হাওয়াই মিঠাই স্মৃতি

হাওয়াই মিঠাই স্মৃতি

তখন আমার মাত্র সাত বছর বয়স। সময়টা অনেক আগে। দুই হাজার দুই সালের ফেব্রুয়ারী মাসের কোন এক শুক্রবার। আব্বু আম্মু ঠিক করলো আমাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে বইমেলায় যাবে। উনিশ শতকের দিকে বইমেলা ছিলো মানুষের প্রাণের মেলা। প্রতি বছরের বইমেলা, বইপ্রেমী হোক কিংবা জনসাধারণ সবার জন্য একটি উৎসব এর মতো। আব্বু আম্মু আমি ছোট ভাই সবাই আমরা বইমেলার উদ্দেশ্যে বিকেলে রওনা দিলাম। গন্তব্যে পৌঁছে আমাদের সবার চক্ষু চড়কগাছ!

 

একি অবস্থা! চারিদেকে লোকজনের মহা সমুদ্র। এই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সময়মতো কি ভেতরে প্রবেশ আদৌ করা সম্ভব! তবে এত দূর যেহেতু চলে এসেছে, এইটুকু পথের জন্য তো আর ফিরে যাওয়া যায় না। তাই সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে আব্বু আমাদের সবাইকে নিয়ে ভিড়ে প্রবেশ করলো। এত খানি ভিড় আজ, যে মেইন গেইট খোলা থাকা সত্ত্বেও সবাই পিপড়ের গতিতে এগোচ্ছে। একটু একটু করে আমরা এগোতে লাগলাম। ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গেলেও বোধ হয় এর চেয়ে দ্রুত লাইন এগোয়। যেতে যেতে আব্বু আম্মু একে অপরকে বলছে, আজ ভেতরে ঢুকতে পারবো গো?!

 

যে অবস্থা ভীড়ের, এমন হওয়ারও সম্ভাবনা আছে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মেইন গেইট বন্ধ হয়ে যাবে। এমন হলে কষ্টের সীমা থাকবে না। সেই বিকেল সাড়ে চারটায় এসে এখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে। আব্বু একবার ভাবছে ফিরে যাবে কিনা, কারণ আকাশে গোধূলির রং ছুঁয়ে আঁধো আলোয় সয়লাব চারিপাশ। রাত প্রায় হয়ে এলো বলে। আবার ভাবছে, নাহ, এতদূর এসে হেরে যাওয়া যাবে না। এইতো আর একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। ঐ যে মেলা, খুব কাছে। আজ মেলায় বাচ্চাদের ঘুরিয়ে তবেই বাড়ি যাবে। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যাথা হয়ে যাবার জোগাড়। কিন্তু তারপরও আমাদের একটুও কষ্ট হচ্ছে না যেন; মেলায় যাবার আনন্দে!

 

আম্মু আমাদের উজ্জীবিত করতে বললো, আজকে আমার আম্মুরা বেশি অপেক্ষা করেছে, তাই আজকে বেশি বই কিনে দিবো, ঠিকাছে? অবশেষে অপেক্ষা শেষ হলো। আমরা মেইন গেইট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। অলরেডি তখন রাত হয়ে গিয়েছে, বাসা এখান থেকে বেশ দূরে তাই বেশিক্ষণ মেলায় থাকা যাবে না। আব্বু একটা স্টলে এসে দাঁড়ায় যেখানে বাচ্চাদের মজার মজার গল্পের বই পাওয়া যায়। ঈশপের গল্প, তুষার কন্যা, সিন্ডারেলা, বিজ্ঞানের মজার এক্সপেরিমেন্ট, রুপকথার গল্প, বীরবল ইত্যাদি।

 

বই গুলোর রঙ বেরঙের প্রচ্ছদ দেখে আমার আর আমার ভাইয়ের বেশ পছন্দ হলো। আনন্দ আরও বেড়ে গেলো যখন আব্বু পকেটে হাত ঢোকালো। তারমানে একটু পরেই এই সব গুলো বই আমাদের হবে! পকেটে হাত ঢুকিয়ে আব্বু কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলো। এতক্ষণ ঠোঁটে লেগে থাকা হাসিটাও মিলিয়ে গিয়েছে। কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পেরে আম্মু জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে। আব্বু বললো পকেটে একটা টাকাও নেই। বেশ কিছু টাকা নিয়ে আব্বু বেরিয়েছিলো স্পষ্ট মনে আছে আম্মুর। কিন্ত এখন পকেট একেবারে ফাঁকা!

 

কি ঘটেছে আম্মু আব্বুর কারোরই বুঝতে বাকি রইলো না। ভিড়ের সদ্ব্যবহার করেছে ছিনতাইকারীরা। কি আর করা, এ বার তাহলে আর বই কেনা হবে না। বই যেহেতু কেনা হবেনা তাই এখন বাড়ি যাবার পালা। রাতও অনেক হয়েছে। আমরা গেইট এর উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকলাম। হঠাৎ আব্বু বলে উঠলো, এই একটু ওদেরকে নিয়ে সাইডে দাঁড়াও, আমি এক্ষুণি আসছি। এই বলে আব্বু একটা জটলায় হারিয়ে গিয়ে আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা দিলো। দেখি আব্বুর হাতে গোলাপি হাওয়াই মিঠাই আমাদের জন্য!

 

ওমা, টাকা পেলে কোথায়? আমার প্যান্টের গোপন পকেটে অল্প কিছু টাকা ছিলো। ওগুলো নিতে পারেনি। আব্বু, আমি আর আম্মু হাসতে হাসতে শেষ। তারপর আমরা রিক্সায় উঠে হাওয়াই মিঠাই খেতে খেতে বাড়ি চলে আসলাম!