রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

সেই দ্বীপে (পরিচ্ছেদ-৫)

পর্ব ১০

.
মিয়া বিবি তো রাজি, কিন্তু এখন আনবে কোথা থেকে কাজী?
বিয়ের কথা তাদের কিন্তু সাক্ষী, কাজী ছাড়া কিভাবে বিয়ে হবে? আর তাছাড়া নিয়মই বা কি বিয়ের?
এ নিয়ে দুজনে চিন্তায় পড়ে যায়।
কিছুক্ষণ বাদে নাফিসার মনে হলো ইসলামি শরীয়তে কিভাবে বিয় হয় সে বিষয়ে একদিন পেস্ট দেখে তার স্ক্রিনশট মেরে রেখেছিল, সেটা আবার দুষ্টুমি করে অাপলোড দিয়ে বলেছিল “এখন থেকে আমিও বিয়ে পড়াতে পারব, তোমরা বিয়ে কর কাজী হব আমি!”
কিন্তু সে তো অনেকদিন আগেকার কথা, কোন তলে পড়ে আছে সে স্ক্রিনশট অাল্লাহ্ ভালো জানেন!
অাবার দুজনের ফোনেই আল কুরআনের অ্যাপ অাছে,অডিও ও অাছে।
প্রায় প্রত্যেক টা মুসলিমদের কাছে এই এ্যাপ গুলি থাকে কারণ নেট বা অফলাইনে সহজেই প্রযুক্তির কল্যাণে সহজভাবে ইসলাম চর্চা করা যায়।
আয়ানের তুলনায় নাফিসার কাছে এই হাদিস,তফসির,নিয়ম-কানুনের এ্যাপ বেশি কারণ সে চেষ্টা করত যতটুকু পারা যায় ইসলাম প্র্যাকটিস করার।
.
তারপর দুজনের ঘাটাঘাটি শুরু হয়ে যায়। নাফিসা অনেক খোঁজার পর গ্যালারির অনেক গভীরে গিয়ে পেয়ে যায় সেই স্ক্রিনশট গুলো, তারপর নিয়ম কানুন গুলো দেখল।
বিয়ের খুৎবা সহ যাবতীয় অডিও খুঁজে বের করল, অডিও যে এ্যাপ ছিল তাতে!
বিয়ের নিয়ম তো হলো, এখন সবচেয়ে মোক্ষম ব্যাপারে এসে আঁটকে যায় আয়ান।
দেনমোহর!
এটা ছাড়া বিয়ে সম্ভব না, কিন্তু এটা কোথা থেকে পাবে সে?
এখন অধিকাংশ বিয়েতে লাখ লাখ টাকার কাবিন হয়, সেই টাকা গুলো এই দ্বীপে পাবে কোথায় সে?
মানিব্যাগে থাকা ক্রেডিট কার্ডে ৭০-৮০ হাজার আছে কিন্তু বুথ তো নেই! এখন কি উপায়?
আয়ান নাফিসা কে বলে দেনমোহর ছাড়া তোমাকে বিয়ে করব কিভাবে!
অামার যদি সাধ্য থাকত আমি আমার হার্ট কেঁটে তোমার হাতে দিয়ে তোমার দেনমোহর শোধ করতাম, কিন্তু এখন কি করব?
কি নেবে তুমি নাফিসা!
.
নাফিসা চুপ থেকে বলল “যা চাই তাই দেবে তুমি? দিতে পারবে?”
আয়ান লাফিয়ে বলল, “বলেই তো দেখ, জান ভি হাজির হ্যাঁয়! ” বলে রেকর্ডার অন করল যাতে কথার প্রমাণ থাকে!
নাফিসা মৃদু হেসে বলল, “জান দিতে হবেনা, আমি তোমাকে চাই, সম্পূর্ণ টুকু তোমাকে। দিতে পারবে তুমি তোমাকে আমার দেনমোহর হিসেবে?
তোমার পুরো মন আর ভালোবাসা দিতে পারবা আমাকে?
তোমার কল্পনার রাজ্যটুকু আমার নামে লিখে দিবা আমার দেনমোহর হিসেবে?
তোমার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে আমি শুধুই আমাকে চাই, বড্ড লোভ যে আমার, পারব না কাউকে আমার স্বামীর ভাগ দিতে। যদি আমায় বিয়ে করতে চাও, আমি আমার দেনমোহর হিসেবে তোমাকেই চাই। যদি কখনো আমাদের বিচ্ছেদেরর ব্যাপার আসে তখন আমি আমার পাওনা দেনমোহরের হিসেবে তোমাকেই যেন পাই..”
.
আয়ান পুরো হা হয়ে গেল তার কথা শুনে, এমনও দেনমোহর কোনো মেয়ে চাইতে পারে তা জানা ছিল না তার।
সম্মতি সূচক উত্তর দিয়ে বিয়ের অায়োজনে নেমে পড়ল দুজন। সূরা, নিয়ম সব জানা, কিন্তু নেই কোনো অায়োজন!
নাফিসা খুব অাক্ষেপ করে বলছিল তার বিয়ের সাজের,ফটোশ্যুটের কত্ত শখ ছিল, বিয়ের জন্য বিয়ে করতে মন চাইত না তার, কিন্তু সাজ-গোজের জন্য হলেও বিয়ে করতে চাইত সে। কিন্তু এমনই কপাল না পারবে সাজতে, না পারবে পরিবার সহ বিয়ে করতে!
মন্দ ভাগ্য বুঝি একেই বলে।
.
আয়ান শুনতে চাইল কেমন সাজ তার কাম্য ছিল?
সে উত্তরে দু-চার টা বৌয়ের ছবি দেখিয়ে বলল এমন টিকলির সাথে টায়রা, নথ, লাল বেনারসি শাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি।
ওরই বা কি দোষ এসবের অাশা করাতে?
সব মেয়েরাই তো চায় এমন।
ও কি জানত এমন হবে?
.
তারপর আয়ান নাফিসা কে বলে ফ্রেশ হয়ে রেডি হতে।
তারপর মোবাইল দুটো চার্জ হওয়ার জন্য রোদে রেখে আয়ান এখানে সেখানে ছুটে চলছে, কি যেন করছে।
কখনো একটু জঙ্গলে ঢুকছে তো কখনও সমুদ্রপাড়ে।
তা নিয়ে অবশ্য মাথা ব্যাথা নেই বল্লেই চলে নাফিসার, কারণ তার নিজেরই অনেক কাজ,আজ তার বিয়ে। কত্ত সাজুগুজু করতে হবে তাকে!
কিন্তু পার্লারও নেই যে তাকে হেল্প করবে!
তাই নিজেই ভাবতে থাকে কিভাবে সাজা যায়, হোক না কাজী সাক্ষী ছাড়া বিয়ে, তাও বিয়ে তো, সাজগোজ ছাড়া বিয়ে হয় নাকি!
.
নাফিসা হাত-মুখ ধুতে যাবে এমন সময় দেখে সমুদ্রপাড়ে আয়ান খুঁটি গাঁড়ছে,আবার পাশে কতগুলো ফুল, হয়তো এগুলা জঙ্গল থেকে এনেছে।
নাফিসাকে ডেকে বললো একটু হেল্প করতে, কোনো মতে একটা প্যান্ডেলের মত করে বলল এখন তুমি যাও, রেডি হও। আমি আসছি।
.
নাফিসা সমুদ্র থেকে খুব ভালোকরে হাত-মুখ ধুয়ে বোটের কাছে যায়। তার ব্যাগ খুলে দেখে মেকাপ কিটের তেমন কিছুই নাই, তার কাছে থাকেও না অবশ্য, বান্ধবি দেন পিড়াপিড়ি তে এ্যাডভেনঞ্চারে বেরনোর সময় ব্যাগে পাওডার, দরকারি চিরুনি, হেয়ার ক্লিপস্,ব্যান্ড, লিপস্টিক আর ভ্রু পেন নিয়েছিল ফটো তুলতে গেলে যদি আবার সাজুগুজু করার লাগে!
কি থেকে কি হলো, তাকে এখন বিয়ের সাজ সাজতে হবে শুধুমাত্র এসব দিয়েই।
সে মনে মনে ভাবল যদি জানত তার এখানে এমন করে বিয়ে হবে তাহলে পুরো পার্লারের জিনিস পাতি তুলে আনত। সব মেয়েরই আশা মন ভরে সেজে বিয়ে করার, নাফিসা তার ব্যতিক্রম নয়।
.
অনেকদিন পর সে চুলের সামনটায় কপালের উপরের জায়গায় পানি দিয়ে ধুল, বড্ড আঠালো হয়ে গেছিল চুলটা।
সেটা এবার অাঁছড়ানো শুরু করতেই পাশ থেকে আয়ান বলল তোমার বিয়ের গিফট্ এখানে রাখলাম, নিয়ে যেও, বলে আবার চলে গেল।
নাফিসা পাশে গিয়ে দেখে একটা পাতার ঝুড়িতে দুটা বালা, ফল আর পাতা দিয়ে বানানো, তিনটা মুক্তা সুতো দিয়ে বেঁধে বানানো টিকলি, সাথে সাদা চিকচিক ছোট ছোট ঝিনুক দিয়ে এ্যাডজাস্ট করা টায়রা সাথে গলার মালা, আর খোপায় দেয়ার জন্য ঘাস আর ফুল দিয়ে বানানো গাজরা!!
দেখে এত্ত এত্ত অবাক হয় নাফিসার কি করে আনল এসব ভেবে!
মনে মনে ঠিক করল সে যেহুতু আমার সামনে আসল না সেহুতু আমিও না যাই,একেবারে বৌ সেজে যাব সামনে।
ভেবে আবার লজ্জায় লাল হয়ে গেল!
তারপর সে মুখে ভালো করে পাওডার দিল, লিপস্টিক লাগালো, হাল্কা ভ্রু আঁকল, সেটা দিয়ে আবার চোখে আইলাইনার, কাজলের কাজ সারল, কাজল আর লাল লিপস্টিক চোখের ওপরে দিয়ে আইশ্যাডোর কাজ সেরে নিল!
তারপর টিকলি সহ টায়রা পড়ল,এক সাইডে সিথি করল, টিকলি মাঝ বরাবর রাখল, তারপর কানের দুটাশ দিয়ে টায়রা ক্লিপ দিয়ে লাগিয়ে নিল।
টিকলির মুক্তা গুলো কি সুন্দর চিকচিক করছে, ও ভাবছে বিয়ের জিনিস জন্যই মনে হয় বরকত পেয়েছে!
তারপর খোঁপা করল,মাথায় বেশি চুল নেই তার কিন্তু আয়ানের বানানো গাজরা পরে খোঁপা টা বেশ বড় হয়েছে!
.
তারপর তার সাথে থাকা লাল ওড়নাটা মাথায় দিল বৌদের যেভাবে দেয়। গা থেকে সোয়েটার খুলে ফেলল, এখন উপরের দিকটা মনে হচ্ছে ল্যাহেঙ্গা আবার নিচের দিকটা লং ফ্রক!
হাতে ফুলের বালা পড়ল আর গলায় ঝিনুকের মালা!
সব পরে যখন আয়নায় নিজেকে দেখল, খুব খুশি হয়ে গেল!
নিজেকে কেমন বউ বউ লাগছে তার! খুব খারাপ হয়নি সাজটা, ভালোই বউ বউ লাগছে তাকে!
তার ইচ্ছে করছিল ফোনে পুট-পাট করে দু-চারটা সেলফি নেয়ার কিন্তু ফোন তো রোদে! লজ্জায় আর যেতে পারছে না ফোন আনার জন্য!
.
এদিকে আয়ান ও হাত-মুখ রেডি হয়ে গেছে। মাথায় টুপির সাথে রুমাল পেঁচিয়ে পাগড়ির মত করে পড়েছে। বেচারার অাফসোস কেন সে পান্জাবি পড়ে না, পড়লেই তো আজ কি সুন্দর বর সাজা যেত! তাই ভেতরে টি-শার্ট আর ওপরে শার্ট পড়েই বিয়ে সারতে হচ্ছে!
.
তারপর সে নাফিসা আনতে যায়। গিয়ে দেখে টুকটুকে বউ সেজে বসে আছে নাফিসা মাথা নিচু করে।
আয়ান হা করে চেয়ে আছে তার দিকে, কি সুন্দর লাগছে নাফিসাকে! তারপর বলছে চল বীচে, আমাদের বিয়েটা ওখানেই হবে।
.
নাফিসা সমুদ্রপাড়ে গিয়ে একদম অবাক হয়ে যায়, দেখে ডালপালা, ঘাসফুল,লতা, জঙলি ফুল দিয়ে একটা স্টেজের মত বানিয়ে ফেলেছে!
খুব সুন্দর লাগছে।
কিন্তু মাঝে একটা পাতার পর্দা! কিন্তু কেন?
জানতে চাইলে অায়ান বলে, “স্বাভাবিক বিয়ে হলে তো আমাদের কবুল বলার সময় আলাদা ঘরে থাকতে হত, তাই এখানে একটা পর্দা দিয়ে দিলাম ঠিক যেমনটা হয়!”
একগাল হেসে নাফিসা বলল তুমি এসব কিভাবে করলে আর কেনই বা করলে?
উত্তরে সে জানায়, নাফিসার কল্পনার মত হয়ত বিয়েটা করতে পাচ্ছে না তাই তার সর্বস্ব দিয়ে সামান্য চেষ্টা যাতে তার কিছুটা হলেও ফ্যানটাসির মত মনে হয়!
.
কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না মেয়েটা, কিন্তু মুক্তো কোথায় পেল তা জিঙ্গেস করলে আয়ান বলে, সমুদ্র তোমাকে বিয়ের গিফট্ দিয়েছে, আমাদের বিয়ের দাওয়াত পেয়েছে যে!
আর সাক্ষীও থাকবে বলেছে!
.
হেসে কুটিকুটি অবস্থা মেয়েটার!
তারপর আয়ান বলল, “ম্যাডাম আপনি পোজ নিন আগে কিছু ছবি তুলি নইলে সাজ খারাপ হলে তো বলবেন ফটোগ্রাফার ভালো না!”
.
হেসে হেসে নাফিসা মন মত অনেক গুলো ছবি তুলে নিল।
তারপর সে বরের ও ছবি তুলে দিল!
আয়ান তার কানে কানে বলল, ” You’re looking so preety and gorgeous beautiful lady, the most beautiful and sweetest bride I’ve never seen!”
বলে হাত বাড়িয়ে দেয়।
নাফিসা তার হাতে হাত রেখে সেই লতাপাতা দিয়ে বানানো জায়গাটায় গিয়ে বসে।
.
আয়ান সেই জায়গার সামনে একটা খুঁটি গেঁড়ে তার ফোনটা সেট করে ভিডিও করার জন্য। তারপর ভিডিও অন করে নাফিসার মোবাইলের এ্যাপের বিয়ের খুৎবার অডিও অন করে, তারপর দুজন কালেমা পড়ে।
এরপর আয়ান পাতার পর্দার পাশ থেকে বলে উঠে, “আমি রায়হান আসলাম ও তামিমা বেগমের ছেলে আয়ান আসলাম, নিজেকে,(নিজের কল্পনার রাজ্য তোমার নামে করে, তোমার প্রতি আমার সবটুকু ভালোবাসা আর হৃদয় অাত্ম-সমর্পণ করে)তোমার মানে নাফিসার দেনমোহর করে, আমার রব অাল্লাহ্ এবং তার সৃষ্ট জমিন, জমিনের মাটি, এই বিশাল সমুদ্র, জঙ্গল এবং গোটা আসমানকে সাক্ষী রেখে আল্লাহ’র ওয়াস্তে, তোমাকে হালাল করে পাওয়ার জন্য, তোমাকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক, অাল্লাহ্ নিশ্চয়ই আমাদের বিবাহের অপূর্নতাকে ক্ষমা করে আমাদের কবুল করে নিবেন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তুমি যদি রাজি থাক, বল অালহামদুলিল্লাহ কবুল..
.
নাফিসা কতক্ষণ নিরব থেকে চোখের পানি ফেলে, তারপর বলে অামি রাজি, অালহামদুলিল্লাহ কবুল…
অায়ান বলে আরো দুবার বলো, নাফিসা আরো দুবার সহ মোট তিনবার কবুল বলে।
এরপর আয়ান যেভাবে নাফিসা বলল, নাফিসাও ওগুলো বলে বলল, আমি তোমাকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক, আমাকে মানে নাফিসাকে তোমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি থাকলে বলুন অালহামদুলিল্লাহ কবুল..
অায়ান ও তিনবার আলহামদুলিল্লাহ কবুল বলে তাদের বিবাহ সম্পন্ন করল। তারপর দুজন হাত তুলে অাল্লাহ্’র দরবারে মোনাজাত করল এবং তাদের বিবাহ সম্পূর্ণ করল নাফিসার সেই চকলেট একে অপরকে খাইয়ে দিয়ে…
.
.
.

আরোচলবে কি?

.
.

বিশেষ_দ্রষ্টব্য : আমি নিশ্চয়ই বর্তমানের প্রেমিক-প্রেমিকাদের লুতু-পুতু মার্কা আকাশ বাতাসকে সাক্ষী রেখে তিনবার কবুল বলে পবিত্র বিবাহ এমন কলুষিত করাকে সাপোর্ট করিনা, এটা সম্পূর্ণ না জায়েজ, আমি এর তীব্র নিন্দা আর প্রতিবাদ জানাই কারণ তাদের স্বাভাবিক প্রেমের জীবনে বিবাহ করাটা খুবই সহজ,তাও তারা না করে হারাম অবলম্বন করে।

আমি সবাইকে অনুরোধ করছি এমনটা না করার।
আমি শুধু মাত্র গল্পের স্বার্থে, এমন বিবাহ উপস্থাপন করলাম, কারণ তাদের এই দ্বীপে অবাধ মেলামেশা এবং বিচরণ টাকে হালাল করার জন্য এতটুকু করেছি। কারণ তাদের আর কোনো পথ ছিলনা,আশা করি বুঝেছেন।

পর্ব ১১

.
বিয়ে সেরে তারা সমুদ্রপাড়ে এবং বিভিন্ন জায়গায় খুঁটি গেড়ে মোবাইল রেখে বেশ কিছু কাপল পিক তুলে নেয় যাতে কারোরই আপসোস না থাকে।
তারপর নাফিসার ফোনে সব ছবি ভিডিও ট্রান্সফার করে।
দুজন মিলে মাছ পুড়িয়ে খায়।
আজকে এই শূণ্য দ্বীপেও নাফিসার কেন যেন ভীষণই ভালো লাগছে!
খেয়ে দেয়ে তারা রাতের জন্য সবকিছুর বন্দোবস্ত করে।
এদিকে সে আয়ানের দিকে লজ্জায় তাকাতেই পারছে না!
গতকাল ও যার সাথে এত ফ্রি ছিল, আজ তারর সাথে কথা বলাতো দূরে থাক, তাকাতেই কেমন যেন লজ্জায় পড়ে যাচ্ছে। নতুন বৌ সেজন্যই বুঝি!
আয়ানের ভাব-সাব ও যেন একটু পরিবর্তিত হয়েছে।
এখন নিজের বৌ আছে কিনা!
কিন্তু মজার ব্যাপারটা হলো, তাদের আলাদা করে আর হানিমুনে যেতে হলো না, সবাই বিয়ে করে সমুদ্রে দৌড়ায় হানিমুনের জন্য অথচ তাদের কি সুন্দর ভাবে বিয়ে হলো স্বর্গীয় সুন্দরের একটা জায়গায়!
.
বিকেলবেলা অায়ান নাফিসার হাত ধরে বলে, “চলুন মিসেস আয়ান, আমরা ঘুরে অাসি!”
লজ্জায় লাল হয়ে নাফিসা লাজুক হাসি দিয়ে তার হাত ধরে হাঁটা শুরু করে, দুজন হাত ধরে অনেক দূর পর্যন্ত হাঁটে সমুদ্র পাড়ে। হাঁটতে হাঁটতে আয়ান তার বাহু দিয়ে নাফিসাকে জড়িয়ে নেয়। নাফিসাও তার মাথা এলিয়ে দেয় আয়ানের কাঁধে।
বেশ লম্বা ছেলেটা!
মেয়েটা ততটা নয়,কিন্তু দুজনকে বেশ মানিয়েছে! মানাবে নাই বা কেন, যেখানে প্রকৃতিই তাদের জোড়া করে দিল!
.
সন্ধ্যা হয়ে আসলে তারা সমুদ্রপাড়ে বসে পড়ে, নাফিসা অায়ানের কাঁধে মাথা রেখে দুজন সূর্যাস্ত দেখে।
নাফিসার কাছে সবচেয়ে সুখকর মুহূর্তকাল এটা, আয়ানও বেশ তৃপ্ত।
তারপর সমুদ্রের পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে তাদের বোটের কাছে যায়।
তারপর রাতের খাবার খেয়ে মোবাইলে তাদের ফটোসুট গুলো দেখে।
আয়ান বলে উঠে, সবচেয়ে সুন্দর বৌ ই নাকি তার পৃথিবীর মধ্যে, নাফিসাও বলে সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ছেলেটি তার বর!
আস্তে আস্তে রাত বেড়ে যায়।
আজ তাদের বাসর রাত।
সবাই বিভিন্ন প্ল্যান সাজায় এই বিশেষত রাতের জন্য, যত সুন্দর করে পারে তাদের কক্ষটি সাজানোর জন্য। কিন্তু তাদের অজান্তে ই আজ কি সুন্দর রাত নেমে তাদের বাসর রাতকে পরিপূর্ণ করে দিল, পূর্নিমার চাঁদ বাড়তি আলো ছড়িয়েছে পুরো আকাশ জুড়ে, সহস্র কোটির তারা আকাশে হাসিমুখে যেন মরিচ বাতি!
সেই আলো আবার সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে আর সমুদ্রের বিন্দু বিন্দু জলকে মুক্তোর মত ঝলকে দিচ্ছে!
স্নিগ্ধ সুমিষ্ট বাতাস বইছে সাথে সমুদ্রের কলকল ঢেউ!
উফ কি ভয়ংকর সুন্দর পরিবেশ, যে কারোরই মন চাইবে শতাব্দী ধরে এই রাতে থাকতে,তেমনি রাতে তাদের বাসর!
.
আয়ান নাফিসাকে তার হাতের আংটি টা পড়িয়ে দেয়, বাসর রাতে নাকি গিফট্ দিতে হয়, সেই গিফট!
কোনো কমতি রাখেনি ছেলেটা কোনো নিয়মের।
মেয়েটি বলল, “তুমি এত কিছু করলে, এত উপহার দিলে, আমি তো কিচ্ছুটি দিতে পারলাম না তোমাকে” বলে মন খারাপ করে বসে থাকে।
আয়ান বলে, “আমার কিছু চাই ও না, শুধু আমাকে একটু ভালবেসো নাফিসা, মন থেকে। আমি শুধু তোমার ভালোবাসায় সিক্ত থাকতে চাই, বিশ্বাস কর আর কিছুই না!” এই বলে তার হাতে মিষ্টি করে একটা চুমু দেয়।
.
নাফিসা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচুঁ করে থাকে। আয়ান তার চিবুক ধরে মুখ তুলে। তার নাক নাফিসার নাকের কাছের আনে। নাফিসার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত গতিতে চলতে থাকে,হার্টবিট এত জোড়ে হচ্ছে যেন ফেঁটে বের হবার উপক্রম!
এর আগে কারে এত কাছে আসা হয়নি তার। কিন্তু কান্নার সময় যখন আয়ানকে জড়িয়ে ছিল তখনও কিন্তু এমন হয়নি!
হয়ত এখন ভালোবাসার মানুষ আর তার হকের স্বামী বলেই এমন হচ্ছে!
.
আয়ান খুবই আলতো করে নাফিসার গালে,ঠোঁটের কোণে ঠোঁট ঘেষিয়ে একটা চুমু দেয়।
নাফিসার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে!
ছেলেদের স্পর্শে এতটা ভয়ানক শিহরণ কেন তার উত্তর ভেবে পায় না।
.
আয়ান আবার তার মুখ ঘুরিয়ে নাফিসার নাকের সাথে নাক লাগিয়ে রাখে।
দুজনের জোড়ালো নিঃশ্বাস দুজনের আলতো ঠোঁটের ওপর আঁছড়ে পড়ে,যেন সমুদ্রের ঢেউ উপছে পড়ছে সমুদ্রের পাড়ে!
বেশ কিছুক্ষণ এভাবে নিরব থাকে তারা।
নিরবতা ভেঙে আয়ান বলে, “আমাকে ভালোবাসবে না তুমি”
উত্তর না দিয়ে নাফিসা তার চশমাপরা চোখে ফ্রেমে পাশের বেশ গাঢ় একটা চুমু বসিয়ে রাখে। তারপর তার দুগালে হাত দিয়ে কপালে গভীরতম চুমু টা এঁকে দেয়!
.
প্রকৃতি তাদের প্রেম দেখে মিটমিটিয়ে হাসছে যেন! চাঁদ তার আলোর দ্যুতি আরো বেশি করে যেন ছড়িয়ে দেয়..
.
আয়ানের কানের কাছে নাফিসা তার ঠোঁটে ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলে ভালোবাসি, অনেক অনেক ভালোবাসি তোমাকে।
তার একথায় যেন মাতাল হয়ে যায় যায় আয়ান!
টেনে নাফিসার ওষ্ঠে তার ওষ্ঠ চেপে ধরে রাখে, তারপর তাকে ছাড়িয়ে তার ঘাড় দুহাতে চেপে চোখে চোখ রেখে বলে, “খুব ভালোবাসি!”
তারপর নাফিসা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আয়ান তার মাথাতে মুখ রেখে বলে, সবচেয়ে সুন্দরতম আজকের রাতটা পার করছে সে।
নাফিসা তার লোমশ বুকে ঠোঁট ডুবিয়ে রেখে দেয়। হাজার বছর ধরে যেন এমন একটি রাতের অপেক্ষায় ছিল তারা দুজন।
আশ্চর্য জনক ভাবে নাফিসার আজকে কোনো ভয় করছে না, নেই অন্ধকার রাতে ভূতের ভয়, আর নেই কোনো অনিশ্চিত পশুদের আগমনের ভয়। সে খালি চাইতে থাকে এ মধুময় রাতটা যেন শেষ না হয়। অনন্তকাল ধরে চলতে থাকুক এই মায়াবী রাত!
.
এভাবে আয়ানের বুকে মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ে নাফিসা, ঘুমিয়ে যায় আয়ানও।
সকালে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজের সাথে ঘুম ভাঙে দুজনের। এরকম সকালই তো সবারই কাম্য, পাখিদের রিংটোনে ঘুম ভাঙার আর চোখ খুলেই সুবিশাল আকাশটা দেখার!
যে সকালে থাকবেনা কোনো ব্যস্ততা, শুধু হবে ভালোবাসাময় একটি সকাল।
.
আয়ান নাফিসার কানে “শুভ সকাল বৌ” বলে তাদের সকাল টা শুরু করে! কি সুন্দর সকালটা!
নাফিসা সারা রাত তার স্বামীর বুকে থেকেও যেন তার তৃপ্তি পরিপূর্ণ হয়নি। তাই সে আবার আয়ানকে জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসার তৃষ্ঞা বুঝি এমনই, কখনো শেষ হয়না, অনন্তকাল ধরে শুধু যেন সেই অমৃতধারা পান করতেই ইচ্ছা হয়।
.
কিছুক্ষণ বাদে তারা একসাথে হাত-মুখ ধুয়ে আসে। সকালের খাবার নারকেল খায়। একে অন্যকে খাইয়ে দেয়।
নাফিসা বলে, “জানো আয়ান এখন আর আমার এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করছে না,শুধু আমাদের ফ্যামিলি যদি থাকত!”
.
আয়ান তার গাল টেনে দিয়ে বলে, “আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের ভালোবাসা ময় হবে প্রতিটা মুহুর্ত, তুমি ভেব না আমরা পৌঁছে যাব ঠিক!”
.
তারপর তারা জ্বালানির জন্য যেই না জঙ্গলের দিকে এগোতে ধরে, ঠিক সেই সময় হেলিকপ্টারেরর আওয়াজ শুনে।
দুজনই গ্যাসহীন বক্সে যেন অক্সিজেন পাওয়ার মত অবস্থায় উপনীত হলো এবং তড়িৎ গতিতে বীচে দৌড়ে গেল!
দেখতে পেলো খুব উঁচুতে একটা হেলিকপ্টার! দুজন প্রাণ পনে চিল্লাতে থাকে, অনবরত হেল্প হেল্প বলে হাত নাড়াতে থাকে। নাফিসা ছুটে গিয়ে একটা ডালে তার লাল ওড়না বেঁধে ওড়াতে থাকে,কিন্তু হেলিকপ্টার টা যেন না দেখেই আবার চলে যায়!
এত বড় আশার হাতছানি দেখে তারা দুজন কান্নায় ফেঁটে পড়ে। হয়ত তারা উদ্ধার পেতে পারত, কিন্তু মন্দ ভাগ্য বলে তারা নিজেদের কপালকে দোষারোপ করতে থাকে।
.
কান্নায় ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে দুজন আবার খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। দুজন-দুজনকে আর মিথ্যা স্বান্তনা দেয়ার স্পর্ধা করে না।
দুপুরের খাবারের পর তারা সমুদ্রপাড়ে পা ডুবিয়ে বসে থাকে। বড়ই ক্লান্ত তারা

নাফিসা হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। ওর ওমন দাঁড়ানো দেখে আয়ানও দাঁড়িয়ে বলে কি হলো তোমার।পেঁছন থেকে নাফিসাকে তার দেখে ঘুরিয়ে দেখে সে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
কিছু বুঝতে পারেনা আয়ান। জিঙ্গেস করলে নাফিসা বলে,”আয়ান আমরা যদি ফিরে যাই তাহলে তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ভুলে যাবে তাই না? আমি জানি এমনটাই হবে আমার সাথে। আমি আর ফিরে যেতে চাইনা প্রিয়, তোমার সাথে এখানেই থাকতে চাই। এই প্রকৃত ভালোবাসা আমি আর পাব না জানি। খুব লোভ হয়ে গেছে আমার,বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে,ভয় হয় খুব তোমাকে হারানোর..” বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।
.
আয়ান তার গাল ধরে তার চোখে চোখ রেখে বলে,”ধুর বোকা মেয়ে, তুমি আমার বিয়ে করা স্ত্রী,তোমাকে কেন আমি ভুলে যাব, তুমি ভয় পেওনা আমাদের আইনসম্মত বিয়ে হয়নি জন্য, একবার উদ্ধার পেলেই সামাজিক ভাবে বিয়েটা করে ফেলব!”
.
সেদিনও তারা একসাথে খেয়ে সারাটাক্ষণ ছিল, মেয়েটা এক মুহুর্তের জন্যও তাকে কাছ ছাড়া করেনি। তাকে হারানোর ভয় টা জেঁকে বসেছে হুট করে..
.
একসাথে পা ডুবিয়ে এভাবে সূর্য দেখা হবে কি না আর কে জানে!
আবার এখানে থাকলেও খাওয়ার অভাবে আর কদিনই বা বাঁচবে তারা!
এমন সব ভাবনা ভীড় করতে থাকে তার মাঝে…
.
পরদিন বেলা ১২ টায় যখন রোদে ফোন দিচ্ছিল তখন আস্তে আস্তে আবার গাঢ় হয় হেলিকপ্টারেরর আওয়াজ, একটা না কয়েকটা!
তাহলে কি তারা এবার উদ্ধার পাবে?
.
.

রূপসীনা খুকু

আসসালামু আলাইকুম, আমি খুকু, অদক্ষ হাতে হাবিজাবি লিখি আর সেটাই শেয়ার করছি আপনাদের সাথে! আশা করি ভালো লাগবে! :-D

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close