রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

সেই দ্বীপে (শেষ পর্ব)

পর্ব ১২

.
গতকাল যখন তারা একটি হেলিকপ্টার দেখেছিল সেটি মূলত তাদের খোঁজের জন্যই পাঠানো হয়েছিল।
এক সাথে ৩-৪ টা হেলিকপ্টার দিয়ে গত পরশু থেকে সার্চিং শুরু হয়। প্রথম দিন কোনো খোঁজ পায় না তারা কারণ পুরো সমুদ্র একদিনে সার্চ করা সম্ভব হয়নি।
২য় দিন হেলিকপ্টার গুলো যখন ভাগ ভাগ হয়ে আলাদা এড়িয়া সার্চ করতে থাকে, তখন একটি হেলিকপ্টার একদম সমুদ্রের কিনারায় চলে যায় যার ফলে দ্বীপ থেকে তারা সেটা দেখতে পায়। আয়ানরা ভেবেছিল হয়ত তাদের দেখেনি সেই হেলিকপ্টার।
কিন্তু আশার কথা হলো, হেলিকপ্টার থেকে খুব শক্তিশালী দূরবীন দিয়ে তাদের খুব সূক্ষ্ম ভাবে গুরুত্বের নাথে দায়িত্ব নিয়ে খোঁজা হচ্ছিল যার ফলে তারা দুজনেরর হাত নাড়ানো দেখতে পায়।
কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত বেশি দূরে চলে আসার ফলে এবং অধিক সময় টহল দেয়ার জন্য হেলিকপ্টারের ফুয়েল শেষ হয়ে যায়, যার দরুণ তারা নিচে নেমে তাদের উদ্ধার করতে পারে না, নিজেদের জান বাঁচাতে আবার ফিরে যায়।
তাই এবার তাদের অবস্থান সনাক্ত করার পর ২-৩টা হেলিকপ্টার এসেছে তাদের উদ্ধারের জন্য।
.
গতকাল কের মত আজও দুজন প্রাণ পনে চিল্লাতে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে হেলিকপ্টার বীচে ল্যান্ড করে।
বাতাসে চারিদিকের বালু উড়তে উড়তে একটা ঝাপসা পরিবেশ তৈরি করে।
.
হেলিকপ্টার থামার পর সেখান থেকে তাদের ফোর্স বের হয়ে আসে। তারা নাফিসাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।সব গুলো সেনা বেশ লম্বা,চওড়া, ফর্সা এবং অতিতর সুন্দর বদনের অধিকারী!
.তাদের সাথে মিডিয়ার হয়ত দু-একজন এসেছে যারা ক্যামেরায় সব দৃশ্য বন্দি করছে!
.
নাফিসারা তাদেরকে দেখে দৌড়ে ছুটে আসে, নাফিসা দৌড়ে গিয়ে তাদের এক সেনাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। এইতো এসেছে তাদের হিরো তাদের উদ্ধার করে। সবাই এমন দৃশ্য দেখে আবেগ প্রবণ হয়ে ওঠে। হোক ভিনদেশী, তা বলে কি আবেগ থাকবে না?
মানুষ তো, আবেগ তো থাকতেই হবে।
তখন সেনাও নাফিসাকে খুব যত্ন করে জড়িয়ে ধরে এবং মাথায় হাত দিয়ে বলতে থাকে, ” Don’t cry sister, we are here to save you dear! please stop crying, you are the bravest!”
এদিকে আয়ানও আরেক জনকে জড়িয়ে ধরে।
নাফিসা কান্না থামিয়ে তাদের অনেক অনেক ধণ্যবাদ জানায় তাদের খোঁজ করার জন্য। তারপর সেনারা তাদের ইউনিফর্মের শার্ট নাফিসাদের গায়ে জড়িয়ে দেয় এবং বলে আর দেরি না করে হেলিকপ্টারে উঠতে।
তারপর নাফিসা দৌড়ে গিয়ে আয়ানকে বলে আগে উঠার জন্য, এবার আর রিস্ক নিতে চায়না সে। আগে স্বামী উঠবে তারপর সে!
আয়ানও জোড় করে আগে নাফিসাকে ওঠার জন্য।
তাদের এসব কান্ড দেখে উদ্ধারকারীরা বলে এখানে যথেষ্ট হেলিকপ্টার আছে তোমরা উঠে পড়।
একি আলাদা আলাদা জায়গায় যাবে তারা! এ কেমন করে হয়?
অনেক রিকোয়েস্ট করার পর তাদের এক হেলিকপ্টারে ওঠানোর সিধান্ত হয়।
যেই না নাফিসা উঠতে যাবে হেলিকপ্টারে, অমনি তার মনে পড়ে তাদের জিনিস পত্রের কথা!
এই যা এতক্ষণ মনেই ছিল না, আরেকটু হলে তো তাদের বিয়ের স্মৃতি থুয়েই চলে যেত তারা।
দৌড়ে ছুটে যায় সে মোবাইলের খুঁটির দিকে। সবাই তাকে আটকানোর চেষ্টা করে, কোথায় আবার যাচ্ছে সে!
কয়েকজন সহ আয়ানও তার পিছে ছুটে যায়।
সবাই গিয়ে দেখে সে মোবাইল দুটা বুকে জড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে!
যেই কিছু বলতে যাবে আয়ান ওমনি আবার ছুট লাগায় নাফিসা বোটের দিকে!
আবার তারা তার পিছে ছুটা শুরু করে।
নাফিসার এমন পাগলামো দেখে অায়ান ভীষণ রেগে যায় এবং নাফিসা কে রেগে-মেগে বলে –
“কিসব পাগলামো শুরু করেছো নাফিসা? আবার কেন এখানে ছুটে এলে? কোথায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে দ্রুত হেলিকপ্টারে উঠবে তা না করে আবার কেন এখানে আসলে? চল তাড়াতাড়ি!”
নাফিসা তার কথায় কান না দিয়ে তার ব্যাগ জড়িয়ে নিয়ে বুকে রেখে চোখের পানি ফেলছে সাথে স্বস্তিকর নিঃশ্বাস!
তারপর কান্না জড়ানো কন্ঠে বলছে, “এখানে আরেকটু হলে আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মৃতি আর জিনিস ফেলে যেতাম আয়ান, এগুলো ফেলে রেখে কি করে যেতাম?”
.
আয়ান সিরিয়াসলি খুব রেগে যায় এবং টান মেরে ব্যাগ খুলে বলে, “কি এমন আহামরি জিনিস আছে নাফিসা যা নিতে তুমি ছুটে এসেছো যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে?”
তারপর ব্যাগ খুলে দেখে প্রথমেই তার ঘাস-ফুস দিয়ে বানানো সেসব বিয়ের অলংকার।
কি বলবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না, একটা মানুষ এতটা পাগল হয় কিভাবে সামান্য এসব জিনিসের জন্য কেউ ছুটে আসে এভাবে?
পরে নাফিসা বলে এই ঘাস-ফুস এর বানানো জিনিসই তার কাছে চরম মূল্যের এবং আবেগের।
.
তারপর তারা সেইফলি হেলিকপ্টারে উঠে এবং হেলিকপ্টার তাদের যাত্রা শুরু করে।
হেলিকপ্টারে উঠে আয়ান আর নাফিসা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ফেঁটে পড়ে, এ কান্না তাদের বিজয়ের কান্না, তাদের ফিরতে পারার অানন্দের কান্না!
ফটোগ্রাফার এই মূহুর্ত টাকে ক্যামেরা বন্দি করে এবং তাদের নিয়ে যে তারা ফিরছে সেটা জানিয়ে দেয় এবং ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে দিয়ে দেয়।
.
তারা সেইফলি এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করে। তাদের ফেরার অপেক্ষায় আছে শত শত মানুষ। তাদের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা ইন্টারন্যাশনালি ছড়িয়েছে দেখে অনেকগুলা রিপোর্টারও ভীড় জমিয়েছে তাদের ফেরার লাইভ টেলিকাস্টের জন্য।
.
নাফিসা মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে নেয়।
সবাই অধীর আগ্রহে টিভি খুলে চেয়ে আছে হেলিকপ্টারের দিকে, কেউ কেউ আবার এয়ারপোর্টেও এসেছে!
সব গুলো হেলিকপ্টার থামার পর প্রথম হেলিকপ্টার থেকে সেনারা নামে এবং মাঝের টার দিকে এগিয়ে যায় তাদের নামানোর জন্য।
তাদের হেলিকপ্টারের দিকে সবাই চাতক পাখির মত তাকিয়ে অাছে সত্যি সত্যিই আয়ান নাফিসা এসেছে নাকি অন্য কেউ!
তারপর সেই হেলিকপ্টার দরজা খুলে নেমে আসে এক সেনা, তারপর আয়ান বেরিয়ে আসে, সাথে নাফিসাও হাত ধরে নেমে পড়ে।
.
টিভিতে লাইভ টেলিকাস্ট হতে থাকে দুজন মাানুষের আর্মি পোষাকে পড়া, একজনের মাথায় ওড়না প্যাঁচানো।
তাদের সত্যিকারের ফেরা দেখে সব নিউজ চ্যানেল সুখবরটা জানিয়ে দেয়, তাদের পরিবার শুকরিয়া আদায় করে, কান্না করে দেয়!
সবাই তাদের ফেরাতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
.
তাদের স্যার তাদের কাছে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে তাদেরকে জড়িয়ে ধরে এবং কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাদের পরিবারের মত এই স্যার সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিল কারণ তিনি ই পরিচালনা করেছেন সব। শুধু নাম খারাপ হওয়ার জন্য না, তারা দুজন তার কাছে সন্তানের মত তাই।
.
তাদেরকে যেই ভেতরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ফ্রেশ এবং খাবার দাবার করানোর জন্য সেই কোথা থেকে হুট করে রুহি এসে আয়ানকে জড়িয়ে ধরে এবং কান্না করতে থাকে। এতদিন পর তার প্রেমিককে দেখেছে কিনা!
রুহিকে এভাবে দেখে নাফিসার হুঁশ ফিরে তার দেখা দীবা স্বপ্ন থেকে!
কিন্তু সে যে শুধু স্বপ্ন নয়, আয়ানকে যে সত্যিই তার স্বামীর আসনে বসিয়েছে। তার হৃদয় ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায় এমন দৃশ্য দেখে!
নাফিসা আয়ানের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলে, আয়ানের চোখ তার দিকে পড়তেই সে দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়।
উপস্থিত কেউ বুঝতে পারেনা কেন সে এভাবে ছুটে গেল।
.
তারপর সে এককোণে গিয়ে মোবাইলে তাদের বিয়ের ছবি দেখে গগণ বিদারী চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকে!
কি থেকে কি হয়ে গেল! তার স্বামী যে আর তার থাকবে না। সত্যিই তো সে রুহির বয়-ফ্রেন্ড। এখন তো আর তারা দ্বীপে নেই, এখন তারা বাস্তব জীবনে আবার ফিরে এসেছে এবং তাদের দুজনের মাঝে আছে রুহি! এবার যে বিচ্ছেদের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
উফ কি যে যন্ত্রনা এই বিচ্ছেদের!
.
নাফিসাকে দৌড়ে চলে যেতে দেখে আয়ানের খুব চিন্তা হয় এবং রুহিকে টান দিয়ে তার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেয়। এমন কেন করল রুহি বলতে থাকে কিন্তু সে কোনো উত্তর না দিয়ে নাফিসাকে খুঁজতে থাকে।
নাফিসার কাছে গিয়ে দেখে নাফিসা খুব বেশি কান্না করছে ফোনে কিছু একটা দেখে। আয়ান নাফিসার কাঁধে হাত দিয়ে প্রশ্ন করতেই নাফিসা চমকে গিয়ে উঠে পরে চোখের পানি মোছে।
“কি হয়েছে” এর প্রতি উত্তরে নাফিসা বলে কিছু হয়নি।
তারপর আয়ান আবার জিঙ্গেস করে “ফোনে কি দেখছিলে এমন যার জন্য কাঁদছো তুমি?”
নাফিসা বিয়ের ছবি লুকিয়ে বলে বাসায় ফোন করব। তারপর আয়ানও বলে ওঠে, “ওহ্ হ্যাঁ! আমার ফোন টা দাও তো, ভুলেই গেছিলাম আমি। আর হ্যাঁ আর কাঁদবে এখন ঠিক আছে?”
নাফিসা আয়ানকে ফোন দিয়ে দেয়। তারপর দুজন বাসার সবার সাথে কথা বলে সবাইকে আস্বস্থ করে যে তারা ঠিক আছে।
তারপর তাদের হোস্টেলে ফিরে তারা। সবাই তাদের দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরে এবং ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়।
তারপর তারা দুজনে গোসল করে খায়। অনেকদিন পর তারা খেতে পেল!
.
এদিকে ইন্টারন্যাশনালি তাদের খবর ব্রেক হওয়ায় আন্তর্জাতিক ভাবে তাদের সমুদ্রে একা সারভাইভ করার জন্য দুজনকে পুরস্কৃত এবং স্বীকৃতি জানানোর জন্য আয়োজন করে। এবং আয়ানকে মানবতা দেখিয়ে বাঁচাতে গিয়ে নাফিসা নিজের জীবন বিপদে ফেলে জন্য তাকে ‘Humanity Friend” বা ‘মানবতার বন্ধু’ নামে স্পেশাল এ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। যার জন্য তার জন্য সবার গর্বে বুক ভরে যায়! মিডিয়ায় এ খবর ছড়িয়ে যায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় তারা দুজন। এ নিয়ে বাংলাদেশ বেশ হাইলাইট হয়!
.
তারা যে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয় যে কিভাবে তারা এমন গাফিলতি করতে পারে যেখানে দুজন নিখোঁজ হয়ে যায়! এ নিয়ে ঐ স্যারের পদত্যাগ চেয়েছিল হিংসুকরা। কিন্তু আয়ান, নাফিসা দুজনই স্যারের হয়ে বলে এবং স্বীকার করে স্যারের দোষ ছিলনা, তাদেরই ভুল ছিল।
তারপর স্যারকে মুক্ত করে দেয় সকল মামলা হতে। স্যার এর জন্য দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে এবং মন ভরে দুজনকে দোয়া করে।
.
এদিকে আয়ান বারবার রুহিকে এড়িয়ে চলে এবং নাফিসার সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করে। এ নিয়ে রুহি বেশ ক্ষেপে যায় আয়ানের ওপর, জিঙ্গেস করে কি সমস্যা আয়ানের। আয়ান কিছু হয়নি বলে কাটিয়ে দেয়। এদিকে নাফিসার এত সম্মাননা পাওয়ার পরও বুকে হাহাকার জাগতে থাকে, আয়ানকে হারানোর আশংকার জন্য।
কারণ রুহি নাফিসাকে ডেকে বলে আয়ান যেন রুহির সাথে কথা বলে। কারণ দ্বীপ থেকে ফেরার পর আয়ানের পরিবর্তন সে মেনে নিতে পাচ্ছেনা।
.
বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের দুজনকে সংবর্ধনা দেয়া হয় আন্তর্জাতিকভাবে সম্মাননা আনার জন্য। তাদের দুজনকে যখন স্টেজে সবার সামনে বক্তৃতা দিতে বলা হয় তখন আয়ান তাদের বিয়ের কথা সবাইকে জানায়, এবং এও বলে খুব শিঘ্রই তারা সামাজিক ভাবে তাদের বিয়েটা করবে।
এ কথা শুনে রুহির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে এবং সবার সামনে রেগে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অনুষ্ঠান থেকে চলে যায়। নাফিসা ভয় পেয়ে যায় রুহির এমন বিহেভিয়ার দেখে এবং আশংকা করে রুহি না আবার কিছু উল্টা পাল্টা করে বসে।
তাই সে ও স্টেজ থেকে রুহির পেঁচনে ছুটে যায়।
রুহি নাফিসার এমন চলে যাওয়া দেখে আয়ানও স্টেজে সবাইকে এক্সকিউজ মি বলে তাদের পেছন পেছন চলে আসে।
.
রুহি একটা ক্লাসরুমে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পরে, নাফিসা রুমে প্রবেশ করতেই রুহি তাকে ঠাস করে একটা চড় মারে!
আয়ান রুমের বাইরে থেকে সব দেখে ঢুকতে যায় কিন্তু আবার কি যেন মনে করে ঢুকে না।
.
রুহি নাফিসা খুব বাজে ভাবে বলে, “বেহায়া বেয়াদব মেয়ে, তুই জানিস যে আয়ানের সাথে আমার রিলেশন আছে তাও তুই কোন হিসেবে আমার বয়ফ্রেন্ড কে বিয়ে করতে চাস? লজ্জা করে না তোর অন্যের জিনিসকে এভাবে ছিনিয়ে নিচ্ছিস, কি যোগ্যতা আছে তোর আমার জায়গায় তুই নিজেকে বসাতে চাচ্ছিস? আমার মত তোরর
কোনো যোগ্যতা আছে?”
নাফিসা তার গাল ধরে কাঁদতে থাকে এবং তার এমন বাজে ব্যবহারে বিশ্মিত হয়ে বলে, “রুহি তুমি ভেব না আমি আয়ানকে বিয়ে করব না, তোমার আয়ান তোমারই থাকবে”
রুহি আবার বলে উঠে, “ডাইনি কথাকার তুই নাকি বিয়ে করেছিস আয়ানকে, এখন আবার ন্যাকামো করিস? তুই না মানবতার বন্ধুর ইন্টারন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড পেলি, লজ্জা লাগছে না তোর একজন মেয়ে হয়ে আরেক জনের বয়ফ্রেন্ড কে ছিনিয়ে নিয়েছিস? কিসের রে তোর মানবতা? তুই তো ডাইনি রে অন্যের জিনিস ছিনিয়ে নিলি। তুই তো মানবতার বন্ধু না শত্রু! আমার ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছিস! শুধুমাত্র তোর জন্যই আয়ান আমাকে এড়িয়ে চলছে, কথা বলছে না আমার সাথে। কি জাদু করলি তুই যার কারণে আমার সাথে এমন করছে?”
এবার নাফিসা রেগে গিয়ে বলে, “হ্যা আয়ান আমার স্বামী, এখন আমি যদি বলি তোমার তার ওপর কোনো অধিকার নেই তাহলে কি বলবে তুমি? আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি, যদি আমি তার ভাগ না দিতে চাই কি করবে তুমি?”
রুহি তার এমন কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে তার গলা চিপে ধরে!
আবার ছেড়ে দিয়ে বলে, “তুই ভালোবাসিস? দুদিনের ভালোবাসায় তুই তোর স্বামীর ভাগ কাউকে দিতে চাচ্ছিস না তাহলে ভেবে দেখ সেই ক্লাস নাইন থেকে আমাদের রিলেশন, আমি কিভাবে আমার বয়ফ্রেন্ড কে তোকে দিব? আর তোর তো হাই-ফাই ক্লাস না যে তোকে অায়ানের পাশে মানাবে। আয়ানোর পিশে শুধু আমার মত বড়লোকদের ই মানায়। শুন নাফিসা প্লিহ তুই আমাদের জীবন থেকে চলে যা, আমার ভালোবাসাকে আমাকে পেতে দে। ভুলে যা তোর দুদিনের ভালোবাসা!”
.
নাফিসা খুব খুব কাঁদে, তাও বলে, “ঠিক আছে রুহি তোমার আয়ানকে আমি নিজে তোমার হাতে তুলে দিব, তুমি ঠিকই বলেছ আয়ানের পাশে আমাকে মানায় না। আর হ্যাঁ, আসলেই তোমাদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসার কাছে আমার দুদিনের ভালোবাসার কিইবা মূল্য আছে? আমি আয়ানকে বুঝিয়ে বলব..”
.
রুহির এমন বাজে ব্যবহার নাফিসার ওপর দেখে আয়ান ভীষণ রেগে যায় এবং রুমে ঢুকে রুহির উপর চেঁচানো শুরু করে। নাফিসা আয়ানের দিকে তাকিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়।
.
তিন জনের এমন প্রস্থান দেখে তাদের ক্লাসমেট রা ঐ রুমের দিকে এগিয়ে আসে এবং দেখে নাফিসাকে কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে।
তারপর তারা রুমে রুহি আর আয়ানকে কথোপকথনরত দেখে।
আয়ান রুহিকে বলে, “কোন সাহসে তুমি নাফিসার গায়ে হাত তুলেছ রুহি? এমন বাজে ব্যাবহারের স্পর্ধা আসলো কোথা থেকে?”

আয়ান আমি তোমার গার্লফ্রন্ড, আমি থাকতেও তুমি কেন নাফিসাকে বিয়ে করতে চাচ্ছো? ভুলে গেছ আমাদের রিলেশনের কথা?

না রুহি কিছুই ভুলিনি! তুমি যে আমাকে ছেড়ে জাহাজে উঠেছিলে এ ও ভুলিনি। আর এও ভুলিনি নাফিসা তার জীবন বিপন্ন করে আমাকে বাঁচানোর জন্য এসেছিল। আমাদের মাঝে আর কিছু নেই, কারণ আমি এখন বিবাহিত। Everything was over Ruhi, when you drop me alone in the boat. And you know what? Nafisa is more capable than anyone. She deserves more than you. Actually she is better than me. But we are already married.
So it is better for you to let us alone. Don’t try to create anything wrong between us.
-What? are you joking Ayan? Is it a game?

শোনো রুহি আমি আর কথা বাড়াতে চাচ্ছিনা, তুমি আর প্লিজ এসো না আমাদের মাঝে।
রুহি আয়ানের কলার টেনে ধরে বলল,

আমি কিছুই শুনতে চাই না, তুমি জাস্ট ওকে বাদ দিয়ে দাও।
আয়ান তার কলার ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

বিয়ে করা বউ কে ছাড়া সম্ভাব না রুহি, কিন্তু যে বিপদের সময় অন্যকে ফেলে চলে যায়, তাকেই ছাড়তে হয়। ভালো থেকো, আশা করি এ নিয়ে আমাদের মাঝে আর কোনো কথা হবে না।
এ কথা বলে আয়ান চলে যেতে ধরে এবং পেঁছনে ঘুরে দেখে তার ক্লাসমেট রা সবাই সব শুনছে!
কারোরই আর বুঝতে বাকি থাকে না কি হয়েছে।
রুহি কান্না করতে থাকলে সবাই তাকে সান্ত্বনা দেয় এবং তার ক্লোজ ফ্রেন্ডরা বলে আয়ানের সাথে তারা কথা বলবে।
.
এদিকে আয়ান নাফিসার কাছে গেলে নাফিসা বলে, “আয়ান তুমি কেন স্টেজে বললে আমাদের বিয়ে হয়েছে? আর কেনই বা বললে আমরা বিয়ে করছি? সত্যিই তো, আমার উচিত হয়নি তোমাদের মাঝে আসার। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও আয়ান, তুমি রুহিকেই বিয়ে কর..”
আয়ান নাফিসার বাহু ধরে ঝাকাতে ঝাকাতে বলে, “আমার বিয়ে হয়ে গেছে, আর আমি তোমাকেই ভালোবাসি। তুমি তোমার মাথা থেকে এসব ঝেরে ফেল নাফিসা, দ্বীপে আমি তোমাকে মনগড়া কোনো কথা বলিনি। যাও গিয়ে রেস্ট নাও অনেকদিন ভালো করে রেস্ট নাওয়া হয়নি। আর হ্যাঁ আর কোনো টেনশন করবে না এ ব্যাপার নিয়ে, প্লিজ আর কাঁদবে না।”
বলে নাফিসার যে গালে রুহি চড় মেরেছে সেই লাল হয়ে যাওয়া জায়গায় আয়ান হাত বুলিয়ে দিয়ে কেঁদে দেয়। ওর জন্যই তো চড় টা খেতে হল। এখন আর নাফিসার একটুও কষ্ট সহ্য হয়না আয়ানের। তারউপর রুহি খুব খারাপ ব্যবহার করেছে।
নাফিসা কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আয়ান আমার আকাশ কুসুম কল্পনার বরাবরই এমন ভেঙে গিয়েছে। দ্বীপের কথা তুমি ভুলে যাও আয়ান, আমাকে এভাবে কারো কাছে অপরাধী করো না, কারো ভালোবাসায় আমি ফাঁটল ধরাতে পারব না।”
এই বলে নাফিসা দৌড়ে তার রুমে চলে যায়।
.
এদিকে রুহি আয়ানের বড় বোনকে ফোন করে সব বলে দিয়েছে, তার বোনের সাথে আগ থেকেই চেনা পরিচিত ছিল।
আয়ানের বোন তাকে অনেক বোঝালো তার রিলেশনের কথা। কিন্তু কোনো কিছুই শুনতে সে নারাজ।
.
রুহির এতেও কাজ না হলে তার বাবাকে বলে আয়ানের সাথে কথা বলতে, এবং রুহি বলে তার আয়ানকে চাই।
ধণীর দুলালী রুহি, তাই বাবার কাছে যা চায় তাই পায়। তার বাবাও আয়ানের সাথে কথা বলেছে। কিন্তু আয়ান অতি ভদ্রতার সাথে কথা বলে তার প্রস্তাব নাকচ করে বলে তার বিয়ে হয়ে গেছে।
.
তারপর তার পরিবারের সবাই আয়ানকে বোঝাতে থাকে, তার বন্ধুরা তাকে বোঝাতে থাকে। কোনো কিছুতেই সে সেসবে কান দেয়নি। তার সোজা সাপ্টা কথা, তার জীবনে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ তা বোঝার মত বয়স তার হয়েছে। আর সে যদি নাফিসাকে নিয়ে হ্যাপি থাকে তাহলে কারো সমস্যা আছে নাকি সেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সবাইকে।
.
বেশ কিছুদিন এভাবে যাওয়ার পর নাফিসা চুপেচাপে সব বন্ধুদের একত্র করে আর একদিকে রুহি কেও ডাকে, আয়ানকেও ডাকে কিন্তু তারা কেউই জানে না কেন ডেকেছে।
.
সবাইকে একসাথে দেখে আয়ান বেশ অবাক হয়ে যায়, বুঝতে পারে না কি হতে চলেছে। তারপর নাফিসা সবাইকে বলে, “আয়ান স্টেজে সেদিন মজা করে বলেছিল আমাদের বিয়ে হবে, একচুয়ালি এমন কিছুই না। আসলে বিয়েটা হচ্ছে আয়ানের সাথে রুহির। তাই তোমাদের ডেকেছি এই এ্যানাউসমেন্ট টা শোনাতে। তারপর একহাত দিয়ে রুহির হাত ধরে অন্যহাতে আয়ানের হাত ধরে দুজনের হাত এক করে দিতে ধরে। আয়ান হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চিল্লিয়ে বলে, “এসবনকি হচ্ছে নাফিসা? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?”
রুহি বলে, “ও পাগল কেন হবে? ঠিকই তো বলেছে আমাদের বিয়েটাই তো স্বাভাবিক তাই না?”
আয়ান আবারো বলে, “আমার বিয়ে হয়ে গেছে, আচ্ছা ওয়েট তোমাদের কে একটা জিনিস দেখাই।”
এই বলে আয়ান একটা পর্দা আর প্রযেক্টর এনে তাদের ভিডিও ওপেন করে।
ভিডিও স্টাট হলে সবাই অবাক হয়ে যায়। একি এরা তো সত্যি সত্যিই বিয়ে করেছে!
নাফিসা দৌড়ে গিয়ে ওটা বন্ধ করে দেয়, আর ভিডিওটা ডিলিট করে দেয়।
আর বলে, “এসব পাগলমি বন্ধ কর আয়ান, অনেক হয়েছে। বাচ্চাদের মত কথা বলো না, আমরা একা ছিলাম জন্য বাচ্চাদের খেলা করেছি, এটার কোনো মূল্যই নেই বর্তমানে।দয়া করে আর সীন ক্রিয়েট না করে রুহিকে বিয়ে করে নাও”
সবার সামনে আয়ানের পা ধরে, কিন্তু কোনো কাজ হয় না।
আয়ান তাকে উঠিয়ে মৃদু হেসে বলে কটা ভিডিও ডিলিট করবে তুমি? তোমার ধারণাও নেই আমার কাছে কতগুলা সংরক্ষণ করা অাছে। আর এসব বাচ্চাদের খেলা নয়। আমার বলা প্রতিটা কথা সত্য ছিল এবং আমি সেগুলো সব বাস্তবে রূপান্তরিত করব। “
এর মাঝে রুহি আবার ক্ষেপে গিয়ে বলে, “নাফিসা ভালোই তো নাটক করতে পারো, এখানে আমাকে ডেকে কালার করছো? তোমাদের মত সস্তা মেয়েরাই এমন টা করে।
আয়ান তুমি এমন একটা চীপ মেয়ের জন্য আমাকে ইগনোর করছো? তুমি সবার সামনে আমাকে রিজেক্ট করছো? এত সাহস কোথায় পেলে তুমি?”
উত্তরে আয়ান বলে, “চীপ নাফিসা নয়, তুমি রুহি। তুমি কত বাজে ব্যাবহার করেছো, এমনি তার গায়ে পর্যন্ত হাত তুলেছ, গালি গালাজ করেছো, আমি সবটাই দেখেছি কিন্তু তখন সামনে যাই নি। এতকিছুর পরও কিন্তু নাফিসা তোমাকে তুই বলেও সম্বোধন করেনি! উল্টো তার স্বামীকে দিতে চেয়েছে তোমাকে! এখন তুমি বলো চীপ টা কে?”
সে আরো বলে সবার উদ্দেশ্যে, কিভাবে রুহি তাকে ছেড়ে গিয়েছে। এবং নাফিসা কিভাবে দ্বীপে তার সেবা করছে, সাহায্যে করেছে, বাঁচার জন্য অনুপ্রেরণা করেছে। এবং তাকে ভালো ও বেসেছে। তার সাথে একসাথে থাকার অঙ্গিকারবদ্ধ হয়েছে।
সবাইকে এখন বলে, “তোমাদের কি মতামত এর পর আমার কি করা উচিত?
রুহিকে বিয়ে করা?”
সব বন্ধুদের মুখে তালা লেগে যায়। সবাই মাথা নিচুঁ করে থাকে।
.
বেশ কিছুদিন এভাবে ঝড় চলার পর সবার সাপোর্টে সে নাফিসাকে অবশেষে বিয়ে করে।
রুহির অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায় বেশ বড়লোক ব্যাবসায়ীর সাথে। সেও খুব সুখী হয় সেখানে।
.
এদিকে বিবাহিত জীবনে আয়ান তার বলা সব কটা কথা রেখেছে। খুব ভালোবাসে দুজন দুজনকে, নাফিসার সব ফ্যান্টাসি পূরণ করে। যেমন ফ্যান্টাসির সাথে তার বিয়ে হয়েছিল দ্বীপে,তেমনি সব ফ্যান্টাসি পূরণ করে আয়ান। খুব ভালোবাসা দিয়ে রেখেছে সে তাকে। নাফিসার মত বৌ পেয়ে আয়ানের পরিবারও খুব সন্তুষ্ট। নাফিসার ও পরিবার খুব খুশি এত ভালো জামাই পেয়ে। ততদিনে তাদের দ্বীপে বিয়ে হওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়, এবং সবার আইডল হয়ে যায় নাফিসা আয়ান। লাইলি মজনু বাদ দিয়ে সবাই তাদের মত বিয়ের কল্পনা করে এখন।
নাফিসার এককালের সঙ্গীহীন জীবন এখন খুব ভালো একজন সঙ্গীর সাথে কাটছে, সে তার ক্যারিয়ারে রুহির থেকে অনেক বেশি সফল হয়েছে। যারা তাকে কম যোগ্য ভাবত তাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে কতটা যোগ্য সে। এসবের পেছনে আয়ানের সাপোর্ট ছিল সবচেয়ে বেশি! সে ই তার প্রিয়তমা স্ত্রী কে ভালোবেসে তাকে সাপোর্ট দিয়েছে সব সময়!
নাফিসা আয়ানকে জড়িয়ে ধরে তৃপ্তির সাথে বলে আলহামদুলিল্লাহ্, আল্লাহ তোমাকে দিয়েছে জন্য। দুজন একসাথে বলে আল্লাহ্ যা করেন ভালোর জন্যই করেন “শুকর অালহামদুলিল্লাহ আমাদেরকে পাঠানোর জন্য সেই দ্বীপে! “.
.
(সমাপ্ত…)
.
.
জানিনা কত গুলো ভুল ভ্রান্তি হয়েছে লেখায়। আশা করি সবাই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।
এতদিন সাথে থাকার জন্য ধণ্যবাদ।
আর পুরো গল্পটা কেমন হয়েছে, কোন পর্ব বেশি ভালো বা খারাপ হয়েছে তা জানাবেন। এবং চরিত্র এবং গল্প সম্পর্কে কিছু বলার থাকলে অবশ্যই জানাবেন। আপনার মন্তব্য আশা করছি।
আবারো ধণ্যবাদ সবাইকে! ❤

রূপসীনা খুকু

আসসালামু আলাইকুম, আমি খুকু, অদক্ষ হাতে হাবিজাবি লিখি আর সেটাই শেয়ার করছি আপনাদের সাথে! আশা করি ভালো লাগবে! :-D

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close