সন্ধ্যায় সেলিম বাজারে গেছে, হঠাৎ সবুজ মোটরসাইকেল নিয়ে তার সামনে দাঁড়ায়।
“ কিরে ফকি’ন্নির বা’চ্চা, দেখে শুনে হাঁটতে পারিস না?”
“ গালি দিস কেন? তোকে আমি কিছু বলছি? আমি তো রাস্তার ধার দিয়েই হাটতেছি।”
“ এই কু’ত্তার বা’চ্চা তোর এত বড় সাহস মুখে মুখে কথা কইস! রাস্তা কি তোর বাপের নাকি রে?”
“ আমার বাপের না যেমন, তোর বাপেরও তো না।”
[ সবুজ অনেক জোরে সেলিমকে থা’প্প’ড় মা’রে। এই দেখে অনেক লোকজন এসে হাজির হয়]
“ দেখো দেখো, জহিরের বেটা মোর মোটরসাইকেল ভাঙ্গি দিছে।”
[ সেলিম অভাক হয়ে তাকিয়ে রয়, কোথা থেকে মোটরসাইকেল ভাঙ্গা এলো সে নিজেও জানে না]
মুরুব্বি লোকেরা সেলিমকে মাফ চাইতে বলে, কিন্তু সে নিজেকে ছোট করবে না নিজের কাছে, কারণ সে সত্যিটা জানে। কিন্তু সবুজ নাছোড় বান্দা, পুরো বাজার হৈ হৈ করে ছড়িয়ে দিলো মিথ্যে কাহিনী; যেনো সেলিম দোষী।
ঈদের মাত্র দুইদিন বাকি, মালিকের থেকে টাকা নিয়ে বাজার খরচ করতে এসেছিল সেলিম; ভাগ্যের কি নির্মম খেলা, এমন দিনেও তার শান্তি নেই। এদিকে সবুজ ভুলতেই পারছে না সেলিম তার প্রতিটা কথার উত্তর করেছিল, এটি যেনো তাকে আরো ক্ষুব্ধ, রাগান্বিত করে তুলছে। রাগ মানুষের ধ্বংসের একটি বিশেষ কারণ, এই রাগ পারে না এমন কিছু নেই। রগচটা সবুজ এলাকার সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে যে সেলিম তার সাথে কি করেছে। তার বাবা তাকে শান্ত করতে চাইলেও তিনি ব্যর্থ হন, সামান্য কারণে কেনো এতো রাগ তার বাবা বুঝতে পারছে না। পরের দিনটা কেউ কল্পনা করেনি।
বিচার বসে কিন্তু মোটরসাইকেল ভাঙ্গার অপরাধে নয়, সেলিমকে রাতে সবুজের বোনের ঘরে পাওয়া গেছে অজ্ঞান অবস্থায়– এই অপরাধে। রাগ, হিংসা, করুণা নাকি অন্যকিছু!! কি ছিল এই ঘটনার মূল বিষয় সেটা কেউ উন্মোচন করতে পারলো না। সত্যিটা শুধু সেলিম আর সবুজ এই জানতো। এত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ভয়ে সেলিম নিজেকেই শেষ করে দিলো রাতের আঁধারে। সবুজকেও পরের দিন থেকে পাওয়া গেলনা। কি ঘটেছিল সেই রাতে, কি কারণ ছিল তা অজানাই রয়ে গেলো ।
ঈদের উছিলায় আনন্দ, খুশি বাড়িতে বিরাজমান হওয়ার কথা ছিল, উল্টোদিকে নেমে এলো কালো রঙের আভাস। দুই পরিবারেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এদিকে সেলিমের বাবার অবস্থাও খুব একটা ভালো না।
