আসছে বসন্তে প্রেম

আসছে বসন্তে প্রেম

~সাহাফ ভাই, কি যে করে রাখো রুমের অবস্থা। রুমটা তো একটু গুছিয়েও রাখতে পারো।

 

সাহাফ ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছে। কোন এক মায়াবতী তার মুখের সামনে আঙুর নাচাচ্ছে। সে আঙুরের কাছে যেই না যাচ্ছে, অমনি মায়াবতী দূরে সরে গিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। হাসির মূর্ছনায় সাহাফ মন্ত্রমুগ্ধের মতো আচ্ছন্ন, বিহ্বল হয়ে লুটিয়ে পড়লো আলিশান বিছানায়। অমনি তার ঘুম গেলো ভেঙে। ঘুম থেকে উঠে আদরকে দেখলো বুক শেলফের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

 

~তুই এখানে…কি করছিস?

 

~কি আর করবো…এই বাড়িতে এক বান্দা আছে যে প্রচণ্ড অগোছালো…তার ঘরদোড় একটু গুছিয়ে দিচ্ছি…মা এসে দেখলে যে পুরো বাড়ি মাথায় করবে সে খেয়াল আছে?

 

~জীবনটাই এলোমেলো হয়ে আছে, রুম গুছিয়ে আর কি হবে রে আদু?

 

~কতবার বললাম আমাকে আদু বলবেনা। আমার নাম আদর।

 

~তোর নামটা আমার একদম পছন্দ না!

 

~কেনো? আমাকে আদর বলতে এত সমস্যা কেনো তোমার?এত অহংকার ভালো না।

 

সাহাফ তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। দেখলো আদর রুম থেকে বেড়িয়ে গিয়েছে। সাহাফ মনে মনে হাসলো।বড্ড ছেলেমানুষ মেয়েটা। আবার পরক্ষণেই মনে হলো মেয়েটাকে এভাবে না রাগালেও হতো!

 

সকালের নাস্তা কোনরকমে সেরে পুব দিকের টেবিলটায় গতকালকের ক্লাসনোট নিয়ে বসে পড়লো। নোট দেখতে দেখতে মনে পড়লো মায়ার কথা। মায়া কি যত্ন করে ক্লাস শিক্ষকের লেকচার খাতায় তুলে দিয়েছে। যদিও হাতের লেখা মোটেও দৃষ্টিনন্দন না তবুও সে যেন মোহে আবিষ্ট হয়ে রইলো। বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারলো না অবশ্য। একটু পরই খাতা পেন্সিল নিয়ে ভাবুক রূপ ধারণ করলো সাহাফ। একটা কবিতা মনটায় খচখচ করছে। এইযে ক’দিন ধরে তার বুকের ভেতরের যে ধুপধুপুনি, খচখচানি এগুলো প্রেমে রূপ না পাওয়া পর্যন্ত তার স্থির হবার জো নেই। কিন্তু প্রেম নিবেদনের চিন্তা আসলেই তার পা দুটো নির্বোধ হয়ে যায়!

 

স্কুলের পাঠ চুকিয়ে কলেজে যাওয়া আরম্ভ করেছে সে। এটা আসল কথা নয়, আসল কথা হলো মায়া একই কলেজে ভর্তি হয়েছে। মনে হচ্ছে এ জীবন খানি ধন্য! ক্লাসের ফাঁকে নোট আদান প্রদান, একটু খানি হাসি ঠাট্টা, কথা বলা টুকটাক এসব হয়। সাহাফ তো লেকচারশিটের সাথে সাথে মনটাকেও কবেই সঁপে দিয়েছে। কিন্তু অপরপক্ষের মানুষটাও কি তার সাথে সাথেই সম্পর্কের ছোট্ট চারাটাকে যত্ন দিয়ে বড় করছে নাকি কোন দমকা হাওয়া তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে, এটাও তো জানতে হবে!

 

করিডোরে সাহাফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নানা কিছু ভেবে চলেছে। পেছন থেকে একটা মিষ্টি কণ্ঠস্বর তার চিন্তায় ছেদ আনলো।

 

~ওহ মায়া! আর বোলো না। তোমার কথাই ভাবছিলাম। টার্মের জন্য প্রতিবার আমরা একসাথে প্রিপারেশন নেই। এবারও জর্জ লাইব্রেরিতে পড়া যেতে পারে, কি বলো?

 

~হ্যাঁ, আমিও সে কথাই ভাবছিলাম। চলো নোট করা শুরু করে দেই। ক্লাসের সবাই তো আবার আমাদের নোটেরই অপেক্ষায় থাকে!

 

~আরও একজন সব সময় তোমার অপেক্ষায় থাকে!

 

~কি বলছো বিড়বিড় করে?

 

~না না। বললাম, তাহলে আজ থেকেই পড়া শুরু করে দিই!

 

লাইব্রেরীতে বসে বসে অংক কষছে দুজন। দুজনের কারোরই অংক মিলছে না। কি যে হলো আজ এ দুজনের। সাহাফ ভাবছে নোটের ভেতর চিঠি গুঁজে দিলে কেমন হয়। কিন্তু চিঠি যদি ওর বোন বা ভাই এর হাতে পড়ে যায়, তবে তো খেল খতম! নাহ! এই এক্স এর ভ্যালু বের করা বোধ হয় এর চেয়ে সহজ!

মায়া অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে আছে। কি করছে এতক্ষণ মাথা নিচু করে। কাগজের খসখসে আওয়াজে সাহাফ তাকালো। দেখলো ও একটা কাগজ কাঁপা কাঁপা হাতে ধরে আছে। সাহাফ তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করলো। এমন ভাব করলো যেন কিছু দেখতেই পায়নি!

মায়া তাকে চিঠি দিতে যাচ্ছে! সাহাফের বুকের কম্পন বেড়ে গেলো।

 

~সাহাফ

তোমাকে একটা কথা বলতে চাই!

 

~বলতে হবে না। আমি জানি!

 

~তুমি কি করে জানলে! তুমি কি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার চিঠি পড়ে নিয়েছো?

 

~চিঠি না পড়লেও আমি জানি এটা তোমার প্রেম পত্র!

 

~সে ও কি আমাকে ভালোবাসে?

 

~সে মানে?

 

~আজ তোমার পাশে যে বসেছে!

 

~তুমি কি বর্ষণের কথা বলছো?

 

~হ্যাঁ! আমার খুব ভালো লাগে ওকে!

 

সাহাফ চশমাটা খুলে কাঁচটা একটু পরিস্কার করে আবার পড়লো। যেন চোখে ঝাপসা দেখছে। এভাবে দাবার গুটি উল্টে যাবে ভাবে নি। একসাথে ছোটবেলা থেকে দুজনে মায়া কুড়িয়ে শেষে কিনা সর্বস্ব কেড়ে নেবে নতুন মহাজন!

 

ভারি শরীরটা খাটে এলিয়ে দিয়ে, কষ্ট খানিকটা কটন কাপড়ের বিছানায় সমর্পণ করলো। খুব অদ্ভুত একটা কষ্ট হচ্ছে বুকের বাদিকটায়। জীবনে কত পড়ে গিয়েছে, ছিলে গিয়েছে, ব্যাথা পেয়েছে, কই কোনদিন তো এমনটা হয়নি। হৃদয়টা যেন সত্যি সত্যিই টুকরো হয়ে গিয়েছে। সামনে ফাইনাল এক্সাম। পাশ করে বাবার সম্মান উদ্ধার করতে না পারলে একূল ওকূল দুদিকই যাবে।

 

তিন মাস পর,

ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো আজ। সাহাফ বারান্দায় গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে। আদর ছোট ভাইয়ের সাথে খেলছিলো। খেলতে খেলতে বারান্দায় এসে আবার চলে যাচ্ছিলো কিন্তু সাহাফ ওর হাতটা ধরলো। আদরের বিনুনি দুটো স্থির হয়ে ওর কাঁধের দু’পাশে ঠায় হয়ে!

 

~আমাকে তোর কেমন লাগে আদর?

 

~তোমাকে একটা বাউণ্ডুলে….

 

~আমাকে বিয়ে করবি?

 

আদরের শরীরটা বোধ হয় খানিকটা কেঁপে উঠলো। কম্পন বেয়ে সাহাফের বুকে যেন এসে লাগলো। এটা কি খুশিতে না দুঃখে তৎক্ষনাৎ বোঝা গেলো না!

 

দশ বছর পর,

সাহাফ আর আদর সকালের মিষ্টি ভোর দেখতে বাইরে। তাদের আদরের মেয়ে শালুক নানুর পাশে গোল হয়ে ঘুমোচ্ছে। এই সুযোগে সিলেটের পাহাড়ি শহরে খানিক প্রাতঃভ্রমণ। যে মেয়েটা সময়ে অসময়ে এসে তার বই গুছিয়ে দিতো, টেবিলের ধুলো সরিয়ে সূর্যের আলো ছুঁইয়ে দিতো, সে আদুরে, লক্ষী আদর তার সহধর্মিণী আজ দশ বছর। কথার ভীড়ে হঠাৎ আদর সাহাফের হাতটা ধরে বললো,

 

~আমি কোনদিন তোমায় ছেড়ে যাবো না কেনো জানো? কারণ প্রথম প্রেম বড্ড নাছোড়বান্দা!!

 

সাহাফ হঠাৎ কিছু কৃষ্ণচূড়া এনে বললো,

 

~প্রথম প্রেমের গায়ে রোদ লাগছে। কৃষ্ণচূড়ায় মুখটা ঢেকে নাও!

 

আদরের লাল টুকটুকে ঠোঁটে সকালের মিষ্টি আলোর প্রশান্তি খেলে গেলো!!

 

আসছে বসন্তে প্রেম

সাবিকুন নাহার অন্তু