রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

শুভ বাবা দিবস

১.এই লকডাউনে টিউশন অফ,যেতে দেয়না।২মাস ঘরে।মোবাইল,ইন্টারনেট, হাতখরচ সেই ইন্টারমিডিয়েট এর ফার্স্ট ইয়ার থেকে নিজেরটা নিজে দেয়ার চেষ্টা করি।সঞ্চয় করাটা ছোট থেকেই হ্যাবিট বলা যায়।বাবা টিফিনের টাকা দিলে সেখান থেকেও অর্ধেক রেখে দিতাম,বাস ভাড়া দিলেও অর্ধেক রেখে দিতাম। তো জমানোগুলা দিয়েই বেশ চলতো আমার।ইন্টারমিডিয়েট থেকেই হাতখরচ বাবা থেকে খুঁজতে লজ্জা লাগতো,ছেলেদের বোধ হয় এমনেই হয়।চেষ্টা করতাম জমানো থেকে খরচ করার।তো এখন জমানো শেষ। প্রায়দিনেই আমার এম্বি দরকার হয় নানা কারণে।কিন্ত টাকা তো নাই।বাবা থেকে তো কোনোভাবেই খুজতে পারবোনা।তো মার কাছে গিয়ে বারবার এটা সেটার ভান করে বলি, “আসলে এম্বি লাগবে,এম্বি থাকলে ভিডিও কলে বাড়িতে কথা বলা যাবে,একটু মশলাপাতি মিশাই বলি যাতে মা বলে আচ্ছা নে এম্বির টাকা! 😛 ” তো রাতের খাবার একসাথে খাওয়া হয় আমাদের। মা বাবা ভাই সহ।দুপুরে বাবা উপার্জনের আশায় কর্মস্থলে,একসাথে খাওয়া হয়না।রাতে খেতে বসে প্রায়দিনেই বলি,বাবা টিউশন তো এবার শুরু করা দরকার। আর কয়দিন বেকার থাকবো?যাইনা একটু,কি হবে?তুমি বের হচ্ছোনা রেগুলার? কি হচ্ছে?বাবা সেই একই উত্তর ২মাস ধরে দিচ্ছে “না,এখন না।এই বছরে বেঁচে থাকাটাই সব।টাকার চিন্তা বাদ দে!” তো আমি সেদিন জিজ্ঞাসাই করে বসলাম,হ্যাঁ বেঁচে থাকাটাই সব।টাকা?কেমনে চলি বলো?😐তুমি যে বাইরে যাও?বাবা বললো,”আমি বাইরে যাওয়া, আর তুই বাইরে যাওয়া এক না।কিভাবে মারা যাচ্ছে চারিদিকে।” তো আমি বললাম,আমার কিছু হবেনা। বাবা কিছু আর বললোনা।রাতে ঘুমানোর সময় বললো তোর নাম্বার কোনটায় রিচার্জ লাগবে আমাকে বলিস,আমি রিচার্জ দিয়ে দিবো বের হই যখন।রুম অন্ধকার। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে আছি,মনে মনে ভাবি,কেমনে বুঝলা তুমি?আমি তো তোমাকে বলিনা ইন্টারনেট খরচ লাগবে।ভেবে ঘুমিয়ে গেলাম।সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি রিচার্জ চলে আসছে।ভাবি,এই ম্যাজিশিয়ান গুলা বোধই এমনেই হয়!🙂 বাবা বোধই সারাদিনেই মনের মাঝে কোনো একটা জায়গায় লুকিয়ে থাকে,আমার না বলা চাওয়া পাওয়া গুলা মিটানোর জন্য! 🙂 ❤
২.
ছেলেদের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে,যেটায় স্বর্গীয় অনুভুতি অনুভব হয়।❤জীবনে প্রথম যে ইনকামটা সে করে,সেটা যখন তার বাবা-মার হাতে তুলে দেয়,তার ভিতরে যে কি সুখ অনুভব হয় সেটা শব্দে প্রকাশ করা যায়না।❤আরো একবার অনুভব হয়,যখন সে প্রথমবারের মতো বাবা হয়!(এটার অনুভুতি বাবারাই বলতে পারবে ভালো)
তো,আমি যেদিন প্রথম টিউশনের টাকাটা পেলাম।খুশীতে মনটা ভরে উঠলো।এবার আমিও বাবা মার হাতে টাকা তুলে দিবো,বলবো নাও বাবা-মা তোমরা যা ইচ্ছা কিনে নাও।তো রাতে বাবা ঘরে আসার পর টাকাটা নিয়ে গেলাম, বাবা-মা বসে আছে।আমি টাকাটা তুলে দিলাম। বাবা জিজ্ঞাসা করলো, “খুশী খুশী লাগেনা এখন?” আমি অবাক হলাম,বাবা কিভাবে বুঝলো ব্যাপারটা?আমি সকাল থেকেই বেশ খুশী বাবাকে টাকা দিবো বলে,নিজে টাকা পাইলাম সেজন্য না।বাবা টাকাটা নিলো না। নানাভাবে জ্ঞান দিয়ে, নানাকথায় ভুলিয়ে বলেই যাচ্ছে, “না এটা তুই রাখ,এখন থেকে জমা।কাজে লাগবে।হেনতেন বহুত কিছু।” কিন্ত আমি তো কোনোভাবেই বুঝাতে পারছিনা,আমার যে সেই সুখটা অনুভব এ বাধা পড়ছে বাবা টাকাটা না নিলে।তারপর শেষে বললো,আচ্ছা তোর মাকে দে।তো আমি মাকে দিয়ে অন্যরুমে চলে গেলাম।আহা,কি যে আনন্দ ভিতরে।তো রাতে ঘুমানোর সময় বাবাকে বলতেসি, নেক্সট মাসে তোমার মেডিসিন এর খরচ আমি দিবো।যা লাগবে বলিও।বাবা হাসে আস্তে আস্তে।এরপর বলে উঠলো,”প্রথম ইনকামের টাকাটা পেলে এমনেই হয়!😅 বাবা-মাকে দিতে গেলে এমনেই হয়!😅আমার তো বাবা বেঁচে ছিলোনা,প্রথম ইনকামের টাকাটা তুলে দিতে পারেনি।😅 “এটা বলেই পাশ ফিরে ঘুমিয়ে গেলো।
আমি আবারো নিঃস্তব্ধ!🙂অন্ধকার রুম!তাকিয়ে আছি বাবার দিকে।ভাবছি বাবা কিভাবে বুঝলো আমি মনে মনে আনন্দে আত্মহারা ছিলাম যে আজ বাবা-মাকে টাকা দিবো।আমিতো প্রকাশ করিনি একবারো।ভাবি,এই ম্যাজিশিয়ানগুলা বোধই এমনেই হয়!🙂 বাবারা সারাদিন বোধই আমাদের মনের মাঝে এভাবেই লুকিয়ে থাকে,সন্তানের না বলা অনুভুতি গুলো শুনতে। 😅❤

৩.
আমি মাঝেমধ্যেই বাবাকে উদ্ভট উদ্ভট প্রশ্ন করে বসি,জাস্ট বাবা কিভাবে সেটা explain করে সেটা দেখার জন্য। তো বেশ কিছুদিন আগে বাবাকে প্রশ্ন করলাম হঠাৎ, ” আচ্ছা বাবা,তোমার জীবনে সবচে সুখের এবং খুশীর দিন কোনটা ছিলো?”বাবা হাসে,বলে যে,”এগুলা কোনো প্রশ্ন নাকি?এগুলা বুঝানো সম্ভব নাকি?”আমি তাও বেশ পিড়াপীড়ি করলাম,উত্তর জানতেই হবে।তো বাবা বলে উঠলো,”যেদিন তোর জন্ম হয়েছিলো!” বলেই হাসি দিয়ে তাকিয়ে আছে!আমি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছি। 😅
এরপর আমার আর কিছু বলতে হয়নি,বাবা বলতেই থাকলো সে দিনগুলোর কথা।হসপিটালে মার সাথে তখন দিদা বাদে কাউকে থাকতে দিবেনা authority! বাবাকে বলসে,আপনি চলে যান,সকালে আসিয়েন আবার।কিন্ত বাবা মাকে ফেলে যেতে চায়না,রাতে যদি অসুস্থতা অনুভব হয়?কিন্ত থাকার জায়গা তো নেই।উনি আশেপাশে বসে,দাঁড়িয়ে রাত পার করে দিতো!এরপর যেদিন আমি জন্ম হলাম,ডাক্তার যখন এসেই আমাকে কোলে তুলে দিলো,বাবা নাকি বেশীক্ষণ হাতে রাখলোনা,দিদার কোলে তুলে দিলো।উনি নাকি আনন্দে,খুশীতে আত্মহারা! 😅 এরপর ঘরে নিয়ে আসার পর,প্রায়দিনেই আমি নাকি কান্না করতাম দিনের বেলায়।কেউ থামাতেই পারতোনা।মা বাবাকে ফোন দিতো,শেষমেশ বাবা অফিস ফেলে ছুটে আসতো,এসে কোলে নিতো,এরপর নাকি কান্না থামতো!😅 বেশ কয়েকদিন এভাবে যাওয়ার পর মা আর বাবাকে কল দিতোনা,কিন্ত বাবার কেনো জানি মনে হতো,আমি বোধই কান্না করছি।আবারো ছুটে চলে আসতো।কথাগুলা বেশ কয়েকদিন আগে বাবা বলছিলো!😅 তো সেদিন রাতে ঘুমানোর সময় ভাবছিলাম, আমি কান্না করি,বাবাকে অনেকদিন কল দেয়া হতোনা,তবুও বাবা ছুটে আসতো,এসে কোলে নিলেই কান্না থামতো।কিভাবে বুঝতো উনি?রুম অন্ধকার!বাবার দিকে তাকিয়ে আছি।ভাবছি বাবার চুলগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেই,ভালোই লাগে।দিবো বলে ভাবলাম,বাবা হঠাৎ পাশ ফিরলো,বলে উঠলো,”কিরে ঘুমাস নাই?বাবা একটু চুলটা নেড়েচেড়ে দে না,ঘুম আসেনা।”আমি আবারো নিস্তব্ধ!🙂 ভাবি,এই ম্যাজিশিয়ান গুলা বোধই এমনেই হয়!বাবারা সারাদিন বোধই আমাদের মনের মাঝে এভাবেই লুকিয়ে থাকে, সন্তানের না বলা অনুভুতি গুলো শুনতে! 😅❤

★এরা এক আজব ক্যারেক্টার! আপনি বুঝতেও পারবেন না,এরা ঠিক কতোটা ত্যাগ করে সন্তানের জন্য সুখ কিনে আনে!হ্যা এরাই পারে,কারণ এরাই বাবা❤বুকে আমার কাপুনি ধরে,যখন দেখি বাবার চুল গুলো সব ধীরে ধীরে পাকতে শুরু করে!কস্টটা তখনি আরো তীব্রতর হয়,যখন দেখি-বাবার চেহারায় ভাজ পড়েছে!বাবা বৃদ্ধ হচ্ছে যতই দিন যাচ্ছে,কেন জানি এটা মেনে নিতে পারিনা!আমি এখনো কান পেতে বাবার যৌবনকালের গল্প শুনি!কতই না সুখে ছিলো তখন,আর এখন আমাদের জন্য দিনরাত সুখগুলো ত্যাগ করে যাচ্ছেন হাসিমুখেই! 🙂
★এখনো এত বড় হয়েছি,তবুও রাস্তা পারাপারের সময় যখন বাবা আমার হাতখানা শক্ত করে ধরে,আমার মনে হয় কই বড় হলাম আমি?এখনো তো মনে হয় বাবার সেই কোলে করে আমাকে নিয়ে রাস্তা পারাপারের কথা!❤বাবার শরীর যেদিন বেশী খারাপ লাগে,বাবা কিছু বলেন না।নিরবে শুয়ে থাকেন,আর আমাদের শুনান,কিছু হয়নি,এমনি একটু শরীর ব্যথা করছে!কিন্ত ভিতরে কি হচ্ছে সেটা একমাত্র বাবারাই জানেন!🙂

বেঁচে থাকুক বাবারা দীর্ঘকাল ধরে এই পৃথিবীর বুকে!ভালো থাকুক এরা অন্ততকাল ধরে!শুধু বাবা দিবসে নয়,বছরে ৩৬৫দিনই ভালো থাকুক বাবারা💓
সন্তানদের ভালোবাসায় শিক্ত হোক সকল বাবা!💘
বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবাদের প্রতি রইলো অজস্র শ্রদ্ধা💜
শুভ বাবা দিবস! 💖

হুমায়ুন আহমেদ এর কাছে খোলা চিঠি পড়ুন

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close