রিভিউ

লীলাবতী হুমায়ূন আহমেদ

  • বইঃ লীলাবতী
রিভিউঃ রুদ্র ফারাবী
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘লীলাবতী’। উপন্যাসে জড়িয়ে আছে কল্পনার পাশাপাশি লেখকের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা কথা। লেখকের শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে মোহনগঞ্জে, তার নানার বাড়িতে। সেই বাড়িটি ছিল ছায়াময়, পেছনে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের ভেতর ‘সারদেয়াল’—পূর্বপুরুষদের কবরস্থান। সবকিছুই রহস্যময়। লেখকের ভাষায়, “সন্ধ্যাবেলায় সারদেয়ালে ছায়ামূৰ্তিরা হাঁটাহাঁটি করে। গভীর রাতে বাড়ির ছাদে ভূতে ঢিল মারে। কেউ তেমন পাত্তা দেয় না। অশরীরী কিছু যন্ত্রণা তো করবেই। মূল বাড়ি থেকে অনেক দূরে বিশাল এক তেঁতুলগাছের পাশে টাট্টিখানা। সন্ধ্যার পর যারা টাট্টিখানায় যায় তারা না-কি প্রায়ই তেঁতুলগাছে পা ঝুলিয়ে ‘পেততুনি’ বসে থাকতে দেখে। বাড়ির কাছেই দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। মাঠভর্তি বক। লেখকের নানা দোনলা বন্দুক হাতে একসময় বক শিকারে বের হন। ছররা বন্দুকের গুলি করেন তিনি। অনেকগুলো বক একসঙ্গে মারা পড়ে। মাথার ওপর মৃত বকদের সঙ্গীরা ট্যা ট্যা শব্দে করে ঘোরে- সে এক অদ্ভুত দৃশ্য!” নানাবাড়ির সেইসব স্মৃতি মাথায় রেখে ‘লীলাবতী’ উপন্যাসটি লিখেছেন লেখক।

ধর্মপাশা থানার ছোট একটি গ্রামের বেশ প্রভাবশালী একজন ব্যক্তিত্ব সিদ্দিকুর রহমান। গ্রামের সবাই যেমন তাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে তেমনিভাবে ভালোবাসে।এই পৃথিবীর সুন্দরতম কতগুলো দিন আর বছর কাটিয়ে এসে তার জীবনতরীর আয়ু ক্রমশ কমে অাসছে। তার বর্নাঢ্য জীবনের ঝুলিতে উঁকি দিলে যেমন সফলতার গল্প পাওয়া যায় তেমনি দুঃখ, হতাশা অার নিঃসঙ্গতার নীলরত্নেরও দেখা মেলে। পূর্বপুরুষের ফেলে রাখা গৌরবময় স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে নিঃসঙ্গ সিদ্দিকুর রহমান সংসারে বটবৃক্ষের মত দাঁড়িয়ে আছেন মৃত্যুর অপেক্ষায়। যৌবনে একবার তার আয়না নাম্নী একজন রুপসী বুদ্ধিমতী নারীর সাথে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু নববধূ দাদীশাশুড়ির বিকৃত রুচির প্রতিবাদ করায় সিদ্দিকুর রহমান দাদীর উপর কর্তব্যবোধের দরুণ স্ত্রীর উপর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় আয়না আর সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। সিদ্দিকুর সাহেব পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে,তার স্ত্রী একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে গিয়ে মারা যান।শিশুকন্যাটি তার স্ত্রীর অনুরোধে তার মামার বাড়িতে বড় হচ্ছে জানবার পরও তিনি তার সন্তানকে নিজ গৃহে ফিরিয়ে তৎপরতাও দেখাননি তখন। বেশ কয়েকবছর পর বিয়ে করেন রমিলা নামের এক নারীকে। রমিলা শান্ত, দূর্বল, সে প্রতিবাদ করতে জানত না। অসুস্থ দাদীশাশুড়ির সেবা যত্ন করতে গিয়ে একসময় সে নিজেও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। দুই কন্যা এক পুত্রের জনক সিদ্দিকুর রহমানের নিস্তরঙ্গ জীবনে একসময় লীলাবতীর আর্বিভূত হয়। এই লীলাবতীই সেই কন্যা শিশুটি যার খোঁজ তিনিও এতদিনেও নেননি। ২১বছর বয়সী লীলা ছোট বেলা থেকে শুনে এসেছে তার পিতার মত নিষ্ঠুর আর এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই ।লীলা মনের গভীরে শৈশবকাল থেকেই তার পিতার জন্য জন্ম নেয় ক্ষোভ আর অভিমান। ২১ বছর পর লীলা ফিরে এসেছে তার নিষ্ঠুর পিতার কাছে। তার হৃদয়ে লুকিয়ে আছে কতগুলো কঠিন অার নির্মম সব প্রশ্ন কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে অাছে ভয়াবহ নির্লিপ্ততা। পিতা আর কন্যার এ এক জটিল সমীকরণ!!

প্রতিক্রিয়া :প্রথিতযশা স্বনামধন্য সুকৌশলী লেখক হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম অনবদ্য সৃষ্টি “লীলাবতী “। লীলাবতী উপন্যাসের মুখবন্ধে লেখক শুরুতেই প্রাচীন গণিতবিদ ভাস্করাচার্য ও তার কন্যা লীলাবতীকে প্রচলিত একটি কাহিনীর অবতারণা করেন। কাহিনীটি ছিল এমন ভাস্করাচার্যের কন্যা লীলাবতী একবার লগ্নভ্রষ্টা হন। দুঃখিনী কন্যার প্রতি অপত্য স্নেহে বর্শবতী হয়ে পিতা ভাস্করাচার্য তার একটি বিখ্যাত গণিতের বইয়ের নাম দেন কন্যা লীলাবতীর নামে। একজন পিতা কন্যার প্রতি কতটা স্নেহ প্রবন হলে এমনটি করতে পারেন তা অনুধাবন করে পাঠিক হিসেবে চোখে অশ্রু এসে গিয়েছিল। লীলাবতীর কাহিনী একজন পিতা ও কন্যার। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ও যে পিতা কন্যার আকস্মিক আগমনে নিজের আবেগকে লুকিয়ে রাখছেন অথচ অভিনয় করছেন তিনি কতটাই না নির্বিকার! অপরদিকে কন্যা লীলা পিতার প্রতি কৌতুহলবোধ করলেও অভিনয় করছে অনাত্মীয়ার মত। লীলাবতী উপন্যাসে সংসারকে আড়াল করে যেন দুইটি মানুষের স্নেহ ভালবাসার লুকোচুরি খেলা চলছে। যা খালি চোখে দেখলে বড় জটিল আবার অর্ন্তচক্ষু দিয়ে তাকালে তার জটিলতা ভেদ করা যায়। লেখক তার মায়াময় লেখনী দিয়ে জগতের এই সত্যটুকু দেখিয়েছেন যে, একজন পিতা তার সন্তানের প্রতি কতটা স্নেহপ্রবন। ছোট কন্যা শিশুটিকে পরম আদরে তিনি লালন করেন,শিশু থেকে সে বড় হয়। যৌবনে পর্দাপন করে তার স্নেহের পুতুলকে তাকে অন্য কোন অপরিচিত লোকের কাছের অর্পন করতে হয়। এটাই পিতৃজীবনের ট্র্যাজেডি। জনশ্রুতি আছে হুমায়ূন এক কন্যা সন্তানের জনক হয়েছিলেন। শিশুটির নাম ছিল লীলাবতী । পরে লীলাবতীর মৃত্যু হয়। ভাস্করাচার্য যেমন তার দুঃখী মেয়েটির জন্য রচনা করেছিলেন বিখ্যাত গ্রন্থ,তেমনি আমার মনে হয় হয়ত এই উপন্যাসটি যেন কোন অভিমানী লেখক তার মৃত কন্যা সন্তানকে ঊৎসর্গ করে পাঠকের হৃদয়ে তার কন্যাকে করে গেছেন অমর।

টপিকঃ

Rudro Farabi

আমি একজন পাঠক

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close