ফিকশন

বই খাদক


১.
ড্রয়িং রুমের দেয়াল ঘড়িটা বেজে ওঠলো ঢং ঢং শব্দে। চারিদিকে নিস্তব্ধ নীরবতার কারণে দোতলায় ড্রয়িং রুমের ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমার রুমে থেকেও। ড্রিম লাইটের গাঢ় লাল আলোয় আমি আমার রুমে টিকটিক করে দেয়ালে ঝুলতে থাকা ঘড়িটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি এখন রাত তিনটা বাজে।

মেয়েটাকে এবার ঘুমু থেকে জাগানো দরকার। অনেক তো ঘুমুলো। আর কতো? আসলে ও ঘুমোচ্ছে না। সেন্সলেস হয়ে আছে। আমি ওকে জাগাইনি সেন্সলেস হয়ে যাওয়ার পরে। আমি ইজি চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে গাঢ় লাল আলোয় তাকিয়ে আছি ওর নিষ্পাপ মুখটার দিকে। ওর সম্পূর্ণ নগ্ন শরীর ড্রিম লাইটের গাঢ় লাল আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে। কপালে ছোট্ট একটা ব্যান্ডেজ বাঁধা আঘাতের কারণে। যদিও কেউ এতো গাঢ় লাল আলোয় হঠাৎ ওর দিকে তাকালে বুঝতে পারবে না ও সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় বসে আছে। গাঢ় লাল ড্রিম লাইটের আলো ওরে শরীরে তীর্যকভাবে থাকায় বিশেষ বিশেষ অংশগুলো ফুটে উঠেছে। কেউ অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলে বুঝতে পারবে ও সম্পূর্ণ নগ্ন। সে দিকে আমার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই ও নগ্ন শরীরে আছে বলে। থাকার কথাও নয়।

এবার মেয়েটা হঠাৎ জেগে উঠলো ধড়ফড় করে। কারণ ওর কানের ভেতর কাঠি দিয়ে সুড়সুড়ি দিতে দিতে একটা গুতো দিয়ে দিয়েছি জোরে। সে জন্য ধরফর করে সেন্স ফিরে আসে। কিন্তু ওর সাথে এবং আশেপাশে কি হচ্ছে একটু হলেও সময় দরকার সেটা বুঝার জন্য। কারণ ওর কপালে প্রচন্ড আঘাত লেগেছে। ওর মুখ থেকে ব্যাথায় কুকিয়ে ওঠার শব্দ বের হচ্ছে। কুকিয়ে কুকিয়ে ও আশেপাশে এদিক ওদিক তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করছে। কিন্তু মনে হচ্ছে না কিছু বুঝতে পারছে। আমি ঠিক ওর আড়ালে একটু পাশের দিকে দাঁড়িয়ে। ও ঘাড় ঘুড়িয়ে না তাকালে দেখতে পাবে না আমাকে। আর গাঢ় লাল আলোয় হঠাৎ করে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারাটাও সময় সাপেক্ষের ব্যাপার।

আমার হাতে থাকা ফুটন্ত পানির বোতলটা মেয়েটার বাম কানের পাশে ধরে আমি হুট করে কানের ভেতরে গরম পানির দীর্ঘ লম্বা একটা স্প্রে টেনে দিতেই ও হকচকিয়ে লাফিয়ে উঠলো গরম পানির উত্তাপে। ও মাথা দুপাশে ঝাঁকাতে শুরু করে তারপর আবার বাম দিকে মাথা কাত করে কাঁধের উপর ঝাঁকাতে থাকে ফুটন্ত গরম পানির উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে। ওর মুখ থেকে গোঙ্গানোর শব্দ বের হচ্ছে। কারণ আমি স্কচটেপ এঁটে দিয়েছি ওর মুখে। ওর মাথা ঝাঁকানো দেখে আমি মুচকি হেঁসে, টুক টুক করে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে সামনে থাকা ইজি চেয়ারটায় বসে, পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে, ঘাড় ডান দিকে কাত করে, বাম পাশের অধরে দাঁত দিয়ে একটা কামুড় বসিয়ে, চোখের ভ্রু দুটো কপালের উপরে তুলে নাচিয়ে নাচিয়ে মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে দিলাম প্রশ্ন ছুঁড়ে,
-” তারপর বল, নিজেকে এমন অবস্থায় দেখে কেমন অনুভব করছিস ৯৯ সেকেন্ডের বড় আপু? “

মেয়েটা ভূত দেখার মতো আমার দিকে বড় বড় করে তাকিয়ে আছে বিস্ফোরিত চোখে। ও বসা অবস্থায়ই পরখ করে নিলো নিজেই একবার নিজের দিকে তাকিয়ে। ও সম্পূর্ণ নগ্ন। হাত দুটো চেয়ারের হাতায় আর পা দুটো চেয়ারের পায়ার সাথে বাঁধা ফ্লোর থেকে একটু উঁচু করে। যেন পায়ের উপর ভর দিয়ে চলাফেরা করতে না পারে। নগ্ন থাকায় বেশ খানিক লজ্জাও পেয়েছে। থাকুক নগ্ন হয়ে। তাতে আমার কি? এখন লজ্জা পাচ্ছে কেন? লজ্জা পাওয়ার আগে ভাবা উচিত ছিলো। যেন কখনো কিছু করার পর তার ফলাফল স্বরূপ অস্বস্তিকর লজ্জায় পরতে না হয়। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না?
“ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না। “
ওর হয়েছে উল্টো দশা! আগে ভুল কাজ করে বেচারি এখন ভাবছে হয়তো। কিন্তু এখন ভেবে লাভ কি?

আমি ভাবছি অন্য কথা। মেয়েটাকে আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম আমি,
-” তুই আমার সাথে এমন করলি কেন? কি করেছি আমি তোর? আমি তো তোর কোন ক্ষতি করিনি। তুই আমার সাথে এমনটা না করলেও পারতি। তাহলে তুই কেন শুধু শুধু আমার সাথে এমন করলি? কেন? বল কেন? “

ও আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দিচ্ছে না। আগুন চোখে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই আমাকে কাঁচা গিলে ফেলবে। রুমে এখন পিন পতন নীরবতা বিরাজ করছে।

২.
পড়ন্ত বিকেল। গ্রীষ্মের প্রহরে দুপুরের জলন্ত রোদের উত্তাপ শেষে পশ্চিমাকাশে সূর্যটা লাল হয়ে ঢলে পড়ছে। এই অসময়ও সুকণ্ঠী বিহঙ্গ কুহু ডেকে প্রেমের বসন্তে আহ্বান জানাচ্ছে।

বারান্দায় খোলা হাওয়ার ইজি চেয়ারে বসে মনের সুখে মৃদু লাল রোদ মাখছি গ্রিলে পা দু’টো তুলে দিয়ে। ” নীল বসন্ত ” উপন্যাসের বইটি হাতে।

কিন্তু হুট করেই বইটা বন্ধ হয়ে গেলো। নাকের মাঝ বরাবর আঙ্গুল ঠ্যালে চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে বসাতে বসাতে চোখ তুলে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখি মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে তেলে বেগুনে জ্বলে আগুন চোখে। আমি সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আবার বই খুলে খুঁজতে লাগলাম কোন পর্যন্ত বইটা পড়া হয়েছে। কিন্তু আমি বই খুলে পড়া শুরু করতেই মেয়েটা আবার বইটা বন্ধ করে দিলো। আমি আবারও পড়তে শুরু করলাম বই খুলে পৃষ্ঠা নং ৯৯।
এবার হুট করেই মেয়েটা বইটি চিলের মতো ছুঁ মেরে টেনে দিয়ে নিলো আমার হাত থেকে। আমি মেয়েটার দিকে বোকার মতো ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকালাম ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে। কিন্তু ঘটনা চক্র কিছুই বুঝতে পারছি না। মেয়েটা কেন এতো রেগে আছে?

আমি বাম হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুল দিয়ে অধরে ছোট্ট ছোট্ট আচড় কেটে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে আরো মনোযোগের সাথে তাকালাম কারণ ও কিছু বলতে চাচ্ছে। কিন্তু কিছু বলছে না। ভ্রু কুঁচকে চোখ দুটো ছোট ছোট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে আমাকে চোখ দিয়েই গিলে খেয়ে ফেলবে।

আমি একটা হাই তুলতেই মেয়েটা ধাম করে বই দিয়ে সজোড়ে আমার মাথায় একটা বাড়ি দিয়ে বসলো। –
-” আউচ ওওওও! “
আমি এমন আকষ্মিক আঘাতের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।

মেয়েটা ফুঁসতে ফুঁসতে চেঁচিয়ে উঠে বললো,
-” হারামি! তোকে আমি সেই কখন চা দিয়ে গিয়েছি! তুই খেলি না কেন? কিছুক্ষণ পর তো বলতি আপু চা টা একটু গরম করে দে না। “
-” চায়ের কাপে চুমু দিয়ে চা চুমুক দিয়ে গিলে। “
-” একদম জ্ঞান দিবি না! “
কথাটা বলেই মেয়েটা হাত থেকে বইটি ফ্লোরে আছাড় দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

আমি চট করে টি-টেবিল থেকে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা টা নিয়ে একবারে মুখে পুরে দিয়ে পুরো চা গিলে নিয়ে ইজি চেয়ার থেকে নেমে বইটি ফ্লোর থেকে তুলে ঠিকঠাক করে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে বারান্দা থেকে বের হতে হতে বললাম,
-” ওগো, বই যে আমার…
ওগো, বই যে আমার…
ওগো, বই যে আমার…
ওগোওওওও, বই যে আমাররররররর… “

ও আরদ্রা আমার বড় বোন। ও আমার খুব বেশি বড় নয়। মাত্র ৯৯ সেকেন্ডের বড় জমজ বোন। আরদ্রা খুব সুন্দরী, মর্ডান, স্মার্ট একটি মেয়ে। সবসময় সোশাল মিডিয়া, মডেলিং, রূপচর্চা নিয়ে থাকে। রান্না করতে পছন্দ করে না আগুনের তাপে স্কিন নষ্ট হয়ে যাবে বলে।

বই পড়ায় এতোটাই মশগুল ছিলাম কখন যে আরদ্রা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা বুঝতেই পারিনি। এতোক্ষণে আসল ঘটনাটা উদ্ধার করতে পেরেছি আমি। আরদ্রা আমাকে আধা ঘণ্টা আগে এক কাপ চা দিয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রতিদিন বিকেলে এক কাপ চা আমার চাই-ই চাই। কিন্তু আজ ঘটলো উল্টো ঘটনা। আমি চা করতে যাওয়ার আগেই আরদ্রা নিজেই চা করে দিয়ে গেলো। আর আমি কখনোই ওকে চা করে দিতে বা চা গরম করে দিতে বলি না। কারণ আরদ্রা চা করতে পারে না। শুধু চা কেন ও জীবনেও রান্না ঘরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখে না কখনো। বাসার তো আর কেউ নেই যে অন্য কেউ চা করে দিবে। কারণ মা- বাবা দুজনই সুইজারল্যান্ড গেছেন অফিসের একটা প্রজেক্টের প্রডাক্ট ফাইনাল করতে। কাজের মেয়েটাও বাসায় নেই ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি গেছে। কারণ মেয়েটার ছোট ভাইটা নাকি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে।

আরদ্রা চা তো করেছে। কিন্তু কয়েক চামচ চাপাতি আর তিন থেকে চার চামচ চিনি দিয়েছে এক কাপ চায়ে। চা তো নয় যেন পানিতে ফুটিয়ে নেওয়া কষে চিনির লাবড়া! কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যাপার! আরদ্রা চা করেছে আমার জন্য? সত্যি? কিন্তু কেন? কারণটা কি বিশেষ কোন কিছু? কারণ আরদ্রা কোন উদ্দেশ্য ছাড়া কখনো কিছু করে না। কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে মেয়েটার?

৩.
সন্ধ্যায় বিছানায় অর্ধশুয়ে বুকের উপর বালিশ রেখে বই বালিশে দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে ডান পা শূন্যে দিয়ে কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে বইয়ের পাতায় কালো হরফের লেখা গুলো পড়ে পড়ে ক্রমাগত গিলছি। কিন্তু হুট করেই প্রচন্ড জোড়ে আঘাত করলো কিছু একটা কপালে এসে। ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলাম আমি।

স্নায়ুর ভেতর দিয়ে সংবহনকৃত কষ্টদায়ক অনুভূতিগুলো যখন আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছায় তখন তাকে আমরা ব্যাথা বলি। আমাদের ব্রেইন ও হাড়ের আবরণ তার চারপাশের রক্তনালি এবং নার্ভের ( স্নায়ুর ) আবরণ রয়েছে। স্নায়ুর মাধ্যমে আমরা ব্যাথা অনুভব করি। ব্যাথা হচ্ছে এক ধরনের সংকেত যা আমাদের শরীরে অবস্থিত কিছু নোসিসপ্টর ( nociceptor ) নামক স্নায়ু দ্বারা প্রবাহিত হয়ে আমাদের মস্তিষ্ককে আলোড়িত করে এবং ব্যাথার অনুভূতির জন্ম দেয়। ব্যাথার মূলে দায়ী এসব নোসিসপ্টর স্নায়ুর। ল্যাটিন শব্দ nocer ( নসার ) মানে হল ” আঘাত করা “। অর্থাৎ আঘাতের মাধ্যমে শরীরের কোন টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে নোসিসপ্টর স্নায়ুগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সাথে সাথে নোসিসপ্টর স্নায়ুগুলো সংকেতের মাধ্যমে ব্রেনকে রিপোর্ট করে, ফলে ঐ ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যগুলো থেকে কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয়। নোসিসপ্টর গুলো সাধারণ আমাদের ত্বক, সন্ধি, হাড় এবং ভিসেরিয়াতে থাকে। ভিসেরিয়ার অনেক প্রকারভেদ আছে। ভিসেরিয়ারকে একত্রে পেইন নোসিসপ্টর বলা হয়। মূলত ভিসেরিয়াকে ব্যাথার মূল কারণ বলে ধরা হয়। যার ফলে অটোম্যাটিকেলি কপালের আঘাত পাওয়া জায়গাটায় আমার হাত পৌঁছে যায়।

চোখে রীতিমতো শর্ষে ফুল দেখছি আমি। হঠাৎ মাথায় আঘাত লাগলে, অন্য ক্ষতি না হলেও চোখে আমরা অনেক সময় চোখে শর্ষে ফুল দেখি। চোখের ভেতর, চোখের মণির পেছনের অংশে ভিট্রিয়াস জেল নামের স্বচ্ছ, রংবিহীন জেলির মতো ঘন বস্তু থাকে। এই ভিট্রিয়াস চোখের রেটিনার সঙ্গে লেগে থাকে। রেটিনার কাজ হলো, আমরা চোখে যা দেখি, তার সংকেত মস্তিষ্কে পাঠানো। চোখের মণির (লেন্স) মধ্য দিয়ে বাইরের দৃশ্যের রং, উজ্জ্বলতা প্রভৃতি সম্পর্কে তথ্য বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে রেটিনা থেকে মস্তিষ্কে যায়। তখনই আমরা সেই দৃশ্য দেখি। মাথায় আঘাত পেলে দেখার এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। আঘাতের ফলে ভিট্রিয়াস জেলসহ রেটিনা ঝাঁকুনি খায়। এর ফলে এক ধরনের উল্টাপাল্টা সংকেত যায় মস্তিষ্কে। আর এ কারণেই আমরা চোখে শর্ষে ফুল দেখি কথাটা বলে থাকি । ভিট্রিয়াস যখন রেটিনায় আঘাত করে, তখন তা সামান্য কুঞ্চিত হয়। এর ফলে দেখার কাজে বাধা সৃষ্টি হয় বটে, কিন্তু কোনো ব্যথা লাগে না, কারণ রেটিনায় ব্যথা অনুভবের কোনো তন্তু নেই। আঘাতের কারণে মাথায় ব্যাথা লাগে, কিন্তু চোখের ভেতরে যে ওলটপালট হয়, তার অনুভূতির প্রকাশ ঘটে ওই চোখে শর্ষে ফুল দেখার মাধ্যমে।

#বই_খাদক ( ২য়-অংশ )
-নীলাদ্রি মেহেজাবীন নীল

হাতের আঙ্গুলে গড়িয়ে পড়া কিছু উষ্ণ তরল পদার্থের আভাস পাচ্ছি আমি। চোখের সামনে হাত মেলে ধরতেই দেখি আঙ্গুলগুলো হিমোগ্লোবিনের লাল রং এ সুসজ্জিত হয়ে গেছে। চোখের চমশাটা খুলে গিয়ে বাম কানের চিপ আর ডান পাশের কানের আগায় ঝুলে চিবুকের সাথে লেগে আছে। ঘটনা কি বুঝার জন্য মাথা তুলে এদিক ওদিক তাকিয়ে বেড রুমের দরজার দিকে চোখ পড়তেই দেখি আরদ্রা অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে খুব ক্ষেপে আছে আমার উপর। ওর ঠোঁট দুটো ক্রমাগত নড়ছে। ও কিছু একটা বলছে আমাকে। একটু পর থেমে আবারো কিছু একটা বললো। আমি ঢ্যাবঢ্যাব করে ওর ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছি। ওর ঠোঁট জোড়া আবারো নড়ে ওঠলো। এবার আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার দু’হাতে দু’পাশের কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলতেই আরদ্রা রাগে ফসফস করতে করতে নিজের পা দিয়ে ফ্লোরে সজোরে একটা লাথি দিয়ে দরজার লকে সজোরে একটা টান দিয়ে রুম থেকেই বেরিয়ে গেলো। ও চলে যেতেই দরজাটা কানে তালা লাগানোর মতো প্রচন্ড জোড়ে একটা বাড়ি গেলো দরজার চৌকাঠে।

আমার কপাল থেকে চোখের ভ্রু, চিপ গাল বেয়ে হিমোগ্লোবিনের উষ্ণ তরল লাল রং গড়িয়ে গড়িয়ে ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। বিছানার বাম পাশেই পরে আছে মাঝামাঝি আকারের ভারী মাল্টি কালারের কম্বিনেশনের ফুলদানিটা। আমি বুকের উপর থেকে বালিশটা সরিয়ে, বিছানা থেকে নেমে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফাস্ট এইড বক্স বের করে ব্যান্ডেজ করে নিলাম নিজের কপালে।

ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই দেখি ১১টা বাজে। রাতের খাবার খাওয়া হয়নি এখনও। ওহ্ আচ্ছা! নিশ্চয়ই আরদ্রার ক্ষিধে পেয়েছে। সে জন্যই আমার রুমে এসেছিলো খাবার চাইতে। কিন্তু আমি গান শুনছিলাম ফুল ভলিয়ম দিয়ে। কানে হেডফোন থাকায় ওর কোন কথাই শুনতে পাইনি বলে রাগে ফুলদানী ছুঁড়ে মেরে আমার কপাল ফাটিয়ে দিয়ে গেছে।

আমি রান্না ঘরে খাবার গুলো গরম করতে দিয়ে বই পড়ছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে । খাবারগুলো গরম হতেই ডাইনিং টেবিলে খাবারগুলো নিয়ে আরদ্রাকে খেতে দিয়ে আমিও বসে পড়লাম খাবার গিলতে। আমি বই পড়ছি আর টুকটুক করে মুরগির বাচ্চার মতো ছোট ছোট করে ভাতের দানাগুলোর লোকমা গিলছি। কিন্তু হুট করেই আরদ্রা খাবার টেবিল ছেড়ে ওঠে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমি কিছু বুঝতে পারার আগেই টেবিল থেকে বইটা দিয়েই একটানে দু’টুকরো করে ফেললো। একটা অংশ ফ্লোর ফেলে পা দিয়ে পিষতে পিষতে বললো,
– ” এতো বই পড়া লাগে কেন তোর? হ্যাঁ? খাওয়ার সময়ও বই লাগে তোর না? নে এবার পড়! আমিও দেখি তুই কিভাবে বই পড়িস? “
বইয়ের আরেকটা ছেড়া অংশের পৃষ্টা গুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে দিলো উপরের দিকে। শূন্য ভাসতে থাকা বইয়ের ছেঁড়া টুকরো গুলো মাটিতে স্থীর হয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে দুলতে দুলতে। বইয়ের ছেঁড়া টুকরো গুলো দিকে তাকিয়ে আমিই বলে ফেলি,
-” ভোমরা কইয়ো গিয়া
পুস্তকের বিচ্ছেদের অনলে
ও মোর অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে
ভোমরা কইয়ো গিয়া… “

হুট করেই চেয়ার ছেড়ে আমিও ওঠে দাঁড়িয়ে খপ করে ডান হাতে খুব শক্ত করে আরদ্রার গলায় চেপে ধরে এগিয়ে যেতে থাকি সামনের দিকে আর পেছনে যেতে থাকে আরদ্রা। আমিও যে ওকে পাল্টা আক্রমণ করতে পারি সেটা হয়তো ও কল্পনায় কেন দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। পেছাতে পেছাতে ওর পিঠ দেয়ালে গিয়ে ঠ্যাকলে দেয়ালের সাথে ঠ্যাসে দুহাতে আরো শক্ত করে চেপে ধরি ওর গলা। আরদ্রা ওর দুহাত দিয়ে আমার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। ও ঠিক মতো শ্বাস-প্রশ্বাসও নিতে পারছে না। হাসফাস করছে আর হাত দিয়ে আমার হাতে মুখে খামচি কেটে আমাকে আঘাত করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছে। যখন ওর প্রাণ পাখিটা চলে যাবে ঠিক তার আগেই আমি ওর গলা থেকে হাত সরিয়ে ওকে শ্বাস নিতে দিই। ও সুযোগ পেয়েই একটা লম্বা শ্বাস টেনে নেয় সেই ফাঁকে। মনে হলো কতো জন্ম পর যেন প্রাণ ভরে শ্বাস নিচ্ছে। ও খক খক করে কাশতে শুরু করেছে। ওকে কাশতে দেওয়ার সময়ও না দিয়ে আমি আবার ওর চুলের মুঠি ধরে সজোরে দেয়ালে কপাল ঠুকে দিলাম কয়েক দফা। ও সেন্সলেস হয়ে গেলো একই জায়গায় একনাগাড়ে মাত্র সাতটা বাড়ি লাগতেই। ও আমার হাতের উপরই এসে পড়ে সেন্সলেস হয়ে।

আমি ওকে টেনে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিই। ও কাত হয়ে চেয়ারের এক পাশে হেলে আছে। ওর কপাল ফেটে গাল চিবুক বেয়ে বেয়ে হিমোগ্লোবিনের লাল রং গড়িয়ে টপ টপ করে পড়ছে। আমি ওর চিবুকের নিচে আমার ডান হাতটা পেতে ধরি। এবার আমার হাতের তালুতে লাল রঙের ফোটা গুলো আস্তে আস্তে জড়ো হতে থাকে। বেশ খানিক কয়েক ফোটা জমতেই আমি উষ্ণ হিমোগ্লোবিনের লাল রং আমার ডান গালে মেখে নিলাম পরম আদরে। আহা! এর থেকে পরম আদরের কোন কিছু হয় নাকি!

৪.
ইজি চেয়ার থেকে আচমকা ওঠে এসে গায়ের শক্তি এক করে প্রচন্ড জোরে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় বসালাম মেয়েটার গালে। কিন্তু ব্যাথাটা কার বেশি লাগলো বুঝতে পারছি না আমি। কারণ মেয়েটাকে থাপ্পড় দেওয়ার সাথে সাথে আমার হাতের ভেতর কেমন যেন জ্বলে চিন চিন করছে। এমনটা অনুভব হয় যখন শরীরের কোন অংশে জোরে আঘাত লাগার কারণে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ধুর! আজ আমার ব্যাথা লাগলে চলবে না। উনিশ বছরের হিসেব আজ সুদে-আসলে উসুল করতে হবে তো! সে অনেক লম্বা হিসেব।

আলমারি খুলে নিচের বড় ড্রয়ার থেকে হকি স্টিকটা নিয়ে মেয়েটার হাঁটুতে পাগলের মতো কয়েকটা উড়া ধুরা বাড়ি দিলাম ইচ্ছে মতো সজোরে। ও ব্যাথায় কুকিয়ে গোংরাতে থাকে। চোখ দুটো বড় বড় করে জোরে জোরে শ্বাস টেনে উঁওও ওঁওওও শব্দ করে করে চেয়ারে বসেই তিড়িংবিড়িং করে নড়ছে আর মাথা সামনে পেছনে দুলাচ্ছে। চোখ দিয়ে টপ টপ করে নোনা জলগুলো গাল বেয়ে চিবুকের নিচে এসে জমছে। ওর হাঁটু থেকে লাল রং গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। লাল ড্রিম লাইটের আলোয় হিমোগ্লোবিনের স্রোত কালো দেখাচ্ছে। হাড়গুলো যে ভেঙ্গেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাড়ি দেওয়ার সময় শব্দ হয়েছে কট কট করে।

আমি আমার ঠোঁট দুটো পাউট করে শূন্যে একটা উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে দিয়ে হকি স্টিকের মাথাটা মুখের সামনে মাইকের মতো করে ধরে একটা বড়সড় হাই তুলে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করি,
-” আপু, পায়ের হাঁটুর হাড় তো ভেঙ্গে দিয়েছি! এখন কেমন অনুভব করছিস বল? “

ড্রেসিং টেবিলের বাম পাশের ড্রয়ারের লক খুলে ব্যাগটা এক ঝটকায় বের করে ব্যাগের চেইন টেনে সব জিনিসপত্র উপুড় করে দিলাম ফ্লোরে ঢেলে। স্টিলের আসবাবপত্র গুলো ফ্লোরে পড়ে কোনটা টুংটাং আবার কোনটা মৃদু ঝনঝন শব্দ হতে থাকে। তার মধ্যে থেকে আমি তড়িঘড়ি করে খুঁজে নিপ্পারটা হাতে তুলে নিয়ে খুবই ব্যাস্ত হয়ে পড়ি মেয়েটার একটা একটা করে আঙ্গুলের নখগুলো টেনে টেনে উপড়ে ফেলতে। নখ উপড়ে ফেলা শেষে জাতার মাঝে ফেলে আঙ্গুল গুলোতে সজোরে চাপ দিতে থাকি খুব দ্রুত বেগে। একটা একটা করে মেয়েটার আঙ্গুলের অর্ধেক অংশের টুকরো গুলো নিচে পড়ছে তার সাথে লাল রং ফোটায় ফোটায় টপ টপ করে ফ্লোরে পড়ছে। মেয়েটা চেয়ারে অনেক নড়াচড়া করছে আর গোঙ্গানি দিয়ে মাথা বামে ডানে নেড়ে ইশারায় আমাকে না করছে যেন ওর হাতের আঙুল গুলো না কাটি। কিন্তু আমি তো আজ কোন কথা শুনবো না কোন বাঁধাও মানবো না। একটা হাতের আঙুল কাটা শেষ করে অন্য হাতের তর্জনী আঙ্গুল কেটে দিতেই মেয়েটা জোরে ওঁওওও শব্দ করেই সেন্সলেস হয়ে গেছে। এবাব্বাহ্! এই মেয়ে তো দেখছি একটুতেই সেন্সলেস হয়ে পড়ে। এটা কোন কিছু হলো? ধুর! আমি তো এখনও কিছুই করিনি। মেয়েটার হাত যতো দ্রুত সম্ভব ততো দ্রুত ব্যান্ডেজ করে দিই আমার খেয়াল হতেই। নাহলে শরীরে থেকে সব লাল রং ঝরে পড়ে গিয়ে আগেই যদি মরে যায় তাহলে তো চলবে না আমার। ওর হাতের বাকি তিনটা আঙুল কুট কুট করে কেটে টুকরো গুলো তুলে নিয়ে রাখি রান্না ঘরে। ভিনেগারে ভিজিয়ে রাখি চামড়া ছিলে আঙ্গুলের মাংসগুলো নরম হতে।

কানে মৃদু কুঁইকুঁই শব্দ ভেসে আসছে। কোথা থেকে আসছে বুঝতে পারছি না। এই! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো কোন? নাহ্! একটু পর শব্দটা কানে আরো বেশি এসে লাগছে। চোখের পাতা দুটো জোর করে টেনে খুলে তাকাতেই দেখি ঝাপসা লম্বা চিকন চিকন কিছু একটা। আরেকটু ভালো করে তাকাতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কতোগুলো খাড়া খাড়া গ্রিল। আমি আশেপাশে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছি আস্তে করে শোয়া থেকে ওঠে বসে। এতোক্ষণ শুয়ে ছিলাম বারান্দার ফ্লোরে বসে অর্ধেক উপুড় হয়ে। পায়ের কাছে একটা মগ পরে আছে। ওহ্ আচ্ছা! বুঝতেই পারিনি কখন যে ফ্লোরে বসে ঘুমু করে বসেছি ভোরের দিকে সূর্যদয় দেখবো বলে বারান্দায় এসেছিলাম হাতে এক কাপ কফি গিলতে গিলতে। কিন্তু এখন ভোর থেকে সকাল হচ্ছে নাকি বিকেল থেকে সন্ধ্যা হচ্ছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না। মাথাটা ভারী লাগছে। কিন্তু কুঁইকুঁই শব্দটা আসছে কোথা থেকে? বসা থেকে ওঠে দাঁড়িয়ে বারান্দা থেকে রুমে ঢুকেতেই দেখি ফ্লোরের কিছুটা অংশ কালচে হয়ে আছে। আশেপাশে সার্জারী করার কিছু জিনিসপত্র এদিক ওদিক পড়ে আছে। আরো কয়েক পা এগিয়ে যেতেই দেখি গুচ্ছ গুচ্ছ চুল এলোমেলো হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় পড়ে আছে। কারণ রাতে ওর মাথার বব কাটিং সব চুল ব্লেজার দিয়ে ফেলে দিয়েছি ছিলে। এবার মেয়েটার দিকে নজর পরতেই দেখি সে হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে। মুখে স্কচটেপ এঁটে থাকার কারণে ব্যাথার সাথে গোঙ্গানি কান্না একসাথে মিলে কুঁইকুঁই শব্দ হচ্ছে। কুঁইকুঁই শব্দের উৎসটা আবিষ্কার করতে পারলাম এতোক্ষণে। কাঁদবে না আবার? বুঝুক হাড় ভাঙ্গার যন্ত্রণায় কেমন লাগে। কারণ আমি তো জানি কতোটা যন্ত্রণা হয় শরীরের কোন হাড় ভেঙ্গে গেলে। এক্সপেরিয়েন্স আছে তো!

খুব ক্ষিদে পেয়েছে আমার। মনে হচ্ছে পেটে ছুঁচো দৌঁড়াচ্ছে। পেটের দুর্ভিক্ষ কাটাতে কিছু গিলতে হবে আগে। ফ্রিজ খুলতেই আইসক্রিম আর চকোলেট গুলো আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে ঢ্যাবঢ্যাব করে। যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে অভিমানী সুরে বলছে,
-” আমাদের কেউ দেখে না, কেউ ভালোবাসে না, কেউ খায়ও না। “
আহারে কতো অভিমান। না জানি ওরা কবে থেকে এভাবে ফ্রিজের ভেতর ঠান্ডা হয়ে জমে পরে আছে। আমি একটা আইসক্রিমের বক্স আর একটা বড় চকোলেটের বক্স তুলে নিলাম দু’হাতে দু’টো। ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছন থেকেই পা দিয়ে একটা ঠুসা দিয়ে ফ্রিজ বন্ধ করে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে একটা চামচ চিলের মতো ছুঁ মেরে নিয়ে গপাগপ আইসক্রিম গিলতে শুধু করলাম ছোট ছোট টুকরোর মতো করে তুলে। দুটো বড় বড় ডেইলি মিল্ক সিল্ক চকোলেটও খেলাম চিবিয়ে চেটেপুটে। খাওয়া শেষে মনে পড়লো আমার। আরে! মেয়েটাও তো না খেয়ে আছে ওকেও ভালো করে খাবার গিলাতে হবে।

জুসের বোতল হাতে আমি এখন মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি মুচকি হেঁসে। বোতলটা মেয়েটার মুখের সামনে ধরে বললাম নে চটপট স্পেশাল জুসটা গিলে ফেল। মেয়েটা কেমন যেন করুণ চোখে তাকালো আমার দিকে। আমি বললাম,
-” চিৎকার চেঁচামিচি করবি না। আমিই তোকে গিলিয়ে
দিচ্ছি । “
কথাটা বলেই আমি ওর মুখের উপর থেকে স্কচটেপটা একটানে তুলে জুসের বোতলটা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নাক চেপে ধরি মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে। যেন বাধ্য মেয়ের মতো জুসটা গিলে ফেলে। ২০-৩০ সেকেন্ড নাক চেপে ধরায় আর ওর পিপাসা আর ক্ষিধায় না পেরে জুসটা গিলেও নেয় কিছুটা। আমি ওর নাক থেকে হাত সরিয়ে শ্বাস নিতে দিয়ে আবার নাক চেপে ধরি আরো কিছুটা জুস গিলানোর জন্য। আরো কিছুটা জুস গিলে ফেলা শেষ হতেই ওকে ছেড়ে দিয়ে আমি বিছানায় পা দুটো ভাজ করে আসন পেতে হতের কনুই হাঁটুর উপর ভর দিয়ে তালুতে চিবুক ঠ্যাকিয়ে বসতেই মেয়েটা ওঁয়াক করে বমি করে দেয়। আর বমি করবেই বা না কেন? ওটা তো আমার হাতের স্পেশাল জুস।

#বই_খাদক ( অন্তিম অংশ )
~ নীলাদ্রি মেহেজাবীন নীল

এক গ্লাস আনারসের সাথে দু চামচ ডিটারজেন্ট পাউডার, হাফ গ্লাস সয়া সস, একটা আস্ত লেবু, হাফ গ্লাস চিনি ভালো করে ব্র্যান্ডারে মিক্সড করে। তারপর হাফ গ্লাস কেরোসিন, হাফ গ্লাস পেট্রোল, হাফ গ্লাস ডিজেল আর কাল রাতের ছিঁড়ে ফেলা বইয়ের টুকরো গুলো একসাথে ব্র্যান্ডারে ব্র্যান্ডিং করে স্পেশাল জুস বানিয়েছি। ওর জন্য এর থেকে বেস্ট স্পেশাল জুস আর হয় নাকি! হতেই পারে না। মেয়েটা বমি করে নিজের অবস্থা আরো করুন করে ফেলেছে। কেন যে বমি করতে গেলো বমি না করে হজম করে ফেললেই পারতো। বমি করা শেষ হতেই আমি বিছানা থেকে ওঠে টেবিল থেকে প্লেটটা তুলে ওর মুখের সামনে ছোট ছোট গ্রিল করা হাড়ের সাথে মাংশের টুকরোগুলো ধরে বললাম,
-” চাখনেলে জারা তেরে টুকড়ে। “
ও খেতে চাইছিলো না। কিন্তু আমি আবার ওর নাক চেপে মাথা পেছন দিকে হেলিয়ে খাবার গুলো ওর মুখের ভেতর দিয়ে মুখ চেপে ধরি যেন খাবার গুলো ফেলে দিতে না পারে। বাচঁতে হলে ওকে খাবার গুলো খেতেই হবে। শেষ পর্যন্ত গ্রিল করা হাড়ের সাথে মাংশের টুকরোগুলো ওকে গিলিয়ে ছেড়েছি। কিন্তু ও কি জানে? হাড়ের সাথে মাংশের টুকরোগুলো ওর নিজের শরীরের অংশ। ওরই কেটে নেওয়া আঙ্গুলগুলো। খাওয়ার পর ও আবার ওঁয়াক ওঁয়াক করে বমি করে সব ফেলে দিলো। ধুর! এটা কিছু হলো? আমি ওকে কতো সুন্দর করে খাবার গিলাচ্ছি আর মেয়েটা খাবার গুলো গিলে আবার বমি করে সব ফেলে দিচ্ছে। দারুণ খেলা তো! আমি খাবার খাওয়াই আর সে খাওয়া শেষে বমি করে। বমি করা থেমে যেতেই আমি আবার ওর মুখে স্কচটেপ এঁটে দিয়েছি। কারণ আমি তো এখনও কিছুই করিনি।

এখন মেয়েটার কনুই থেকে হাতের কাটা অর্ধেক আঙুল আর পায়ের পাতা থেকে হাঁটু পর্যন্ত হাতে ও পায়ে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। কারণ ওর হাতে পায়ে পেট্রোল মেখে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছি আমি। জ্বলুক! মেয়েটা চেয়ারে বসে চোখ দুটো বড় বড় করে কেমন যেন ছটফট করে তিড়িংবিড়িং করে নড়ছে আর গোংরাচ্ছে আর চোখ দিয়ে তো টপটপ করে নোনা জল পড়ছেই। নিজের শরীরে আগুন জ্বলতে দেখে ও আবার সেন্সলেস হয়ে যায়। কিছুক্ষণ হাত-পায়ে আগুন জ্বলার পর আমি আগুন নিভাতে ওর হাতে পায়ে ফুটন্ত গরম ঢেলে দেই। ওর হাতের আর পায়ের মাংস পুড়ে কিছু জায়গার হাড়ও বেবিয়ে এসেছে। বিশেষ করে হাত ও পায়ের আঙ্গুলের হাড়গুলো। ও যেহেতু এতোই সেন্সলেস হয়ে যাচ্ছে তাহলে ওর আর সেন্স ফিরিয়ে কাজ নেই।

মেয়েটা এখন গভীর ঘুমুতে আচ্ছন্ন। ওর গভীর ঘুমু প্রয়োজন। খুব গভীর ঘুমু! তাই তো ঘুমু পারিয়ে দিয়েছি একেবারে। মেয়েটার গলা থেকে ফিনকি দিয়ে লাল রং লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে। লাল রং এর কিছু অংশ ছিটকে আমার চোখে মুখে এসেও পড়েছে। ওর মাথাটা ফ্লোরে নিচে পড়ে আছে গলা থেকে পুরো আলাদা হয়ে। কারণ চাপাতি দিয়ে গলায় শুধু একটা কোপ বসিয়ে দিয়েছি। কাজ শেষ। ও এখন থেকে আর জাগবে না গভীর ঘুমু করবে। আমার ঠোঁটের কোণে এখন মুচকি হাসি ঝুলছে।

৫.
কলিংবেল বেজে ওঠায় হুট করেই ঘুমুটা ভেঙ্গে গেলে আমার। বড় বড় হাই তুলতে তুলতে দরজার কাছে গিয়ে লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে দেখি অপর পাশে আমার মাদার ইন্ডিয়া আর ফাদার বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছেন। দরজা খুলে দিতেই মাদার ইন্ডিয়া হুমড়ি খেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে একটা চুমু এঁকে দিলেন। ফাদার বাংলাদেশ আমার মাথা হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-” কপালে আঘাত কিভাবে লাগলো আমার ছোট
মামণির ? “
উত্তরে আমি শুধু একটা মুচকি হাসি উপহার দিলাম তাদের। আমার এই হাসিটাই আমার উত্তর বলে দেয় হ্যাঁ আমি ভালো আছি। উনারা উনাদের লাগেজগুলো নিয়ে নিজেদের রুমে চলে গেলেন আর আমি আমার রুমে।

বিকেলে চা বানাতে নিচে নামতেই দেখি ডাইনিং এ বসে মাদার ইন্ডিয়া আর ফাদার বাংলাদেশ গল্প করতে করতে খুব তৃপ্তি সহকারে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। আমি কাছে যেতেই জিজ্ঞেস করলেন ফাদার বাংলাদেশ ,
-” আমার ছোট মামণি কলিজা ভুনাটা দারুণ রেঁধেছে তো! তা কলিজা ভুনাটা এতো মজা হওয়ার রহস্যটা কি? “
আমি ঢ্যাবঢ্যাব করে ফাদার বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছি উনি তখনও তৃপ্তি সহকারে খাবার খাচ্ছেন।
মাদার ইন্ডিয়া জিজ্ঞেস করলেন,
-” আরদ্রা কোথায়? কোন সাড়া শব্দ নেই যে? শুটিং থেকে ফিরেনি আজ এখনও?

আমি আমার মাথা বাম দিকে কাত করে নির্লিপ্ত ভাবেই উত্তরে বললাম,
-” ওর কলিজাটাই তো চিবিয়ে চিবিয়ে গিলছেন। “

উনারা দুজন বিষ্ময়ের অষ্টম আকাশে পৌঁছে ভূত দেখার মতো একে অপরের দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে বড় বড় করে চারটা চোখে উৎসুক দৃষ্টিতে একসাথে একযোগে জিজ্ঞেস করলেন,
-” মানে !”

আমি ফ্রিজ থেকে আরদ্রা মাথাটা বের করে তাদের সামনে নিয়ে দিলাম ডাইনিং টেবিলে ছেড়ে। সেটা দেখে মাদার ইন্ডিয়া ধপ করে মাটিতে পড়ে গেলেন। আর ফাদার বাংলাদেশ ওঁয়াক ওঁয়াক করে বমি করতে ব্যাস্ত হয়ে গেলেন।

আশ্চর্য! আমি কলিজার বাটিতে সামনে নোট লিখে রেখে দিয়েছি,
-” Don’t you dear touch this bowl! “
তাহলে উনারা সেটা দেখেননি কেন? আর দেখার পরও সেটা খেলেনই বা কেন? খেয়েছে তাতে আমার কি? আর যখন খেয়েই ফেলেছে তাতে ভালোই হয়েছে।

আমি চা বানিয়ে আমার রুমে এসেই শুরু করে দিয়েছি বই পড়তে। কিন্তু আমি ভাবছি ও কেন আমাকে অকারণে সব সময় গালিগালাজ করতো? আমি গালিগালাজ একদম পছন্দ করি না। ও ছোট থেকেই আমাকে গালি দিতো যার তার সামনে। আমাকে ছোট করতো। কেন ওমন করবে? আর আমাকে কেন অকারণে আঘাত করবে? আমাকে আঘাত করলে আমি কি ব্যাথা পাই না? আমি কি রোবট যে আমাকে আঘাত করলে আমি ব্যাথা পাবো না? আমারও তো আর আট দশটা মানুষের মতো শরীর আছে, মাথা আছে, হাত পা আছে, কোথাও কেটে গেলে লাল রং ঝড়ে পড়ে। তাহলে? আমাকে আঘাত করলে আমিও ব্যাথা পাই। আর আমাকে আঘাত করবেই বা কেন? আমাকে আঘাত করা আমি একদম পছন্দ করি না। আরদ্রা আমাকে ছোট থেকেই অকারণেই আঘাত করতো। আমি কতোবার মাদার ইন্ডিয়াকে ফাদার বাংলাদেশকে বলেছি আমাকে যেন আঘাত না করে আরদ্রা। কিন্তু ফাদার বাংলাদেশ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন ও তো আমার বড় বোনই হয় তাই আমি যেন মানিয়ে নেই। কেন? আমি কেন বার বার মানিয়ে নিবো? আর ও আমাকে বার বার আঘাত করবে! বড় বোন হয়েছে বলে কি আমাকে কিনে নিয়েছে? কলেজের সিঁড়ি থেকে আমাকে নিয়ে আমাকে ফেলে দিয়েছিলো। আমার পায়ের হাড় ফেটে যাওয়ায় আমি দু’মাস হাঁটতে পারিনি। কলেজে হকি টুনা মেন্টও খেলতে পারিনি। ডাক্তার আমাকে দৌঁড়াতে নিষেধ করে দিয়েছেন। আমি আর কখনো হকি খেলতে পারবো না। কিন্তু আমি হকি খেলতে ভালোবাসি। কিন্তু ওর জন্য আর আমি হকি খেলতে পারবো না। আমার বই পড়া নিয়ে ওর এতো হিংসে হতো কেন? আমি তো কারো কেন ক্ষতি করিনি। তাহলে? খাওয়ার সময়ও বই পড়া এটা আমার ছোট বেলা থেকেই সুন্দর একটা অভ্যাস। খাওয়ার সময়ও কালো হরফের লেখাগুলো খাবারের সাথে সাথে গিলে খাই। পার্থক্য শুধু একটাই। খাবারগুলো গিললে গলার নালি বেয়ে পেটে যায় আর বইয়ের লেখাগুলো গিললে সরাসরি চোখ দিয়ে গিয়ে পৌঁছায় মস্তিষ্কে। খাওয়ার সময়ও আমার বই পড়া ফাদার বাংলাদেশ এটা পছন্দ করেন। যদিও খাওয়ার সময় অন্য কোন কিছু করা একদম উচিত হয়। খাওয়ার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খাবার খেতে হয়। তবুও আমার ক্ষেত্রে সব নিয়ম বাঁধা নেই। মাদার ইন্ডিয়া এ নিয়ে ফাদার বাংলাদেশকে কথা শুনাতো। ফাদার বাংলাদেশ মাদার ইন্ডিয়াকেও শুনিয়ে শুনিয়ে বলতেন মেয়ে আমার বই পড়ছে অন্যায় কিছু করছে না। আর আমি মুচকি হাসি দিতাম ফাদার বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে। আমি খাওয়ার সময় বই পড়ছিলাম সেটা নিয়ে আরদ্রা ছিঁড়ে দিলো কেন? শুধু তাই নয় বইটা ছিঁড়ে পা দিয়ে পিষেছে পর্যন্ত! বইটা কি দোষ করেছিলো? আমি কি দোষ করেছি? আমি তো শুধু পড়ছিলাম। বই পড়া কোন অন্যায় নয়! বেশ করেছি আমি ওকে মেরে ফেলেছি! সব কিছুর কারণ সুদেআসলে উসুল করে নিয়েছি একদিনে।

৬.
ঘুমু থেকে জেগে চোখ মেলে তাকাতেই দেখি একজোড়া চোখ আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটোতে কি যেন আছে। ইজি চেয়ারে বসে চেয়ারের হাতায় কনুই এ ভর দিয়ে ঠোঁটে জোড়া হাতের আঙুল দিয়ে আড়াল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ঢ্যাবঢ্যাব করে। মুচকি হাসি দিয়ে ছেলেটার চোখে চোখ রেখে বললাম আমি,
-” গুড মর্নিং। “
ছেলেটাও আমার দিকে তাকিয়ে হাস্যজ্বল মুখে বললো,
-” শুভ সকাল। “
-” কিন্তু, কে আপনি? “
-” আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী। ফ্রেশ হয়ে নিন আমরা বাইরে যাবো।
আমি মাথাটা বাম দিকে কাত করে হ্যাঁ বোধক সম্মতি জানিয়ে বললাম,
– ” জি আচ্ছা। “

ফ্রেশ হয়ে ছেলেটার সাথে নিচে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়াতে একজন মহিলা আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার হাতে হ্যান্ডকাফস পড়াতে শুধু করলো। আমি ছেলেটার দিকে তাকাতেই ছেলেটা মহিলাটিতে নিষেধ করে দিয়ে বললো,
-” কোন প্রয়োজন নেই। “

মহিলাটি আমার হাত ছেড়ে একটু দূরে সরে দাঁড়ালো। আমি ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
-” আপনি দাঁড়ান আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আসবো বলেই হনহন করে দিকে এগিয়ে গেলাম আমার রুমের দিকে।
কিছুক্ষণ পর আমি দুই হাতে দুটো ভারী ভারী ব্যাগ হাতে নিচে নেমে এসে ব্যাগ দুটো ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম,
-” নিন ধরুন। “
-” কি এগুলো? “
-” আমার মস্তিষ্কের খাবার। “
-” মানে? “
আমি মুচকি হেঁসে বললাম,
-” আমি চিনি তো চিনি তো তাহারে –
শুধুই বই আমার…
আমি চিনি তো চিনি তো তাহারে –
শুধুই বই আমার! “

ছেলেটাও মুচকি হেঁসে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠলো,
-” বই খাদক! “

( সমাপ্ত )

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close