রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

মায়া

——–১ম খন্ড ———-
মধ্য রাত পেরিয়ে ভোর হতে চললো। আর কিছুক্ষণ পর ভোরের আবছা আলো পৃথিবীর বুককে আলোকিত করবে, এখনো ঘুমানো হলো না সজলের। এমনটি নয় যে ঘুমানোর চেষ্টা সে করে নি।এখন প্রায় এমনি টি হয়।রাতে ঘুম হয় না।বিছানের এপাশ,ওপাশ করতে করতে ঘুমানোর চেষ্টা টুকু ও বাদ দিলো। সিগারেট টা ধরিয়ে বারান্দায় দাড়িয়ে একমনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ল্যামপোস্টের আলো, তার পাশে দাড়িয়ে কুকুরের ঘেও ঘেও শব্দে চারদিকে কেমন জানি শূন্যতা ভর করেছে, সাথে কিছু জোনাকি পোকার আর্তনাদে যেন বিষন্নতা সবকিছুতে ছেয়ে গেছে।।।সেই বিষন্নতাকে তার মন উপেক্ষা করতে পারে নি।।সাধরে, মায়ায়, ভালবেসে গ্রহন করলো। আজ রুপাকে খুব মনে পরছে সজলের।।।।চার বছরের সম্পর্ক খুব সহজে, খুব অবহেলায় কি করে শেষ হয়ে গেল সেটাই ভাবছে।।ভুল টা কার সে আজও জানে না।শুধু জানতো সে খুব ভালবাসে রুপাকে, তার মায়াতে সে আজও বড্ড বিভোর।  জীবন নিয়ে উদাসীন এক যুবক কিভাবে কারো মায়ায় এত টা পাল্টে প্রেমিক হতে শিখেছে সে আজ ও বুঝতে পারে না।।শুধু জানে তিলে তিলে জন্মানো মায়া, তার চোখ,কপালের কালো টিপ, পড়নে নীল শাড়ি, হাতের রেশমি কাঁচের চুরি, হাতে হাত রেখে হাটা, সবকিছুর মায়ায় সে আজ খুব ক্লান্ত কেননা সবকিছু তাকে খুব তাড়া করে বেরায়।।।।দু মাস হলো রুপার সাথে কোন কথা নেই।।। আজ খুব মনে পরছে।যেই মনে পরার কারন সে বুঝতে পারে না, ফোন বন্ধ জেনেও সারা রাত ফোন দেবার রহস্য খুজে পায় না।।তাকে হারিয়ে ফেলেছে জেনেও খুজে পাবার আকুতি কমে না।।।সবকিছু ই আজ অর্থহীন, তারপর ও সজল সব সুখ যেন এখানেই খুজে পায়।তবে এটা কি??কিসের টান তাকে সবসময় তারা করে বেরায়? যার কোন শেষ নেই, প্রকাশ করার উপায় নেই।বড্ড অচেনা।যাকে ধরা-ছোয়া যায় না।যাকে চাইলেও আপন করে নেওয়া যায় না, আবার দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় না ।।তবে কি এটা?
মায়া???
সকালের সূর্য উঠে ভরের আলোতে সবকিছু আলোকিত, কুকুরও শান্ত, ল্যমপোস্টের আলো নিভে গেছে।। সজলের সব কষ্ট নিভে,জমানো অার্তনাদ চুপ হয়ে কোন এক সূর্য উঠবে তার আকাশে তাকে আলোকিত করতে। যেই পৃথিবীতে মায়া নামক কিছু তাকে আর তাড়া করে বেড়াবে না। নিকোটিনের ধোয়া আর নির্ঘুম রাত তার সঙ্গী হবে না।ভালবাসার নীল রঙে ঘেরা থাকবে তার আকাশ।।প্রতিদিনের মত আজ ও এক ই আশায় ঘুমাতে গেল সজল।।।।

———-২য় খন্ড ———
বেশ দেরি করে ঘুম থেকে উঠলো সজল। উঠে দেখে ফোনে ১২ টি মিসড কল। নাম্বারটা অপরিচিত।।ইমারজেন্সি ফোন মনে করে ব্যাক করলো, কিন্তু ফোন কেউ ধরলো না।সজল আর ফোন দেওয়ার তাগিদ অনুভব করলো না। ফ্রেশ হয়ে বাইরে চলে গেল আড্ডা দিতে। বাসায় তার বেশি থাকতে ভালো লাগে না। দম বন্ধ হয়ে আসে।। তার বন্ধু মহল ই এখন তার শান্তির জায়গা।দিন শেষ হয়ে রাত নেমেছে বাড়ি ফেরার নাম নেই।।।।আর সেটা নিয়ে বাসার কারো খুব বেশি মাথা ব্যথা ও নেই।কেননা ছেলে যখন বেকার হয়ে ঘুরে বেড়ায় তার দাম বাসায় যেমন থাকে না তেমনি সমাজে ও থাকে না৷ তাকে সবাই এড়িয়ে চলাই মঙ্গল মনে করে।রাত ১১টা বেজে গেছে।।।হঠাৎ করে আবার সেই নাম্বার থেকে ফোন আসলো।।।এতক্ষণে সে ভুলেই গেছিলো এই ফোনের কথা।ফোন রিসিভ করলো সজল।
-হ্যালো।
-ওই পাশ থেকে কোন রেসপন্স নেই।
-হ্যালো।কে বলছেন??
-চাপা কান্নার শব্দ আসছে।
এবার সজল একটু চুপ হয়ে গেল। প্রতিটা নিশ্বাস খুব পরিচিত সজলের।
-রুপা,কেমন আছো?
-ভালো।তুমি???
-আমি তো বেশ ভালো আছি এখন। কোন প্যারা নেই লাইফে।।।ঘুরছি ফিরছি।
-হুম।কি করে বুঝলে আমি ফোন দিয়েছি?
-তুমি আমাকে এতটাই প্যারা দিয়েছো যে, তোমার প্রতিটা নিশ্বাস ই আমার খুব চেনা।
-একটু হাসির চেষ্টা রুপার।
-ফোন কেন দিলে এত দিন পর?
-মনে পরছিলো খুব।।
-তাই??বাহ।।।শুনে ভালো লাগলো।।আমাকে কেউ মনে করে।
-কেন আমাকে তোমার মনে পরে না?
-হা হা হা। না একদম ই না।।যেই যন্ত্রণা একবার বিদায় হয়েছে,তাকে আবার মনে করে কাজ কি।।বেশ ভালো আছি।
-ওহ।ভালো।।ভালো থাকো দোয়া করি।
-তুমিও ভালো থাকো।
-আচ্ছা রাখি তাহলে।
-ওকে।।।বাই।
ফোন রেখে সজল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে নি।রাস্তার পাশে বসে পড়লো।চোখ দিয়ে পানি পরছে। গত কয়েট মিনিট কি হলো সেটাই ভাবছে শুধু। রুপা তাকে ফোন দিয়েছে কিন্তু সে একটুও ভালো ব্যবহার করলো না।।ছেলেরা কাদলে লজ্জা তাই চোখ মুছে ফেললো সজল।।সাথে সাথে রুপাকে আবার ফোন দিলো সজল।।কিন্তু কেউ ফোন ধরলো না আর।।।ফোন দিতেই থাকলো। এক সময় নাম্বারটি বন্ধ দেখাচ্ছে। সজল এখন পাগল প্রায় অবস্থা।সারা রাত রুপাকে ফোন দিয়েই কাটালো। এভাবে সাত দিন কেটে গেল। সজল এর রাত এখন যেন আগের তুলনায় বেশি দীর্ঘ,  যন্ত্রণা দ্বিগুণ। আফসোস তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।সে রুপার সাথে একটু ভালো করে কথা বললেই পারতো..।রুপা কেন কাঁদছিলো?রুপা কী এখনো তাহলে আমাকে ভালবাসে? এসব প্রশ্ন তাকে সবসময় তাড়া করে বেড়াচ্ছিল।

  ——-  শেষ খন্ড ———
প্রায় এক মাস পর রুপাকে ফোনে পেল সজল।।এবার আর কান্না থামাতে পারলো না ।
-কান্নাঝরা কন্ঠে বলতে লাগলো, তোমার কেন এত অভিমান?আমি একদম ভালো নেই রুপা তোমাকে ছাড়া।
তোমার মায়া আমাকে ঘুমাতে দেয় না।। আমার প্রতিটা রাত শুধু তোমার মায়ায় কাটে।আমাকে ক্ষমা করে দাও না? সবকিছু নতুন করা শুরু করা যায় না???
রুপা কাঁদছে ফুপিয়ে ফুপিয়ে। কিছু বলতে পারছে না। সজল যেন রুপার কান্নার শব্দেই তার সুখ,তার ভালবাসা খুজে পাচ্ছে।।কেননা রুপাও ভালো নেই তাকে ছাড়া, এর চেয়ে তৃপ্তি আর কি হতে পারে??
-রুপা, চলো দেখা করি।একসাথে বসে সবটুকু মান,অভিমান বিসর্জন দিয়ে নতুন করে স্বপ্ন বাধি।
রুপা রাজি হলো। রমনা পার্কের বটমূল তাদের প্রিয় জায়গা। সেটাই ঠিক হলো।। আগামি পরশু তাদের দেখা হবে।

রুপা বসে আছে সজলের অপেক্ষায়।।পরনে নীল শাড়ি, হাতে রেশমি চুরি,কপালে বড় কালো টিপ।সজলের পছন্দের কোন কিছুর ই কমতি রাখে নি। আজকেও লেট সজলের।দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মিটি মিটি পায়ে হেটে আসছে।পরনে হলুদ পাঞ্জাবি,চুল গুলো উসকে খুসকো। একদম হিমু লাগছে,হাতে এক গুচ্ছ কদম ফুল।সজল দূর থেকে দেখে ই মুচকি হাসছে।যখন দুজন মুখোমুখি হলো, কেউ কোন কথা বলতে পারছে না। ঠিক আগের মত লজ্জা পাচ্ছে।সজল কি করবে বুঝতে না পেরে বলে উঠলো, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে রুপা। রুপা লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলো। দুজনের চোখে তৃপ্তির ঢেউ খেয়ে গেল৷ সজল কদম এর গুচ্ছ এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলো, -তুমি কি আমাকে একটু রাতে ঘুমাতে দিবে??শান্তি তে??
এটা শুনে রুপা চমকে উঠলো আর সাথে সাথে হাসিতে ফেটে পড়লো দুজন।রপা বললো, না ঘুমাতে দিবো না।সারা রাত দুজনে গল্প করবো।।।হবে তো?
সজল বললো,হবে মানে।।বেশ হবে বলে দুজনে হাত ধরে হাটতে শুরু করলো।

Md. Rashidul Islam Rashed

বই পড়ার পাশাপাশি লেখালেখি করতে পছন্দ করি। তাছাড়া বর্তমানে মাভিবিপ্রবি তে বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে ৩য় বর্ষে পড়াশুনা করছি।

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close