রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

বুক রিভিউঃ ইয়োর নেম

বইয়ের নামঃ ইয়োর নেম
লেখকঃ মাকোতো শিনকাই
অনুবাদকঃ রুদ্র কায়সার
প্রকাশকঃ ভূমিপ্রকাশ
প্রকাশকালঃ ২০১৯
ক্যাটাগরিঃ থ্রিলার
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ২০৮
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৯০ টাকা
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৮.৫/১০
…………………………………………..………………..….

“এই উপন্যাসটি সর্বস্তরের পাঠকের জন্য নয়”

কি?চমকে গেলেন?হ্যাঁ। আমিও চমকে গিয়েছিলাম বইয়ের প্রথমেই লেখকের এমন অদ্ভুত মন্তব্য দেখে। আরেহ উপন্যাস তো যে কেউই পড়তে পারে।তাহলে এ আবার কেমন উপন্যাস যা ব্যক্তিবিশেষে পড়া বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে লেখক? কিই বা আছে এতে যে লেখক প্রথমেই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয় নি?

প্রশ্নগুলো প্রথমেই আপনার টনক নাড়িয়ে দিবে।কেননা যেখানে লেখক প্রথমেই এমন কথা বলে তাহলে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা পাঠকের জন্য বোধহয় ইন্টারেস্টিং। তাই তো মনে হওয়ার কথা।কিন্তু না।আপনাকে,আমাকে একেবারে ভুল প্রমাণিত করে দিবে সম্পূর্ণ উপন্যাসটি।
হ্যাঁ। ঠিকই দেখেছেন।সত্যিই এমন কোনো কাহিনী নেই যা আপনাকে প্রতি মুহূর্তে শিহরণে ভরিয়ে দিবে।এতে নেই এমন কোনো গতি যা রোলার কোস্টারের মত আপনাকে একটানে শেষ অব্দি নিয়ে যাবে।পাতায় পাতায় নেই কোনো টুইস্ট,নেই কোনো পৃথিবীর ভবিষ্যতকে পাল্টে দেওয়ার মত দুর্ধর্ষ কোনো ষড়যন্ত্র বা জটিল নীলনকশা।
কেননা এটি সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন একটি উপন্যাস।আর দশটা উপন্যাসের মতো প্রথমে আপনাকে নিয়ে যাবে না কোনো রোমাঞ্চকর বা লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বেড়াজালে।তাহলে বুঝেন যে লেখক কেনই প্রথমে বলে দিয়েছে যে এটি সর্বস্তরের পাঠকের জন্য নয়?ধরতে পেরেছেন তাহলে?

তাহলে কাদের জন্য এই উপন্যাসটি?
প্রশ্ন আসে নিশ্চয়ই?তাহলে শুনুন।
আপনি কি গিরগিটির মতো রং বদলাতে পারেন?আরে আরেহ নেগেটিভ মাইন্ডে নিয়ে যাবেন না আবার।মানে গিরগিটি যেমন রং বদলানোর মধ্য দিয়ে চারপাশের পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়,তেমনি কিছু পাঠক বইয়ের যেকোনো বিষয়বস্তুর সাথে নিজেকে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে।আর আপনি যদি তাদের দলে হোন তবে আপনাকে অভিনন্দন। বইটি আপনার জন্যই।আপনার মধ্যে যদি এই গুণট থেকে থাকে তাহলে উপন্যাসটি আপনার জন্য বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠবে।
এবার আসা যাক মূল কাহিনীতে

জাপানিজ লেখক, পরিচালক ও মাংগা আর্টিস্ট মাকোতো শিনকাই এর বহুল আলোচিত উপন্যাস “ইয়োর নেম ” পড়ার সময় বারবার আপনার মনে ঊঁকি দিবে আরেকটু বহুল পরিচিত বাংলা উপন্যাস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ” ইচ্ছা পূরণ ” গল্পটি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ” ইচ্ছা-পূরণ ” গল্পটি ছোটবেলায় পড়েন নি এমন মানুষ খুব কম পাওয়া যাবে। তাতে যে ইচ্ছা ঠাকুরনের দেওয়া বরে সুবলচন্দ্র ও তার ছেলে সুশীলচন্দ্রের দেহের যে পরিবর্তন ঘটেছিলো তা মনে আছে নিশ্চয়ই? অর্থাৎ বৃদ্ধ সুবলচন্দ্রের দেহে ভর করেছিলো পুত্র সুশীলচন্দ্রের দুরন্তপনা আর বালক সুশীলচনচদ্রের দেহে ভর করেছিলো পিতা সুবলচন্দ্রের বার্ধক্য। কি এক অদ্ভুত গল্প তাই না? বেশ মজার ছিল কিন্তু গল্পটি। কিন্তু ইয়োর নেমের উপলব্ধি আরো গভীর। এর বিস্তৃতি আরোও বিশাল।

গল্পটা হাইস্কুল পড়ুয়া দুটো ছেলে মেয়ের।যাদের মনের গভীরে লালিত হচ্ছে এক অদ্ভুত স্বপ্ন।একজন চায় মফস্বল শহর থেকে পাড়ি জমাবে স্বপ্নের শহর টোকিওতে।আর আরেকজন নিজেকে আবিষ্কার করছে পাহাড় বেষ্টিত, আধুনিক সভ্যতা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন,একেবারেই ছোট্ট একটা শহরে।

ধরুন মনের গভীরে আপনার স্বাধ – একদিন পাড়ি জমাবেন স্বপ্নের শহরে৷ তারপর একদিন স্বপ্নে দেখলেন আপনি আপনার স্বপ্নের শহরে! কিন্তু, অবাক করা বিষয় হলো আপনি আপনার শরীরে বরং আপনি নিজেকে আবিষ্কার করেছেন অন্য একজনের শরীরে, অন্য কোনো লিঙ্গে।
কি এবার অদ্ভুত লাগছে না? এবার ধরুন আপনার মতোই আরেক অজানা শহরে আরেক তরুণ/তরণী আপনার দেহে জায়গা নিচ্ছে । ক্রমে রহস্যজনক স্বপ্নটির কারণে দু’জনের জীবনের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্থ হতে শুরু করলো। সেই সাথে ঘটতে থাকা অদ্ভুত সব ঘটনা ঘনীভূত করতে শুরু করলো দৈনন্দিন জীবনকে। যত দিন যেতে লাগলো পুরো ব্যাপারটা যেন আরও বেশি করে জট পাকাতে আরম্ভ করলো!প্রকৃতির অজানা রহস্যগুলোর মতোই এর কোনো ব্যাখ্যা হয় না। ব্যাখ্যাতীত স্বপ্নটি ধীরে ধীরে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলো দু’জন অপরিচিত ছেলেমেয়ের জীবনে! এমনই অদ্ভূতুরে প্লটের গল্প ” ইয়োর নেম “। আগেই বলেছি যে ধীর-স্থির গতির এই উপন্যাসে নেই টানটান উত্তেজনা, পাতায় পাতায় নেই টুইস্টের কোনো ছোঁয়া, নেই শিহরিত হবার মতো কোনো গল্প।
খুবই সাধারণভাবে অসাধারণ একটা থিম নিয়ে ” ইয়োর নেম “। যার প্রধান দুটি চরিত্র মিৎসুহা (মেয়ে) ও তাকি(ছেলে) নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করে গিয়েছে নিজের অনুভূতি। আপনি যদি এই গল্পের সাথে মিশে যেতে পারেন শুধুমাত্র তখনই আপনি ” ইয়োর নেম ” এর মূল্যায়ন করতে পারবেন তার আগে নয়। কারণ??? কারণ এটি যে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী উপন্যাস। এটিকে অনুভব করতে হবে নিজেকে দিয়ে তবেই তো চোখের সামনে দেখতে পাবেন- ব্যস্ত টোকিও শহরে হেঁটে চলা তাকিকে কিংবা নিজেকে আবিষ্কার করবেন আধুনিক সভত্য থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন পাহাড় ঘেরা অপরূপা এক হ্রদের পাড়ে, যেখানে মিৎসুহা থাকে। চান কি তাদের অনুভূতি গুলো ছুঁতেও পারবেন হাত বাড়িয়ে।

ব্যাখ্যাতীত স্বপ্নটি ধীরে ধীরে দুজন অপরিচিতের জীবনে যে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে তা কি দুজনের জন্য হবে সুখকর নাকি দুজনের জীবনেই বয়ে আনবে কোনো রহস্যের মায়াজাল?দুজনের আত্নার যে মিলবন্ধন তৈরি হয়েছিল তার কি কোনো সমাপ্তি আছে? কিই বা ঘটতে চলেছে সামনে?নিয়তি কি তাদের এক করে দিবে নাকি স্বপ্নের অন্ধকারের গভীরে তলিয়ে যাবে তাদের দেখা সেই স্বপ্নই?
জানতে হলে শেষ অব্দি পড়ে দেখতে হবে এই টুইস্ট ছাড়া,থ্রিল ছাড়া থ্রিলার উপন্যাসটি।

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
বইটা পড়ার আগেই এনিমেটা দেখা হয়েছিল । অসাধারন ছিল সেই এনিমে।আর এখন উপন্যাসটাও পড়ে ফেললাম। এটাও খুবই চমৎকার ছিল। অনুবাদ বেশ ঝরঝরে। পড়তে তেমন অসুবিধা হয়নি। আলাদা আলাদা দুইটা ফন্ট ব্যবহার করা হয়েছে।’মিৎসুহা’ বা মেয়ের চরিত্রের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে “সুতন্বী ফন্ট” আর ‘তাকি’ বা ছেলের চরিত্রটির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ” চারু চন্দন” ফন্টটি।যে কারণে কে কখন কথা বলছে তা বুঝতে সমস্যা হয়নি।আর ভেতরে ভেতরে ঝরঝরে লেখাগুলোর সাথে ছিল চমৎকার কিছু ইলাস্ট্রেশন ।সব মিলিয়ে বেশ ভালোই লেগেছে।

লেখক পরিচিতিঃ

মাকোতো শিনকাইয়ের জন্ম ১৯৭৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি।একাধারে তিনি একজন এনিমে ডিরেক্টর,সিনেমাটোগ্রাফার,লেখক,প্রডিউসার,মাংগা আর্টিস্ট।এছাড়া এনিমেতে কন্ঠও দিয়েছেন।এনিমের জন্য তিনি জাপানে ‘নব্য হায়াও মিয়াজাকি’ হিসেবে স্বীকৃত।’ইওর নেম’,’ফাইভ সেন্টিমিটার পার সেকেন্ড’,গার্ডেন অব ওয়াডস’ তার আলোচিত সৃষ্টি,যেগুলো উপন্যাস ও এনিমে উভয় দিকেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

হ্যাপি রিডিং

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close