নিজেকে ভালো রাখবো কিভাবে?

নিজেকে ভালো রাখবো কিভাবে?

 
 
সারাদিনের হাজারো একটা ব্যস্ততা, হাজারটা দায়িত্ব সামলানোর পরে সারাদিন শেষে আমরা নিজেকেই অনেক সময় প্রশ্ন করি যে, “আমি কি ভালো আছি? এটাই কি আমি চেয়েছিলাম? “। সত্যি বলতে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না, কিন্তু নিজে ভালো থাকার দায়িত্বটুকুনও কিন্তু নিজের উপরেই বর্তায়। সমস্যার শুরু তখনই ঘটে যখন মানসিক নির্ভরতা চলে আসে অন্যের উপরে। নিজের দুঃখ, কষ্ট আর স্ট্রাগল গুলিও শুধু নিজেরই। তাই আপনার ভালো থাকার দায়িত্বটা আজকে থেকেই কোমড় বেধে নিজেকেই নিয়ে নিতে হবে। বর্তমানে প্রত্যেকেরই জীবন অনেক কঠিন, এর মধ্যে আমরা ভুলে যাই নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা। ভুলে যাই যে মনেরও যত্নের প্রয়োজন, আর আমরা নিজের মনের যত্ন বা শরীরের যত্ন নিতেই বেশি অবহেলা করি। যা ভবিষ্যতে জন্ম দেয় পাহাড়সম আফসোসের। অনেকেই আছেন যারা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না যে কিভাবে নিজেকে ভালো রাখা যায়। তাদের জন্য আমার আজকের এই ব্লগ। তাহলে চলুন জেনে নিই কিছু সম্ভাব্য উপায় এবং টিপস গুলোঃ
 
১। সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্যঃ আপনি যেই ধর্মের অনুসারীই হয়ে থাকুন না কেন, সকলকেই একদিন ফিরতে হবে স্রষ্টার কাছে। আর প্রতিটি ধর্মই বলে শান্তির কথা। আপনার ধর্মের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে, প্রতিদিন অবশ্যই ধর্মীয় চর্চা করতে হবে। দিনের শুরুটাই হোক স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে। তাহলে মন তাজা থাকবে এবং আপনিও সারাদিনের পরিশ্রমের জন্য আত্নবিশ্বাসী মনে করবেন নিজেকে।
 
২। মনের উপর জোর খাটাবেন নাঃ আপনি কি চান, কি আপনাকে আনন্দ দেয়, কোন ব্যাপারটা আপনাকে আত্নবিশ্বাসী অনুভব করায়, এমন কাজ করার চেষ্টা করুন। ভালো লাগে না, কিন্তু কাজটা অপরিহার্য এমন পরিস্থিতি ছাড়া যা আছে, আপনার ভালো লাগে না তা আজই জীবন থেকে বাদ দিয়ে দিন। মানসিক শান্তি বিনষ্টের যতো কারণ আছে, সব ছেটে ফেলতে হবে। আচ্ছা এভাবে ভাবুন না, আপনার ঘরের কোনো গাছ যখন পোকায় ধরে বা কোনো ডাল শুকিয়ে বা পচে যায়, আপনি তখন কি করেন? গাছটি ছেটে ফেলেন, যেই ডাল-পাতা গুলো ভালো, সেগুলোই রাখেন এই আশায় যে এখান থেকে গাছটি আবার বেড়ে উঠবে। আমাদের জীবনটাও তেমন, সব খারাপ জিনিস বাদ দিয়ে শুধু ভালো টুকু নিয়েই আগাতে হবে। কখনো কখনো ভালো স্মৃতিও ভুলে যেতে হয় ভালো থাকার জন্য।
 
৩। নিজের জন্য সময় বের করুন: প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় নিজের জন্য রাখাটা খুব জরুরি। কাজ, দায় দায়িত্ব জীবনেরই অংশ, এগুলো থাকবেই। কিন্তু এতো স্ট্রেস নিতে নিতে আপনি হাপিয়ে গেলে, কেউ কিন্তু সেটা বোঝার চেষ্টা করবে না। প্রতিদিন একটা সময়ে নিজের পছন্দসই কাজ গুলো করতে পারেন। যেমন : বই পড়া, মুভি বা সিরিজ দেখা, লেখালিখি করা, ক্রাফটিং, রান্না, পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়া, গান শোনা ইত্যাদি ইত্যাদি। যা আপনার পছন্দ বা শখ, এই সময়টুকুতে করবেন। এবং একাই করার চেষ্টা করবেন। খুব স্ট্রেসফুল লাইফ যাদের, তারা এভাবে মেইনটেইন করতে পারলে, স্ট্রেস কমে আসবে অনেকটাই। কারণ তখন আপনার সারাক্ষণ আর মনে হবে না যে আমি সারাদিন সবার জন্য কত কিছু করি, আমার জন্য কেন কেউ করে না। মনে রাখবেন যে "আফসোস" কখনোই ভালো থাকতে দেয় না।
 
৪। পজিটিভ থাকাঃ আপনার সাথে যাই ঘটুক না কেন, সেখান থেকে পজেটিভ অংশটুকু রেখে বাকিটা ভুলে যান। মানুষ চাইলে ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে আবার ভাগ্যের উপরে অনেক কিছু নির্ভরও করে। খারাপ কিছু ঘটলে তার থেকে শিক্ষা নিন, যাতে আর এই বিপদ না ঘটে। হতাশ হবেন না এবং বিষন্নতায় ভুগবেন না। কারণ এগুলো জীবনের কষ্ট গুলো কে আরও ত্বরান্নিত করে। অনেক সময় কষ্টের কথা শেয়ার করলে কমে। পরিবার, বা বন্ধুবান্ধব কে চাইলে বলতে পারেন। কিন্তু দেখবেন তা যেন সমালোচনায় রুপ না নেয়। একই ভাবে লাইফে যারা শুধু নেগেটিভ কথা বলে বা চিন্তা করে, কথায় কথায় সমালোচনা করে তাদের থেকে কৌশলে দূরে থাকবেন। যারা আশার কথা বলে, বাস্তববাদি এবং পজেটিভ মাইন্ডেড এমন মানুষদের সাথে কানেক্টেড থাকার চেষ্টা করবেন। ভালো কোনটা, খারাপ কোনটা নিজেকেই খুজে বের করতে হবে। একেবারেই তেমন না পেলে তখন সাইকোলজিস্ট এর সাথেও কথা বলতে পারেন। অন্যের উন্নতিতে খুশি হন, এবং প্রশংসা করুন। দেখবেন নিজেরই ভালো লাগাটা বাড়বে। যা আপনার নেই, তা অন্যের থাকলে তা দেখে কষ্ট না পেয়ে এভাবে ভাবুন যে, যা আমি পাইনি তা ও পেয়েছে, দারুন এটা। আর নিজেও কিভাবে তা অর্জন করতে পারেন, সেই উপায় খুজতে পারেন।
 
৫। স্কিল ডেভেলপমেন্ট, এক্সপেরিমেন্ট : নিজেকে ভালো রাখার এবং একাকিত্ব দূর করার একটা ভালো উপায় হলো নতুন কিছু শেখা। ভেবে দেখুন এমন কিছু কি ছিলো যা আপনি শিখতে চেয়েছেন কিন্তু পারেন নি। যা কিছু হতে পারে সেটা হাতের কাজ, ডিজিটাল কোনো স্কিল, কোনো কোর্স বা অন্য যেকোনো কিছু। এতে আপনার দীর্ঘ সময় ব্যায় হবে, এবং মন যেকোনো একাকীত্ব বা স্ট্রেস থেকে মুক্ত হবে। যেমন: যারা রান্না করতে ভালোবাসেন তারা নতুন নতুন রেসিপি ট্রাই করতে পারেন, যারা ড্রেস ডিজাইনিং, টেইলরিং পারেন তারা নিত্যনতুন ড্রেস বানানোর ট্রাই করতে পারেন। যারা লিখালিখি পারেন তারা কন্টেন্ট রাইটিংটাই শিখে ফেলতে পারেন, শিখতে পারেন ডিজিটাল মার্কেটিং ও। যাদের বাজেট স্বল্পতা আছে তারা ইন্টারনেট থেকে অনেক ফ্রি রিসোর্স পেয়ে যাবেন। খুজতে হবে এবং এই খোজাখুজি করতে গিয়েও আপনার সময়টা ভালো কাটবে।
 
৬। নিজেকে ব্যস্ত রাখাঃ কথায় আছে অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। এই স্টেপটা তাদের জন্য যারা এখনো স্টুডেন্ট বা কর্মক্ষেত্রে ঢোকেননি । আপনাকে নানান কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে। হতে পারে তা ঘরে বা বাইরে যেকোনো কিছু প্রয়োজন অনুসারে। খুব ভালো হয় যদি নিজের আর্নিং সোর্স থাকে। কারণ এর পিছনেই আপনার অধিকাংশ সময় ব্যয় হবে। ব্যবসা অথবা চাকরি, টিউশনি, ফ্রিলান্সিং যাই হোক না কেন। কিন্তু আবার কাজ কাজ করেও সারাদিন পাড় করলে হবে না। আর যারা ফ্যামিলির সাথে থাকেন ঘরের কাজেও অবশ্যই হাত লাগাবেন। এরমধ্যেই নিজের জন্যেও সময় রাখবেন অবশ্যই।
 
৭। সলো ডেট: যারা আমার মতোই ইন্ট্রোভার্ট এবং ঘুরতে যাওয়ার মানুষ পান না, তাদের জন্য এটা স্ট্রেস কাটানোর ভালো উপায়। মাসে একদিন একাই ঘুরতে যেতে পারেন। একটা লিস্ট বানাবেন যেখানে আপনার প্রিয় রেস্টুরেন্ট গুলো থাকবে। মাসে একটা প্রিয় রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে , পছন্দের খাবার খেতে পারেন। সাথে ল্যাপটপ বা বই নিয়ে যেতে পারে। cozy কোনো ক্যাফে তে বসে , এককাপ কফি খেতে খেতে বই পড়তে পারেন, সিরিজ এনজয় করতে পারেন, চাইলে জার্নালিং করতে পারেন কিংবা এই সপ্তাহের to-do list বানিয়ে ফেলতে পারেন, প্রিয় কোনো জায়গা থেকে ঘুরেও আসতে পারেন, মুভি দেখে আসতে পারেন, ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যেতে পারেন, সুযোগ থাকলে সলো ট্যুরেও যেতে পারেন ইত্যাদি।
 
৮। মুভি নাইট: সত্যি বলতে অনেক সময় অনেক ইচ্ছা থাকলেও সময়, সুযোগ , অর্থ ও একটা বড় ব্যাপার বটে। সেইক্ষেত্রে রিক্রিয়েশন এর জন্য মুভি নাইট একটা দারুন ব্যাপার। আপনার ডিভাইসেই দেখার জন্য একটা মুভি সিলেক্ট করবেন এবং সাথে কিছু স্ন্যাকস ও রেডি করতে পারেন। ইন্টারনেট ঘাটলে অনেক অনেক সলো মুভি নাইটের আইডিয়া পাবেন।
 
৯। কনফিডেন্ট থাকুন: মনে রাখবেন যা আপনাকে লো ফিল করাবে, সেটার থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। কে কি বললো, কে কি ভাবলো এতো কিছুতে কান দেবেন না। আপনি যদি মনে করেন প্রতিদিন রেড লিপ্সটিক ক্যারি করলে আপনি নিজেকে কনফিডেন্ট মনে করেন , তবে সেটাই করবেন। হ্যা আমাদের সব কিছুই পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, রুচি আর বয়সের সামঞ্জস্ব রেখে করতে হয়, তবে তা স্বত্তেও নিজেকে কনফিডেন্ট রাখা সম্ভব যদি আপনি চান। কোনো কোনো রং খুব কনফিডেন্ট ফিল করায়,তাহলে মন খারাপের দিন গুলোতে সেই রং এর পোষাক আরও বেশি পরুন। নিজেকে ভালো ভাবে গ্রুমিং করুন, পার্সোনাল হাইজিন এর প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হন। সব সময় পরিষ্কার এবং পরিপাটি থাকলে মন অনেকটাই ভালো থাকে।
 
১০। পছন্দের জিনিস কেনাঃ আমরা অনেক সময় বেহিসাবি খরচ করি,কখনও মন কে কষ্ট দিয়ে কিছুই কিনি না। আসলে দুইটার একটাও ঠিক না। প্রতিমাসেই নিজের খুব শখের বা পছন্দের একটা জিনিস নিজেকে গিফট দিন। এতে বিশ্বাস করুন অনেক শান্তি পাবেন।
 
১১। পর্যাপ্ত আহার ও ঘুম: প্রতিদিন পেট ভরে পুষ্টিকর খাবার খান, হেলথি ডায়েট ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে, তাহলে মনের স্ট্রেস গুলোও অনেকখানি কমে আসবে।
 
১২। করতে পারেন এক্সারসাইজ : নিয়মিত হালকা ব্যায়াম মন কে চাঙ্গা রাখতে অনেক উপকারি। এতে করে মনের উপর চাপ কমে এবং শান্তি মেলে। জিমে ভর্তি হতে পারেন, মার্শাল আর্ট ও শিখতে পারেন। আর কোনোটাই সম্ভব না হলে ইন্টারনেট এ টিওটোরিয়াল দেখেও প্রতিদিন ইয়োগা বা ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ রপ্ত করতে পারেন।
 
ডিপ্রেশন, একাকীত্ব - এগুলো হলো জীবন ধংস করে দেয়ার মতো কিছু নাম। এগুলো কে জীবনে জায়গা দেয়া যাবে না। আপনি যখন নিজেকে ভালো রাখবেন, যত্নে রাখবেন, নিজেকে ভালোবাসবেন তখন কেউই আপনাকে টেকেন ফর গ্রান্টেড নিতে সাহস পাবে না। আপনার নিজের কারণেই নিজেকে সুস্থ, সুন্দর রাখা প্রয়োজন। অন্যের সাথে ইমোশনালি এটাচড হবে না। এতে আপনার কষ্ট কোনোদিন কমবে বা। নিজেকে ভালো রাখা টা কিছুটা কঠিনই, তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নিজে চাইলে এর থেকে সহজ কিছুই বোধহয় নেই। শুরুটা সহজ হবে না।কিন্তু ধীরে ধীরে আপনিও নিজেকে এক্সপ্লোর করতে করতে বুঝতে পারবেন, এটা আগেই কত টা প্রয়োজন ছিলো। নিজের মনের দায়িত্ব আর কেউ নিজের থেকে বেশি ভালো নিতে পারে না।
 
আশাকরি আজকের এই টিপস গুলো সকলের কাজে লাগবে। সবাই মানসিক ভাবে সুস্থ রাখবেন নিজেকে এবং অবশ্যই আজকে থেকেই নিজেকে ভালো রাখতে সচেতন হবেন।