বাংলা বানানসাহিত্যস্কিল ডেভলপমেন্ট

বানান নিয়ে একটি ব্রেনগেম

বানান এমন একটা জিনিস, অধিকাংশ সময়ই শব্দটি আপনার এত পরিচিত, এতবার ব্যবহৃত বলে সেটা যে ভুল, তা আপনার চোখ এড়িয়ে যায়। সে জন্যই অন্য একটি “চোখের” সাহায্য নিলে সেসব বানানগুলো সহজেই ধরা পড়ে যায়।
ভুল বানানে ভর্তি কোনো লেখা পড়তে যে কোনো পাঠকেরই খুবই অস্বস্তি/বিরক্তকর লাগে। তাই বানান ভুল না থাকাটাই কাম্য। তবে বানানটা ভুল হলেও, যতই বিরক্তি লাগুক, গল্পটা পড়তে কিন্তু আমাদের কোনোই অসুবিধা হয় না। কারণ আমাদের মস্তিষ্কের কোনো এক কোণায় সঠিক শব্দটি আছে, এবং পড়ার সময় বাক্যের সাথে ভুল শব্দটিকে চিনে সেই মস্তিষ্কই সঠিক শব্দটিকে আপনার চোখের সামনে নিয়ে আসে। একই ভাবে শব্দগুলোও আপনার মস্তিষ্কে জমা হতে থাকে। সে কারণেই ভালো লেখক হতে হলে বেশি বেশি বই পড়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ ওইসব বইতে আপনি যত শব্দ পড়বেন সেগুলো প্রয়োজনের সময় আপনার মস্তিষ্ক ঠিকই হাজির করবে।

এটা যদি না হতো, তাহলে আপনি কখনোই নিচের এই উদাহরণের লেখাগুলো পড়তে পারতেন না। একবার চেষ্টা করে দেখুন, দেখবেন, অনেক অতিরঞ্জিত করে ভুলগুলি করা হলেও একবারেই আপনি বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনুচ্ছেদগুলো অবলীলায় পড়ে যেতে পারছেন।
অবশ্য, পুরো একটা বই যদি এমন হত, আপনি হয়ত ঠিকই পড়তে পারতেন, বা আপনার মস্তিষ্ক ঠিকই সঠিক শব্দটা সামনে এনে হাজির করত, কিন্তু ততক্ষণে আপনার ধৈর্যের শেষ বাধটি অতিক্রান্ত হয়ে যেত, তাই বইটি ছুঁড়ে ফেলে দিতেন, বা তার চেয়েও ভালো – পেট্রোল ঢেলে সেটাতে আগুন ধরিয়ে দিতেন।
যাইহোক, লাগুক না একটু অস্বস্তি বা বিরক্তি, চলুন হয়ে যাক একটা ছোট্ট মজার “খেলা” – আমাদের ব্রেন যে কতটা স্মার্ট সেটা পরীক্ষা করার খেলা। দেখুন তো পড়তে পারেন কি না? উল্লেখ্য, এটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটা নিচেই দিয়েছি।
(১)
“একনিদ আমি যনখ এটকি মাঠের ভেরত দিয়ে হাঁছটিলাম, আমি দেখমাল, সজুব ঘাসের প্রান্তররে ওপাশেই এটকি বিলাশ রাজপ্রাদাসের মত বাড়ি! আমি অকাব হয়ে তায়িকেই রইমাল, কারা থাকে ওনাখে? অনেক কৌহুতল নিয়ে আমি এয়িগে চলালম। বড় লোহার গেটটির পাশেই এক তাড়গা যুকব রাইলেফ হাতে দাঁড়িয়ে আছে! দেখে আরাম জ্ঞান হাবারার দশা হল!”
(২)
“One day whne I wsa wakling thoruhg a meadow, I swa a huge masnoin ovre the grssay flied. I wsa spellbound thniknig, who lvies theer? Cuiruosly I ketp gonig. Bedise the lagre iron gate a storng yonug man was stnadnig wiht a rilfe in his hadn. I alsomt fanited teher.”
আপনার মোবাইল বা ল্যাপটপে আগুন ধরিয়ে দেবেন না! আমাকেও গালাগালি শুরু করবেন না! এটা শুধুই একটা ব্রেইনের খেলা ছিল।
ইংরেজিতে এমন খেলা আমি আগেও দেখেছি, কিন্তু বাংলায় দেখিনি, তাই আমিই সম্ভবত প্রথম বাংলায় এমন একটা বাক্য নিয়ে খেলা তৈরি করলাম। তাছাড়া ইংরেজিতে আকার ও-কার এসব না থাকায় খেলাটা সে ভাষায় অনেক সহজ হয়। বাংলায় অনেক বেশি হোঁচট খেয়েছেন নিশ্চয়ই? তবে ৯৫% পাঠকই ১০০% শব্দ ঠিকভাবে পড়তে পেরেছেন বলে আমার বিশ্বাস।!

(৩)
একইরকমভাবে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট Dr Justin Jones নিউরোলজিক্যাল স্ক্রিনিং টেস্টের জন্য নিচের এই লেখাটা ব্যবহার করে থাকেন (ইন্টারনেটে এটা খুঁজে পাবেন), এবং তার মতে যিনি এই লেখাটি পড়তে পারবেন, তার ব্রেন এখনো তরুণ, পারকিনসন্স রোগ তাকে এখনো ধরতে পারেনি! (কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে যান, তারপরে পড়া শুরু করুন)
7H15 M3554G3 53RV35 7O PR0V3 H0W 0UR M1ND5 C4N D0 4M4Z1NG 7H1NG5!

1MPR3551V3 7H1NG5! 1N 7H3 B3G1NN1NG 17 WA5 H4RD BU7 N0W, 0N 7H15 LIN3 Y0UR M1ND 1S R34D1NG 17 4U70M471C4LLY W17H0U7 3V3N 7H1NK1NG 4B0U7 17, B3 PROUD! 0NLY C3R741N P30PL3 C4N R3AD 7H15! PL3453 F0RW4RD 1F U C4N R34D 7H15

বানান নিয়ে ব্রেন গেমের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

আমাদের মোবাইল বা কম্পিউটরে কিছু টাইপ করলে সেখানে “অটোকারেক্ট” বলে একটা অপশান এনাবল (ডিফল্টে তাই থাকে) করা থাকলে সাধারণ বা কমন শব্দগুলি টাইপের সময় ভুল করলেও সেগুলো নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায়, বিশেষ করে ইংরেজিতে (বাংলার ইউনিকোডে (অভ্র) হলেও বিজয় যেহেতু ইউনিকোডে সৃষ্ট না, সেটাতে এই অটোকারেক্ট কাজ করে না)। যেমন আপনি টাইপ করছেন wehn i wsa gonig সেটা নিজে থেকেই when I was going হয়ে যায় (এমনকি আমি যখন এটা টাইপ করছিলাম, ভুলটা “বহুকষ্টে” কয়েকবারের চেষ্টায় করতে পেরেছি!)। এমনকি এখন অভ্র’র নতুন ভার্সানগুলোতে অধিকাংশ বাংলা শব্দেরই অটোকারেক্ট অপশন আছে।
তো, এটা কেন বা কীভাবে হয়?
কারণ আপনার মোবাইল বা কম্পিউটরের মেমোরিতে সঠিক শব্দগুলি “দেয়া আছে” এবং কম্পিউটর সেই শব্দ – বিশেষ করে টাইপিং এরর বা মিস-স্পেলড শব্দগুলিকে সাথে সাথেই চিনে নিয়ে নিজেই “মাতবরি” করে ঠিক করে দেয়।
আমাদের মস্তিষ্ক ঠিক এভাবেই কাজ করে (আফটার অল, মস্তিষ্ককে দেখেই তো বৈজ্ঞানিকরা এই অটোকারেক্ট ফিচারটা বানিয়েছেন!) । তবে কম্পিউটরের কাজ দেখে আপনি হয়ত অবাক হন, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক তার চেয়ে অনেক অনেক (কয়েক হাজারগুণ বেশি) স্মার্ট ও দক্ষ। কারণ কম্পিউটরের মেমোরিতে কতটি আর শব্দ বা কত এমবি বা জিবি ডাটা আছে! মস্তিষ্কেরটা প্রায় আনলিমিটেড! এবং আশ্চর্যের বিষয় হল, আমাদের মস্তিষ্কের এই “সফটওয়্যারটা” জন্মের সময়েই “অটো-ইন্সটল” হয়ে গেছে! তাই এমনকি অনেক অনেক বছর আগের শোনা শব্দটিও আপনার ব্রেনে সযত্নে রক্ষিত আছে এবং কাজের সময় মস্তিষ্ক ঠিক সেই শব্দটাই আপনার চোখের সামনে নিয়ে আসছে।
এখন আসছি মস্তিষ্ক এটা কীভাবে করে বা এত সহজেই করে যে, এমনকি আপনি বিন্দুমাত্র না ভেবেই ভুল শব্দগুলোকে সঠিকভাবে পড়তে পারছেন।
বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, মানুষ (বা মানুষের মস্তিষ্ক) একটি একটি করে অক্ষর পড়ে না। অধিকাংশ পাঠকই পুরো শব্দটাকে একত্রে পড়েন বা চেনার চেষ্টা করেন। এবং এটা মূলত করে প্রথম ও শেষ অক্ষরটা দেখে। কিন্তু সাধারণত প্রথম অক্ষর ও ওই শব্দের বাকি অক্ষরগুলি থাকলেও মস্তিষ্ক শব্দটিকে চিনে ফেলে! প্রথম ও শেষ বা প্রথম ও অন্যান্য অক্ষরগুলির পাশাপাশি মস্তিষ্ক শব্দটির দৈর্ঘ, আকার, কী কী অক্ষর আছে, পুরো বাক্যের সাথে শব্দটির সঙ্গতি এসবও দেখে। আর আমাদের মস্তিষ্কের প্রসেসিং স্পিড কত? সেটা বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সুপার-কম্পিউটরের চেয়েও বেশি!
মস্তিষ্কের প্রায় দশ/বারোটি অংশ এই কাজে যুক্ত থাকে এবং সেটি অধিকাংশের জন্যই বাম অঞ্চল (লেফট হেমিস্ফিয়ার) এ ঘটে থাকে। তাই অতিমাত্রায় বুদ্ধিমান বা আই কিউ সম্পন্ন মানুষদের অনেক সময় “লেফট ব্রেইন থিঙ্কার” বা বাম মস্তিষ্কের চিন্তাধারীও বলা হয়ে থাকে।
আপনার মস্তিষ্কে যদি শব্দটি না থাকে অর্থাৎ আপনি যদি সেই শব্দটি আগে কখনোই না পড়ে বা শুনে থাকেন, তাহলে কিন্তু এই ফলটি পাবেন না। উদাহরণ তৈরির জন্য আমি উপরের লেখাটায় কিছু শব্দ ইচ্ছে করেই একটু কঠিন দিয়েছি, যে মূল শব্দটা হয়তো আপনার অজানা, তাই ইংরেজিটা পড়তে গিয়ে কিছু জায়গায় হোঁচট খেয়ে থাকতে পারেন। spell bounded, ও meadow, যেগুলো আমি নিচে অন্য দুটি একই ধরণের অর্থের শব্দ দিয়ে পালটে দিয়েছি। তাই এবার আরেকবার পড়ে দেখুন, আর “হোঁচট” খাবেন না !
“One day whne I wsa wakling thoruhg a felid, I swa a huge masnoin ovre the grssay flied. I wsa supreisd thniknig, who lvies theer? Cuiruosly I ketp gonig. Bedise the lagre iron gate a yonug man was stnadnig wiht a rilfe in his hadn. I alsomt fanited theer.”

ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন, আর হ্যাঁ, বানান ভুল করবেন না।

Badrul Millat

মনের আনন্দের জন্যই লেখালেখি করেন। সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন চাকুরির সুবাদে দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে যেমন ঘুরে বেড়িয়েছেন, পৃথিবীর ত্রিশটি দেশেও ঘুরেছেন। বিশেষ করে জাতিসংঘ, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে ও বিদেশে নানা ধরণের ঘটনা ও মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন, যা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলোই হয়তো তার গল্পে বিষয়বস্তু বা চরিত্র হয়ে উঠে আসে। এযাবৎ তার আঠারোটি একক ও তিনটি যৌথ গল্প সংকলন বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উপন্যাস, ছোটগল্প সংকলন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক (গল্প সংকলন ও উপন্যাস), জাতিসংঘের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণকাহিনী, লেখালখি শেখার সহায়িকা, শিশুতোষ ও ছয়টি অনুবাদ রয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি তার নিজ বাড়িতে “নহলী” নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন, যেটার মাধ্যমে নবীন লেখকদের উৎসাহ যোগাতে তাদের বই বিনামূল্যে ছাপিয়ে থাকেন (২০১৯ বইমেলায় এমন দশ জন এবং ২০২০ সালে সাতজন লেখক/কবির বই প্রকাশিত হয়েছে)। সকলের জন্য উন্মুক্ত নহলীর লাইব্রেরিতে ছয় সহস্রাধিক বই রয়েছে। এছাড়া তিনি নিয়মিতভাবে লেখালেখি ও সম্পাদনার কাজ হাতে-কলমে অনলাইন ও নহলীতে শিখিয়ে থাকেন। ইমেইল: badrulmillat@noholi.com ফেসবুক: www.facebook.com/badrul.millat.9 নহলী ফেসবুক গ্রুপ: https://www.facebook.com/groups/noholi/ নিজস্ব লেখালেখির পেজ: বদরুল মিল্লাতের লেখালেখি facebook.com/BadrulMillat.Author/ নহলী ওয়েবসাইট: www. noholi.com

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close