রম্য

রম্যগল্পঃ খুকুর ভালোবাসা

রোজা আসলেই নাকি অনেকে তাদের ভালোবাসার সাথে বিচ্ছেদ করে দেয়, প্রেম চুকিয়ে দেয়।
এটাই নাকি উচিত, হ্যাঁ আমিও তা মানি, কিন্তু আমার আবার প্রকৃত প্রেম,প্রকৃত ভালোবাসা। তাই চাইলেও ছাড়তে পারিনা,ভালোবাসা বলে কথা!
তো কথা হচ্ছে আমার ভালোবাসা নিয়ে, থুক্কু ভালোবাসাদের নিয়ে।
কি খারাপ ভাবছেন?
ভাবেন, আপনি ভাবতেই পারেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ভালোবাসা একের অধিক থাকতেই পারে, তাই বলে যে এই খুকুকে খারাপ ভাবতে হবে, এমন কোনো কথা নেই!
আমি আমার প্রেমিকদের যথেষ্ট ভালোবাসি,তারাও যে আমাকে প্রচুর ভালোবাসে তা আমি সহ বাসার সবাই জানে।
এই রমজান মাসে আমি তাদের একসাথে কাছে পাই,তাদের জন্য রমজান হয়ে ওঠে আরও স্পেশাল!
কারণ বাকি সময় খুব কমই একসাথে তাদের পাই।
পাই, তবে একেক দিন একেক জনকে!
রোজার সময় এমনও অনেককে মিস করি যাদের কথা বাকি জীবনে আমার মনে পড়ে না,রোজার দিনে সারাটাক্ষণ শুধু একবার তাকে পাওয়ার জন্য মন আনচান করে, কিন্তু আল্লাহ্ তা’য়ালার জন্য আমি সব পরিহার করি!
আমি যেমন তাদেরকে খুব করে চাই, তারাও সবাই তেমন আমাকে চায়!
এ নিয়ে চলে কতশত দ্বিধাদ্বন্দ্ব! আমি নিজেও তখন ঠিক করতে পারিনা কার কাছে আমার যাওয়া উচিত, তাদের একসাথে পেলে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়,কার কাছে আগে যাওয়া উচিত এ নিয়ে!
ভালোবাসা তো এমনই, সবকিছুই উল্টে দেয়!
কিন্তু দঃখের কথা রোজা শেষ, সেই সাথে শেষ সবার সাথে একসাথে মিট আপ! খুব মিস করব তাদের, এ নিয়ে আমাকে সান্ত্বনা জানাবেন!
.
যাহোক, কথা বলছিলাম যাদের নিয়ে।
আমার প্রেমিকদের বহুবচন শুনে হয়ত এখনই আমাকে লুচু ভাবা শুরু করে দিয়েছেন,সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা বলে যে তাদের ছাড়তে পারিনা!
হয়ত পুরোটা পড়ার পর লুচুর সাথে পেটুকও জুড়ে দিবেন।
আচ্ছা সে নাহয় পরে ভাবা যাবে, এখন তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
আমার জান,প্রাণ,জানু,প্রাণু, সোণা, ময়না, তামা, লোহা,কাউয়া সবই আছে। কিন্তু আমি তাদের ডাকার সময় কনফিউজ হয়ে যাই কে কোনটা এবং কাকে কোন নামে ডাকব!
আপনাদের বলছি,তবে ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, আসলে এই কচি মনে অত কিছু মনে রাখা একটু কঠিন!
.
.
যারা আমাকে এবং আমি যাদেরকে পাওয়ার জন্য মারামারি লেগে যায় তারা হল- পিয়াজু,বেগুনি,আলুর চপ, ডিমের চপ,জিলাপি, নিমক পোড়া, ছানার পোলাও,মুড়িমাখা,মিল্কসেক,শরবত, বিরিয়ানি,হালিম সহ আরও অনেকে।
আর সারাজীবন যাকে মনে করিনা সে হল পানি!
এই পানি হলো আমার জান, জান মানে জীবন, এটার সাথে সবারই মিউচুয়াল। কারণ পানির অপর নাম জীবন।
সারাজীবন তাকে গুরুত্ব দেই না,তাকে ভালোবেসে পান করিনা, তাই এই রোজার মাসে সে তার লীলাখেলা দেখায়, বারবার মনে করিয়ে দেয় তার কথা, সাথে ভাবও নেয় প্রচুর। মানে ভাবখানা তার এমন, “সারাজীবন যেমন আমাকে চাস না তেমন বুঝ এখন কেমন লাগে! আমাকে ছাড়া তুই অচল এইটা মাথায় গেঁথে নে এবং শুধরে যা!”
সত্যি বলি, মিথ্যা বলা যায়না, আসলেই তার ক্যালমা বুঝি আমি সারা রমজান মাসে।
আল্লাহ্’র কাছে শুকরিয়া আদায় করি তার জন্য।
এবার আসি আমাদের গ্রান্ড মিটআপে!
আমাদের মিট হয় ইফতারিতে।তখন আসলেই আমার পক্ষে কঠিন হয়ে যায় সিধান্ত নিতে, কাকে ছেড়ে কার কাছে যাব!
প্রথমেই আসি পানির ব্যপারে।
সারাদিন আমি প্রমিস করি, আজ খালি রোজা টা খুলি, মানুষের যেখানে দিনে ৩-৪ লিটার পানি পান করা উচিত, সেখানে আমি ৫-৬ লিটার খাবই খাব!
সারাদিন খুব বিরক্ত করেছে সে।
কিন্তু রোজা খুলে দু-চার গ্লাস না খেতেই আমার হয়ে যায় হালুয়া টাইট!
মন না ভরতেই পেট ভরে যায়, গলা না শুকাতেই পেট টিমটিমা হয়ে যায়।
পেট নিয়ে নড়তে পারিনা,বমি বমি লাগে।
তারমধ্যে আছে শরবত,যাকে প্রচুর ভালোবাসি।
কিন্তু বুঝিনা তাকে নিব না পানিকে!
রোজা খুলে আগে খেঁজুর খেতে হয়,কিন্তু আমার ভালোবাসা গুলোর দিকে হাত বাড়াই আমি, তারপর আব্বু আম্মুর চোখ রাঙানোতে আবার খেঁজুরের কাছে যাই!
ভালোবাসায় কো ভিলেন থাকবেই, তেমন আমার ভিলেন আমার পরিবার। হাজারটা কথা শুনায় আমাকে তাদের কাছে এত বেশি যাওয়ার জন্য। তাতে কি?
তাই বলে কি আমার প্রেম আঁটকে থাকবে?
সবার আগে হাতছানি দেয় পিয়াজু সোনা, আসলে আমি তাকেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। নাহয় সারাজীবন খেলেও কেন রমজান মাসেও কেন এত বেশি তাকে চাইব?
যখন পিয়াজুর দিকে হাত বাড়াই, তখন আবার আমার জানু ডিমের চপ বলে উঠে, “জানু আমাকে ছেড়ে ওর দিকে কেন? সারাজীবনই তো তাকেই বেশি সময় দাও,এই রমজানে তার কাছে পরে গেলে হয়না? আমি না তোমার সবচেয়ে প্রিয়?
তুমিই তো রোজ তোমার আম্মুকে বল জানু আমাকে করতে, তবে খাওয়ার সময় কেন এত অবহেলা?”
আসলেই তো!
তার কথা তো ঠিকই!
তাই আমি যখন তারকাছে যাই,তখন পাশ থেকে প্রাণু বেগুনি বলে উঠে, ” ও প্রাণু ! আমি যে এখন মুচমুচে আছি, তা কি তোমার চোখে পড়ে না?
তুমি দেরি করে সবার শেষে খাবে,আর আমি নরম হলেই বলবে আমি তো ভালা না!
আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি তোমার ভালো গুলো নিয়েই থাকো। আর আসবে না একদম আমার কাছে”
আহা! এ কি মসিবতে পড়লাম আমি খোদা!
এ কি দোটানায় ফেল আমাকে!
তাদের ফিলিংস শুনে আমার বুক বাপ্পারাজের মত হাহাকার করে ওঠে!
তাই যখন আবার বেগুনিকে মুখে দিতে ধরি তখন আবার ময়না আলুর চপ বলে উঠে, “ও এই তোমার ভালোবাসা?
খুব তো পাম্প মারতে জানো দেখছি!
এমনি সময় ময়না ময়না করে মুখে ফেনা তুলে ফেল!
এমনি দিনে যখন হোটেল থেকে আমাকে আনো তখন তো প্রসংশায় পঞ্চমুখ হয়ে আমাকে চুম্মাচাটি কর, আর রোজা আসলেই সব শেষ?
বাহ্!
হেব্বি লুচ্ছা তো তুমি!
এত এত প্রেম লুকিয়ে রেখে আমাকে ধোকা দিয়েছ!
ছি! আই হেটিউ!”
লে!
এরে এখন ক্যামনে বুঝাই ভাই?
এত হিংসুটে এই যে কি বলব।এর চেয়ে আমার সোনা পিয়াজু ভালো।
ওরে বাবা না বলি এসব, নইলে আবার তেড়ে আসবে বাকিরা।
আমি ব্যার্থ প্রেমিক,কাউকে বোঝাত পারিনা আমার মনের কথা! এত করে বলি তোমাদের সবাইকেই ভালোবাসি, তাও সবাই মানতে নারাজ!
দুঃখে আমার চোখে পানি চলে আসে রে ভাই!
এদের কথা বাদ দিয়ে যখন নিমক পোড়া খেতে ধরি তখন মুড়িমাখা চিল্লিয়ে বলে উঠে, “খা খা, গিলা ভইরা খা!
এখন তো আমাকে চোখে পড়বে না।
এ তোর লজ্জা লাগেনা বাকি সময় সকাল বিকাল সন্ধ্যা রাইত যখন তখন আমাকে খাস চানাচুর দিয়ে?
ও এখন তোর এত নয়া নয়া খাবার পেয়েছিস তাই আমাকে ভুলে তাদের কাছে যাস?
আচ্ছা যা, একটু পর যখন আমি মুড়মুড়ে থাকব না তখন খালি বলিস আহা, ‘চিবাতে কষ্ট হচ্ছে’ ঠাঁটিয়ে মারব চড়!
শালা বদমাইশ!
জানিস কখন কাকে কতটা গুরুত্ব দিতে হয়?
আমার মাঝে বুট,বুন্দিয়া, নিমক পোড়া থাকতেও তোর মন ভরে না?
আর কত চাস রে তুই?”
আল্লাহ্! আমি একে কি করে বুঝাব আমি একে সবচেয়ে গুরুত্ব দেই!
তার মধ্যে আমার প্রিয় বুট,বুন্দিয়া ঝাল মিষ্টি আছে, তাকে কি বাদ দেয়া যায়?
এমনি দিন তো চানাচুর দিয়ে ঝালমাখা খাই, কিন্তু এখন তো সে আরও বেশি স্পেশাল হয়ে যায়, এমন দিনে তাকে বাদ দেয়া যায়?
নাহ্!
আসলে আমিই ভুল ছিলাম, আমি বলসিলাম সবাই আমাকে ভালোবাসে, আসলে কেউই আমাকে ভালোবাসে না।
বাসলে কি স্কুল কলেজে সিরিয়াল নিয়ে তাকে পাওয়ার জন্য চিল্লাতে থাকতাম, এসব ভুলে যায়?
রাতে পড়ার সময়, মোবাইল টিপার সময়, ঘুমানোর সময়, যখন তখন অনুনয় বিননয় করে আম্মুকে বলি মাখিয়ে দিতে মুড়ি, এসব ভুলে যায়?
প্রতি চায়ে যে তাকে চাই এগুলো ভুলে যায়?
নাহ্, সব আমারই ভুল, এ ভুবনে প্রকৃত ভালোবাসার আসলেই কোনো কদর নাই।
যখন ভাজাপোড়া খাই তখন শরবত বলে, “তোর না সারাদিন খুব পিপাসায় গলা ফেঁটে যাচ্ছিল? তা এখন কোথায় গেল সেই পিপাসা?”
শরবত না থাকলে মিল্কসেক বলে, “তুমি এতটা কেয়ার লেস কেন বলত? এইযে আমার মাঝে প্রোটিন আছে, ফল আছে, আমি কত স্মুদ আর কুল, স্বাস্থ্যসম্মত, তাও তুমি আমাকে না খেয়ে কিসব ভাজাপোড়ার দিকে বারবার হাত বাড়াও!
আমি চেষ্টা করি তোমাকে পুষ্টি দেবার, তোমাকে সুস্থ রাখার আর তুমি তোমার নিজের ক্ষতি করার জন্য উঠে পড়ে লেগে থাকো!
লজ্জা লজ্জা!
পড়ালেখা করেও যদি তুমি নিজের ভালমন্দ না বুঝ, তাহলে তুমি পড়া বাদ দিয়ে ঘরের কাজ শিখে কারো বাসায় গিয়ে কাজ কর, তাতে দু পয়সা আয় হবে।
ওহ্ স্যরি ভুল বললাম, তুমি যে অস্বাস্থ্য বানিয়েছ,তাতে তো নিজের ভাত টুকুন বেড়ে খেতে পারনা, কাজ কি করবে তুমি!”
এদের মাঝে আবার কখনও কখনও হান্দায় পরে বিরিয়ানি, হালিম বা অনান্য ডেজার্ট। তখন আবার তাদের কাছে যাওয়ার জন্য ব্যকুল হয়ে পড়ি!
এদের কথা বাদ দেই,আসি এখন জিলাপির কথায়।
এ হচ্ছে আমার সাচ্চা মানে সত্যিকার প্রেম। আমি তাকে খুব ভালবাসি!
কড়কড়া জিলাপি হলে আর কি লাগে!
তবে সে আমার সাথে ব্রেক আপ করেছে।
করার কথাই, কারণ এ রোজায় তাকে আমি যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি।
অনান্য দিনে সবার আগে জিলাপিতে হাত যায়, এবার তা হয়নি।
মন ভরে খেতে পারিনি তাকে, যার জন্য সেও মন খারাপ করে বসে আছে!
আমি খুবই দুঃখিত সোনা!
ওহ্ থুক্কু, সোনা তো আরেকজন, তুমি আমার তামা!
.
.
এ হল আমার একেকটা ভালোবাসা।
ভালোবাসা বলতে ভাজাপোড়া, যাদের জন্য লোভ সামলে রাখা কঠিন আমার পক্ষে।
তবুও ইফতারিতে থাকে হরেক রকমের জিনিস আর সেগুলোতেই গুলিয়ে যাই আমি কোনটা খাব বলে!
যখন ভাজাপোড়া খাই তখন ফলমূল চিল্লিয়ে বলে আমি কানা কি না!
ভালোবাসা বরাবরই খারাপ জিনিস, বুঝতে চায়না অপরজনকে।
তোমন আমার প্রেমিক গুলোও তেমন।
ভাজাপোড়া খেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়,বমি বমি ভাব সাথে অসুস্থতা।
তাও তাদের গিলে সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে পড়ি, পেট নিয়ে নড়তে পারিনা। এমনি শান্তিমত আমার ফোনুকেও সময় দিতে পারিনা! এ দায় কে নিবে?
তবুও ভালোবেসে আমি ভাজাপোড়া গুলোকে আপন করে নিই, যেখানে স্বাস্থ্য সচেতনরা তাদের এড়িয়ে চলে সেখানে আমি তাদের গিলি। তবুও তারা আমাকে ভুল বোঝে!
রমজান গেল সাথে গেল এদের একসাথে পাওয়ার বেলা, আমি তাদের খুব মিস করব।
যে উদ্দেশ্যে লেখা সেটাই জানানো হলনা!
তাদেরকে বলতে চাই
” ভালোবাসি আমার সোনা পিয়াজু,বেগুনি,আলুর চপ, ডিমের চপ সহ সকল ভাজাপোড়া খাবার”

রূপসীনা খুকু

আসসালামু আলাইকুম, আমি খুকু, অদক্ষ হাতে হাবিজাবি লিখি আর সেটাই শেয়ার করছি আপনাদের সাথে! আশা করি ভালো লাগবে! :-D

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close