রহস্যসত্য ঘটনাহরর

ব্ল্যাক ম্যাজিক ও আমার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ( পর্ব -২)

এরপর থেকে যতদিন যেতে থাকে আমার অবস্থা তত বেশী খারাপ হতে থাকে।রাতে ঘুম হতো না ঠিকমতো।একটু পর পর ঘুম ভেঙ্গে যেতো। অন্ধকার দেখলে প্রচন্ড ভয় হতো। রুমের ভেতর জলজ্যান্ত মানুষ হেঁটে গেলেও ভয়ে কেঁপে উঠতাম হুটহাট। ভীষনরকমের দুঃসাহসী আমি অজানা কারনেই হঠাৎ করে ভীতু একটা মেয়ে হয়ে গেলাম। সম্ভবত সাধক বাড়ির সে পরিবেশটা মনের ভেতর খুব বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল৷

সে যাই হোক পুরান ঢাকার সে বাড়িতে আরও বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু কোন লাভ হয়নি৷ সাধক বাবা জানালেন সময় লাগবে অনেক। ধৈর্য ধরতে হবে৷ কিন্তু আমার ফ্রেন্ডের ধৈর্য্য ধারণ করার ব্যাপারটা পছন্দ হলো না। তার ইন্সট্যান্ট রেজাল্ট লাগবে, তাই আমরা স্বরনাপন্ন হলাম অন্য এক ওঝার কাছে।

ওরা দু’জন স্বামী স্ত্রী ছিলো। জাদুটোনা করে৷ স্ত্রীর বাবা টাঙ্গাইলের সবচেয়ে বড় তাবিজ- কবচ আর পাথর ব্যাবসায়ীদের মধ্যে একজন। চেহারা আর হাত দেখেই নাকি তারা মানুষের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে৷ মান্ধাতা আমলের একটা খাতা আছে তাদের, ওটা দেখে দেখে মন্ত্র তন্ত্র পাঠ করতো৷ নানান রকম বাণ মারা, বশীকরণ মন্ত্র আর হাবিজাবি জিনিস দিয়ে ভর্তি ছিলো সে খাতা। (!!!)

তারা থাকতো রায়ের বাজার নীমতলি শিবমন্দিরের আশেপাশে। এখন কোথায় থাকে জানি না।একটা দো’তলা বাড়িতে ছোট একটা রুম নিয়ে থাকতো দু’জন। আসবাবপত্র বলতে ছিলো একটা কাপড় রাখার আলনা, নিচে বড় একটা তোশক আর দেয়ালের সাথে এটাচ করা বিশাল টিভি৷ ভীষনরকমের অপরিচ্ছন্ন একটা পরিবেশ ছিলো। বিছানার সামনে ইঁদুর মরে পরে থাকতো, কেউ পরিষ্কার করতো না। ঘর ঝাঁট দিতো না, খাবার খেয়ে এঁটো বাসন পত্র, মাছ -মাংস সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখতো ঘরের ভেতর। ওসবের ওপর পিঁপড়া তেলাপোকা ঘুরে বেড়াতো। দরজা জানালা সমস্ত কিছু বন্ধ থাকতো বড় বড় চাদর আর কাঁথা দিয়ে। ভয়ঙ্কর দমবন্ধ করা একটা জঘন্য পরিবেশ ছিলো। ঘরের মধ্যে সারাক্ষণ একটা বোঁটকা গন্ধ লেগেই থাকতো।

ঐরকম জঘন্য পরিবেশে আমি আর আমার বান্ধবী প্রতিদিন বসে থাকতাম একটুখানি ম্যাজিকের আশায়। নানান রকম কেরামতি দেখেছি সে বাসায়। ঐগুলা কী ব্ল্যাক ম্যাজিক ছিলো, নাকি ধোঁকাবাজি সেটা নিয়ে আমি এখনও দ্বিধাদ্বন্দে ভুগি। একদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমার সে বান্ধবীকে তারা একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললো – ” এটা মনে মনে তিনবার পড়ো। তারপর দেখো কী হয়! “

তাদের কথামতো সে কাগজটা হাতে নিয়ে মন্ত্রটা পড়তে লাগলো এবং সাথে সাথেই একটা অবাক করা কান্ড ঘটে গেলো। আমার সেই বান্ধবীর বর তাকে ফোন দিয়ে টানা দশ মিনিট ফোনে কথা বললো, ভালো মন্দ কথাবার্তা জিজ্ঞেস করলো! অথচ এমনটা আগে হতো না।হোস্টেলে আসার পর থেকে ভাইয়া তাকে কখনোই ফোন দিতো না। ঠিকমতো একমিনিটও কথা বলতো না। ব্লক লিস্টে ফেলে রাখতো।

সে যাই হোক, ঐ অবস্থা দেখে আমার মাথা যায় খারাপ হয়ে। আমিও জোর করতে থাকি সে মন্ত্রটা শেখানোর জন্য।তারা কিছুতেই দিতে চায় না। শেষে অনেক জ্বালা-যন্ত্রনা দোয়ার পর ছোট্ট একটা কাগজে মন্ত্রটা লিখে দিয়েছিল। বলেছিল ভর সন্ধ্যাবেলা কিংবা মাঝরাতে পরিষ্কার কাপড় পড়ে এ মন্ত্রটা তিনবার পড়তে। যার নাম ধরে পড়বো, সে নাকি পাগল হয়ে যাবে আমার সাথে কথা বলার জন্য৷ ( এটা ক্ষনস্থায়ী প্রক্রিয়া। দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার জন্য কুফরি করতে হয়।)

একথা শুনে তো আমিই পাগল হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। যাস্ট এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য আমার ক্রাশের নাম নিয়ে বেশ কয়েকবার সেই মন্ত্র পড়েছিলাম।ভেবেছিলাম আমার ক্রাশ পাগল হয়ে ফোন দিবে আমাকে।।বাট এমন কিছুই হয়নি। আমি বার বার হতাশ হয়েছিলাম। (এখন মনে মনে দোয়া করছি, এ পোস্ট যেনো আমার ক্রাশ কখনোই না দেখে। ইজ্জত পানি পানি হয়ে যাবে।)

সে যাই হোক ঐ মন্ত্র তন্ত্রতে কোন কাজ হয়নি ঠিকই, কিন্তু ঘটে গিয়েছিল আর এক ঘটনা। নিজের মধ্যে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন টের পাচ্ছিলাম আমি। কেমন যেনো অস্থির অস্থির ভাব থাকতো মনের ভেতর, রাগ বেড়ে গিয়েছিল, কোন কিছুতে মনযোগ থাকতো না। দিনরাত কি যেনো ভাবতাম। অকারনেই ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম। মাঝরাতে উঠে বসে থাকতাম আর অকারনেই কাঁদতাম। ফেসবুকে বাচ্চাদের মতো পোস্ট দিতাম – ” ভালো থাকার অভিনয় করতে করতে আমি ক্লান্ত! “

অথচ আমি ভালোই ছিলাম, খারাপ থাকার মতো কিছুই ছিলো না জীবনে। তারপরেও ডিপ্রেসড থাকতাম৷ রাতে ঘুমানোর সমস্যাটা আরও প্রকট আকার ধারণ করতে শুরু করলো ক্রমান্বয়ে৷ খেয়াল করে দেখলাম প্রতিদিন ভোর তিনটায় শরীর ঝাঁকানি দিয়ে ঘুম ভেঙ্গে যেতে লাগলো আমার। কোথায় যেনো শুনেছিলাম ভোর তিনটা খুব খারাপ একটা সময়। Devils hour বা শয়তানের সময় বলে এটাকে। এসময় নাকি খারাপ জিনিসের শক্তি আরও বেরে যায়। ব্যাপারটা যতো মনে পড়তো, ভয়ের পরিমাণ ততোই বাড়তো আমার। এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেলো, যখন আমি একদিন টের পেলাম ঘুম ভাঙার পর পর সমস্ত ঘরের ভেতর ছায়ামতো কী যেনো একটা ঘুরে বেড়াচ্ছে।মাঝে মাঝে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। জিনিসটার আকৃতি বোঝা যায়, কিন্তু চেহারা দেখা যায় না। তার চারিদিক ঘিরে থাকে ঘনকালো নিকষ অন্ধকার। প্রচন্ত ভয় হতো আমার। রাতে ঘুমানোই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। সারাক্ষণ গুটিশুটি মেরে বিছানায় শুয়ে থাকতাম আর সকাল হবার অপেক্ষা করতাম। তখন খুব ভয় লাগতো ব্যাপারটা, কিন্তু এখন মনে হয় সমস্ত জিনিসটাই হয়তো আমার মনের কল্পনা আর ভয় ছিলো। ঐসব জঘন্য পরিবেশ, প্যারানরমাল কথাবার্তা আর ব্ল্যাক ম্যাজিকের রিচ্যুয়ালগুলি আমার মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলেছিল।

আবার এক জায়গায় শুনেছিলাম, এসব মন্ত্র তন্ত্র সঠিক নিয়ম না মেনে ট্রাই করলে নাকি অনেক ক্ষতি হয়।মানুষের আচার আচরনে খুব প্রভাব ফেলে এসব। জীবনে দুর্ভাগ্য, বিষাদ নেমে আসে। আমি জানি না কী ছিলো ওটা, কিন্তু যাই হোক না কেন, খুব টর্চারিং ছিলো ব্যাপারটা।

সে যাই হোক, এভাবেই চলছিলো দিনকাল। আমরা প্রতিদিন বিকেলে তাদের বাসায় যেতাম আর রাতের খাবার খেয়ে হোস্টেলে ফিরতাম।কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিলো না, কেবল দিনরাত আড্ডা হতো। আর আড্ডার মাধ্যমে চলতো ব্রেইনওয়াশ। তারা সারাদিন বলতো এই পাথর নেও তোমার ভালো হবে, ঐ পূজা করো, তুমি ওটা করতে পারবে। সবকিছুই আমার কাছে বুজরুকি মনে হতো৷ কিন্তু আমার প্রেমে অন্ধ বান্ধবী ছিলো তাদের চরম ভক্ত। তারা যা বলতো, তাই হাসিমুখে মনে নিতো। এবং তার সেফটির চিন্তা করে বাধ্য হয়ে আমাকেও যেতে হতো তার সাথে সাথে৷ তাছাড়া অদ্ভুত একটা আকর্ষণ ও কাজ করতো। তারা কী করে সেটা দেখার কৌতুহলেও ছুটে যেতাম আমি প্রতিদিন।

তো যাই হোক, এক সন্ধ্যায় ওরা বললো আজ কামাক্ষ্যা দেবীকে নামাবে।।ওটা ছিলো আমার লাইফের মোস্ট মেমোরেবল একটা ঘটনা। অনেকদিন পর্যন্ত মনে ছিলো।

(চলবে)

Neela Moni Goshwami

জন্ম ২৭ ডিসেম্বর , ১৯৯৬, কুমিল্লা। ভীষন হাসিখুশী আর খানিকটা পাগল টাইপের এই মেয়েটা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে খুব। তার প্রিয় শখ বই পড়া, লেখালেখি করা আর ছবি আঁকা এবং প্রিয় স্বপ্ন নিজের লেখা একগাদা বই হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো! ভবিষ্যতে সে একজন সত্যিকারের ভালো লেখিকা হতে চায়। আর কাজ করতে চায় সুবিধাবঞ্চিত শিশু আর আশ্রয়হীন বৃদ্ধদের জন্য। বর্তমানে সে ন্যাশনাল কলেজ অফ হোম ইকোনমিক্স থেকে শিশু বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছে। লেখিকার " তাকে ভালোবেসে ", " কঙ্কাল সরোবর " এবং " এটিকুয়েটা " নামে তিনটি বই আছে।।তাছাড়া তিনি " রাইটার্স ক্ল্যাব বিডি " প্রজেক্টটির ফাউন্ডার।

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close