নিশিপদ্ম

নিশিপদ্ম

কাঁদো কাঁদো হয়ে মুখ ভার করে আছে দুঃখবিলাসী আকাশ। যেনো এক্ষুনি ভেঙে পড়বে কান্নায়। অফিস শেষে বাসস্ট্যান্ডের দিকে ছুটলো তুশি। বাস পেয়েও গেলো। সবসময় সামনের দিকেই বসে কিন্তু আজ ফাঁকা না পেয়ে একটু পেছনে বসলো। পাশের মানুষটার দিকে নজর পড়তেই খেয়াল হলো সে একমনে গান শুনছে। বয়স আনুমানিক তার মতোই হবে।

 

~কি গান শুনছো?

ছেলেটা শুনতে পেলো না মনে হলো।উত্তরের অপেক্ষা না করে তুশি নিজের গণ্ডির সীমানার ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে আরাম করে বসে বাসের দুলুনিতে দুলতে লাগলো।

 

কিছুক্ষণ পর ছেলেটা মাথা তুলে সামনের দিকে উঁকি দিয়ে কিছু একটা খেয়াল করলো। তারপর কেমন যেন ভাবলেশহীন মুখ করে উদাস হয়ে রইলো।আশেপাশের মানুষদের অবসার্ভ করতে ভালই লাগে তুশির। একটা বইয়ে ওয়েভি হেয়ার স্টাইল এর কথা পড়েছিলো যার অর্থ করলে দাঁড়ায় ঢেউ খেলানো চুল। ঘন কালো চুলে একটা ঢেউ এর মতো খেলে যাওয়াকেই বোধ হয় বোঝায়। হঠাৎ ওয়েভি হেয়ারের কথা মনে পড়লো এই ছেলেটার চুল দেখে। একই সাথে আরেকটা ব্যাপার অনুধাবন করলো সে। ঢেউ খেলানো চুলে ছেলেদের অবাক করা আকর্ষণীয় লাগে! ভাবতে গিয়ে আপনমনেই হেসে ফেললো সে।

 

একটু পর খেয়াল করলো ছেলেটা মোবাইল চালাচ্ছে। মনে হলো এখন একটু কথা বলা যায়।খানিকটা কেশে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো,

 

~গান শুনতে খুব ভালবাসো?

~উমম্, আমাকে বলছেন?

~জ্বী, তোমাকেই, সরি বোধ হয় বিব্রত করলাম।

~না, ইটস ওকে, গান টুকটাক শুনি আরকি। কোথায় নামছেন আপনি?

~সব সময় মালিবাগ নামি, আজ একটু আগেই শাহবাগ মোড়ে নেমে যাবো।

~কোন বিশেষ মিটিং? স্পেশাল কেউ?

~না না, তেমন কিছু না, আমি ফুল খুব ভালবাসি, প্রায়ই কেনা হয় এখানে এসে, যদিও….বিশেষ কেউ নেই ফুল দেয়ার মতো।

~কি বলেন! আপনার বিশেষ কেউ নেই! না না, এটা বিশ্বাস করতে বলবেন না প্লিজ।

~কেনো বলুন তো!, হেসে উঠে বললো তুশি

~কেনো? কবিতায় পড়েননি?

 

       দীর্ঘ রজনী বিরহে কাঁদিয়া সখা কহে,

          হে রমণী, বলিয়াছি বিশেষ,

      তোমারই প্রণয়ে মম করে দাও নিঃশেষ

 

~বাহ! দারুণ আবৃত্তি করেন তো! যদি কাউকে ভালো লাগে তাকে অবশ্যই শোনাবেন, একদম পটে যাবে।

~সত্যি বলছেন? আসলেই পটবে?

~হ্যাঁ, হ্যাঁ, একদম!

 

ওর দিকে সরাসরি তাকালো ছেলেটা। কি সুন্দর চোখ! তুশি, তুই এবার শেষ।গভীর কালো চোখ ব্ল্যাকহোলের মতো যেন সমস্ত পৃথিবীকে নিজের দিকে টানছে। সবকিছুর সাথে তুশির হৃৎপিণ্ডও ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে!পেটের ভেতর যেন প্রজাপতি উড়ছে!

 

বেশ কিছুক্ষণ নিরবে বয়ে গেলো সময়, নিরবতা ভেঙে ছেলেটি বললো,

~আরেকটু সামনেই শাহবাগ, একটা উপকার করবেন?

~জ্বী অবশ্যই, বলুন।

~ওই যে সামনের সিটে একটি মেয়েকে দেখতে পাচ্ছেন, সবুজ ওড়না?

তুশি তাকালো সামনে,

~হ্যাঁ, কে হয় আপনার?

~আমার স্ত্রী, আর বলবেন না, আমার সাথে রাগ করে দূরে বসেছে। তাই ভাবছি কি করে ওর মন ভালো করা যায়!

 

তুশি হঠাৎ ঢোক গিলতে একটু কষ্ট বোধ হতে লাগলো। মনে হলো একটা গোলাপ ছিড়তে গিয়ে কাঁটা বিঁধে যন্ত্রণা দিচ্ছে!একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

 

~ফুল পছন্দ করে না পৃথিবীতে এমন কোন মেয়ে নেই। তবে সাদা গোলাপ মেয়েদের বিশেষ ভাবে প্রিয়। শাহবাগে আবুল চাচার একটা দোকান আছে একটু সামনে।এইতো সামনের চার পাঁচটা দোকানের পরই পেয়ে যাবেন। ভালো থাকবেন আপনারা দুজন, আসি আমি।

 

বলেই তুশি নেমে গেলো। পেছনে পরে রইলো তার ক্ষনিকের মোহমায়া। আফসোসটা এক কাপ চায়ে গিলে নেয়ার চেষ্টা করলো ল্যাম্পপোস্টের আলোয়। তারপর ফুল কিনে নিলো কিছু। সাদা গোলাপগুলোর সুবাস নিতে নিতে আওড়াতে লাগলো,

 

      খুব আদরে ফোঁটা সাদা গোলাপ,

      শুভ্র কাননে নিশিপদ্ম যখন ছড়ায় আলো,

      হয় কি জগৎ সংসার অশুভ?

      হয় কি তবে পাপ?