নন ফিকশন

প্রত্যাশিত নারী (পর্ব- ৮)

রায়ান সাহেব ডিক্লেয়ার দিল এদের পেঁছনে স্বশরীরে থেকে পাহারা দেয়ার আপাতত আর দরকার নেই। তাদের অন্য কাজে সন্দেহ হলে তারপর না হয় দেখা যাবে।
দু বাসার সামনেই সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে দাও এখনই, তবে সাবধানে, তারা যেন বুঝতে না পারে।তাহলে সব সময় তাদের পর্যবেক্ষণ ও করা যাবে আর স্বশরীরে থাকতে হবে না। তাহলে অন্য জায়গায় ইফোর্ট টা দিতে পারবে।
তার কথা মোতাবেক কাজ করা হল, কারেন্টের লোকেদের বেশে তারা কারেন্টের লাইন ঠিক করার ছলে সিসি ক্যামেরা টা লাগিয়ে দেয়।
পরদিন সকাল এগারো টা নাগাদ ডাস্টবিনের পাশে পড়ে থাকা ঐ ব্যাবসায়ীর খবর এল। সে নাকি কাউকে দেখে খুব বেশি ভয় পেয়ে রিয়েক্ট করছে, যার কারণে তার বিপি হাই হয়ে গেছে।
তৎক্ষনাৎ সেখানে পুলিশ যায়।
হাসপাতালে কোনো ডাক্তার বা নার্সের কাছে কোনই তথ্য পেল না রায়ান সাহেব। তিনিও ভেবে পাচ্ছেন না কেন এমন করছেন তিনি। কারণ মায়ার পরিবারের তো কেউই বেঁচে নেই তাই অন্য কাউকে দেখেও ভয় পাবার কিছুই নেই।
তবুও সে একটা কাগজে লিখে দিল সে মায়াকে বা তার পরিবারের কাউকে দেখেছে নাকি।
বেশ কিছুদিন ট্রিটমেন্ট চলায় লোকটা বেশ সুস্থ হয়ে গেছিল। তাই কাগজ টা দেখেই সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি সূচক উত্তর জানায়।
যদিও রায়ান সাহেবের মনে হচ্ছে এটা নিছকই তার মনের ভুল তবুও সন্দেহ তার মনে গেঁথেই গেল।
এবার আর তিনি কাজ বাকি রাখলেন না। তিনি ধরেই নিলেন, যদি এখানে সত্যিই প্রতিশোধগ্রহণ কারী বা এমন কেউ এসে থাকে তাহলে বাকি ভিক্টিমদের কাছেও যাবার চান্স আছে। তাই তিনি সাথে সাথেই সব কটা হাসপাতালে সেই ভিক্টিমদের ওয়ার্ডে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে দিলেন। বেশির ভাগ ভিক্টিমদের একই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। তাই তিনি দেরি না করে দ্রুত সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে দিলেন।
এরপর সেই অনার্সে পড়ুয়া ছাত্রের খবর এলো। তারও একই অবস্থা। রায়ান সাহেব এবার নিশ্চিত হয়ে গেলেন সত্যিই সেই ক্রিমিনাল আশে পাশেই রয়েছে যে সব কিছুর নজর রাখছে।
.
তিনি সাথে সাথেই বাকি ভিক্টিমদের ওয়ার্ডে নার্স এবং ওয়ার্ড বয় সাজিয়ে ফোর্স ছেড়ে দেন সাথে ক্যামেরা তো অন অাছেই।
এবারও যদি কোনো ক্রিমিমিনাল আসে তবে তার পিছু চলে যাবে সেই নার্স বা ওয়ার্ড বয় বেশে পুলিশ এবং তৎক্ষনাৎ তাদের গ্রেফতার করবে।
এবার সবাই খুবই সতর্ক থাকে যেন কিছুতেই হাত ছাড়া না হয়।
এটাই মোক্ষম সুযোগ, কারণ এবার হয়ত সেই ক্রাইমার জানে না যে সব খানে ফোর্স ছড়িয়ে আছে।
এবারও রায়ান সাহেবের ভাবনায় ধূলো দিয়ে দিল সেই ক্রিমিনাল!
এবার আর দেখা দিল না কোনো ভিক্টিমের কাছে, সব প্ল্যান ভেঁজতে দিয়ে আবারও জয়ী হয়ে গেলেন সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি!
.
রায়ান সাহেব বুঝেই পারছেন না এত চতুর আর সূক্ষ্ম কিভাবে হতে পারে একটা ক্রিমিনাল? তার এই বুদ্ধি যদি ভালো কাজে লাগাত তাহলে তো জীবনে অনেক উন্নতি করতে পারত সে!
.
হঠাৎ কি যেন মনে করে ছুটে চলে গেলেন তিনি থানায়।
এইবার ঐ বোরকা পরিহিতা সেই মহিলার ডিটেইলস্ চেক করলেন, তিনি চালাকি করেই ঐ মহিলার ডিটেইলস্ ঐ মহিলার হাত দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন কেনো এক বিশেষ কাজে, যেটা তিনি নিজ হাতেই করতে পারতেন!
তিনি এইবার সেই কাজ টা করে ফেললেন।
.
রায়ান সাহেবকে কাগজ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখায় নোয়েল জিজ্ঞেস করে কি দরকার, তখন রায়ান সাহেব বলেন-
“মনে আছে রাইশার হত্যাকারীদের কাছে একটা চিরকুট পাওয়া গিয়েছিল? এটা সেই চিরকুট, আর পাশে এটা ঐ বোরকা পরিহিতা মহিলার। জানো নোয়েল তার ভিডিও এবং তার কথা বার্তা কেন যেন দিন রাত আমাকে ভাবাচ্ছে! এখন তুমি এটা লিখালিখি করার এক্সপার্টের কাছে পাঠাও, দুটা লেখা একজনের হতে পারে নাকি, আর হ্যাঁ দুটার ফরেনসিক রিপোর্ট ও বের করো!”
.
নোয়েল দেরি না করে কাজ টা করে।
সন্ধ্যায় দুটার রেজাল্ট দিবে।
.
সারাদিন খেঁটেও কোনো কাজ হয়নি তাদের। কারণ অপরাধীর আর তেমন কার্যক্রম দেখা যায়নি।
এদিকে তাদের মিটিংয়ের সময় হয়ে এসেছে, সবাই একসাথে জড়ো হয়েছে।
সবাই মিলে এবার ঐ অনার্সে পড়ুয়া ছাত্রের ওয়ার্ডের সিসি ফুটোজ খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে।
সেখানে আন কমন কিছুই কেউ ধরতে পেল না কিন্তু রায়ান সাহেব বারবার এক জায়গাতেই ভিডিও পজ করে দেখছেন।
সবাই কৌতুহল হয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি একটা জ্যাকেট জিন্স পরিহিত একটা যুবকের দিকে অাঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখালেন সবাইকে।
ছেলেটার মুখে মাস্ক পড়া, মুখ দেখা যাচ্ছে না। তাকে দেখে রায়ান সাহেব সন্দেহ করলে সবাই বলে হয়ত ব্যক্তিগত সচেতনার জন্য মাস্ক ব্যবহার করেছেন। কারণ হাসপাতালে নানান রোগী আর রোগ জীবাণু থাকে।
আর তাছাড়াও এমনও হতে পারে তার হয়ত হাসপাতালের দুর্গন্ধ সহ্য হয় না।
রায়ান সাহেব বললেন-
যুবকটি যদি তার বন্ধু বা শুভাকাঙ্খী হয় তাহলে ভিক্টিমের কাছে গেলে ভিক্টিম এভাবে রিয়্যাক্ট করত না, ভালো করে দেখুন সবাই, ছেলেটা তার সামনে মাস্ক খুলতেই কেমন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে!
সবাই বলল আসলেই তো!
রায়ান সাহেব আবারও বলেন-
যে মুরব্বী কে মুখে গরম তেল দেয়া হয়েছিল, তার গেট আপ ও কিন্তু এমন ছিল, তাকে দেখা এক ছেলের বর্ণনামতে।
সুতরাং, এই ছেলের সাথে কেইসের সংযোগ থাকতে পারে, এমনটা ভাবা খুব একটা ভুল হবে না।
সবাই সম্মতি জানালো।
কিন্তু ছেলেটার ফেইস চোখ ছাড়া তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছিল না, কারণ পায়ে স্নিকার্স হাতে বাইকার রা যে গ্লভস টাইপ কিছু একটা পড়ে,সেটা হাতে পরা আর ফেইসে তো মাস্ক আছেই!
কিন্তু তাকে তখন ফলো করা হয়নি, কারণ এটা ফোর্স ছদ্মবেশে ছাড়ার আগেই হয়েছে!
.
সবাই এবার ঐ বোরকা পরিহিতা মহিলার কথায় আসে। নিলয় জিজ্ঞেস করে-
স্যার যতটুকু বোঝা যাচ্ছে এই যুবক টা হয়ত ক্রিমিনাল, তারমানে ছেলে ক্রিমিনাল, তাহলে আপনি ঐ মহিলাকে এত গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন কেন?
রায়ান বলেন-
নিচ্ছি কারণ, একটা মেয়ে এমন নিঁখুত ভাবে হুট করে দুজনকে ছেলেকে একা মারতে পারবে না, তার গায়ের জোরেই পারবে না। তারওপর তিনি বোরকা পরিহিত অবস্থায় ছিলেন।
এখন দেখা যাক আমার ধারণা মিথ্যা নাকি সত্যি, হতেও পারে আমার ধারণা সম্পূর্ণ টাই মিথ্যা।
.
এবার ঐ বাসা দুটার সিসি ফুটেজ সবাই চেক করে, বোরকা পরিহিতা মহিলার বাসায় আজকে কেউ আসেও নি আবার তিনি বেরও হন নি!
তাই সেটা আর গুরুত্বের সাথে নিল না কেউ।
এবার ঐ যে ভূতুরে বাড়ি ওটার সিসি ফুটেজ চেক করছে সবাই মনোযোগ দিয়ে।
বাজারের ব্যাগ হাতে মহিলাটা বাজার নিয়েই আসল।
আর স্কুটি পড়া মহিলাটা স্কুটি নিয়ে বিকেলের দিকে আসল।
সে যখন স্কুটি থেকে নামল হঠাৎ ই পৃথা চিল্লিয়ে উঠে বলল ‘পজ পজ’
সাথে সাথেও থামানো হলো ওখানে।
সবাই হা করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে!
কাশেম স্যার তো বলেই দিলেন, “এভাবে হুট করে চিল্লালে আমরা হার্ট এ্যাটাক্ না করলেও কান ঠসা ঠিক হয়ে যাব পৃথা! আস্তে বলবে তো, আমরা তো ভয়ও পেতে পারি!”
কাশেম স্যারের কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল।
এবার রায়ান সাহেব বললেন, –কি দেখেছ পৃথা যার জন্য এত উত্তেজিত তুমি?

স্যার দেখুন, এই মহিলার স্নিকার্স টা দেখুন, হাসপাতালের সেই যুবকের স্নিকার্স! মানে এটা মেয়ে না, ঐ ছেলেটাই!
সবাই অবাক হয়ে গেল, আসলেই তো!
বোরকা পড়া মহিলা টা আর সেই যুবক এর হাইট, আকার প্রায় সেম ই মনে হচ্ছে!
তার মানে এটা মেয়ে না, বোরকার অাড়ালে ছেলে!
সবাই বুঝে গেল এই বাসাতে আসলেই গন্ডগোল আছে।
তাই রায়ান সাহেব বলল যে করেই হোক ঐ স্কুটি প্রতিদিন কোথায় যায় সেটা খুঁজে বের করতেই হবে যে করেই হোক।
তারপর সে থানার একটা পাতলা-হ্যাংলা দারোয়ানকে ডাকলেন রায়ান সাহেব,সে ও সাহায্য করে অনেক কেইসে,ভালো অভিনয় পারে। তাকে বললেন সকালেই ঐ বাসায় ভিক্ষুকের বেশে গিয়ে সকালের খাবার চাইবে এবং কিছু সাহায্য চাইবে। তার মাঝে কৌশলে ঐ স্কুটি তে একটা ট্র্যাকার লাগিয়ে দিবে সাবধানে যেন কেউ না দেখে এবং বুঝতেও না পারে।
পরদিন সকালে তাই ই হলো। দারোয়ান ভিক্ষুকের বেশে গিয়ে সাহায্য এবং খাদ্য চাইল। গেট খুলে নিকাব সহ হিজাব পড়ে বের হলেন এক মহিলা, হ্যাঁ মহিলা ই, এবার ছেলে টি বের হয়নি। ঐ মহিলা যখন খাবার আনতে গেছে ভিতরে তখন সামনে থাকা স্কুটিতে দ্রুত ট্র্যাকার বসিয়ে দেন ঐ দারোয়ান।
কাজটি করে দ্রুত ওখান থেকে সরে গিয়ে বাগানে পায়চারি করে, এবং খাবার নিয়ে আসলে বলে, “মা আপনার বাড়ি খুব সন্দোর” মহিলাটি উত্তরে শুধু মুচকি হাসলেন। মনে হয়না কেউ কিছু ধরতে পেরেছে।
খাবার খেয়ে দোয়া দিয়ে বিদায় নিলেন দারোয়ান।
সোজা অফিসে গেলেন এবং সব বললেন খুলে।
রায়ান সাহেব এবার নিলয়কে বললেন তাদের বাসার আশে-পাশে বাইক সহ থাকতে, যখনই স্কুটি টা বের হবে তখনই যেন সেটাকে ফলো করে।
.
তিনি এবার ঐ বোরকা পরিহিতা মহিলার ডিটেইলস্ চেক করছেন। নাম নীলাশা জান্নাত। সেই সময় নীলাশা জান্নাতের ফরেনসিক রিপোর্ট আর লিখার রিপোর্ট আসলো, ৭৫% ম্যাচ করেছে।
এবার তো রায়ান সাহেব সিওরই হলেন নিশ্চয়ই কোনো সংযোগ আছে। আর নীলাশা যেহুতু প্রিন্সদের মেরেছে তারমানে রাইশার সাথে হয়ত যোগাযোগ আছে।
তিনি তখন মাইশাদের বাসায় যায়। এবার বড় ভাই হিসেবে সিভিল ড্রেসেই যায়, মাইশার জন্য আইসক্রিম, চিপস আর সবার জন্য ফলমূল নিয়ে যায়।
রায়ান সাহেবকে দেখে মাইশা বেশ খুশি হয়,কারণ সেও ভাইয়ের জায়গায় তাকে বসিয়েছে একটু আকটু। আইসক্রিম দেয়াতে মেয়েটা আরো বেশি খুশি হয়ে গেল।
মাইশার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার পর মাইশাকে বলল-

মাইশা তোমার কি এই কিছুদিনে তোমার কোনো চেনা পরিচিত মানুষের সাথে কথা হয়েছে প্রিন্সদের ব্যাপারে?

কই না তো, আমরা যখন থেকে চলে এসেছি ঐ জায়গা থেকে, তখন থেকে আমাদের কারো সাথেই আর যোগাযোগ হয়নি। আমরা একদম একা হয়ে গেছি।
বাবাও আমাকে একা ছাড়ে নি তারপর থেকে।

তুমি তো রিসেন্টলি ফেসবুকে এক্টিভ হয়েছ, এমন কারো সাথে এর মধ্যে কথা হয়নি যে তোমার পূর্ব পরিচত? কোনো বড় ভাই বা বোন?

উম না তেমন কেউ নেই তো।
ওহ্ হ্যাঁ হ্যাঁ নীলা আপুর সঙ্গে কথা হয়েছে অনেক দিন পর!

নীলা?
কে নীলা?

আমাদের স্কুলের সিনিয়র আপুু, আমাদের খুব আদর করত।
বাবার কাছে প্রাইভেট পড়তে আসত, আপুকে বাবাও খুব আদর করত।
একদম আমাদের বড় বোনের মত ছিল। অবশ্য রাইশা আপুর সাথে বেশি মিল ছিল কারণ তাকে পড়াশোনায় খুব হেল্প করত নীলা আপু। নোটস্ দিত,বই দিত।
আমার রাইশা আপু খুব পড়ুয়া ছিল কি না!
রাইশার কথা বলতে বলতেই মাইশা কেঁদে দিল। নিজেকে সামলে আবার বলল-

আপনি হঠাৎ এই প্রশ্ন করছেন কেন?

জানো মাইশা, তোমার এই বোকা ভাইয়া খুঁজেই বের করতে পারছে না কে এমনটা করছে। এমন হতে থাকলে তো আমার মান-সম্মানই চলে যাবে!

যা হচ্ছে হতে দিন না ভাইয়া, কারো তো খারাপ হচ্ছে না। শুধু খারাপ মানুষরা শাস্তি পাচ্ছে যেটা আইন দিতে পাচ্ছে না।

তুমি বুঝছো না আপু,আইন নিজের হাতে নেয়া টাও অপরাধ!
আর এভাবে হতে থাকলে তো পুরো দেশেই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। এই যেমন ধরো, মানুষ ডাকাতি করবে জনসম্মুখে, কেউ কিছু বলতে পারবে না কারণ তখন আইন কেউ মানবে না। আবার দিবালোকে মানুষকে খুন করলেও কেউ কিছু করতে পারবে না,তার শাস্তিও হবে না কারণ তখন দেশে আইন থাকবে না। আর ক্রাইমার রা তো তখন বলবে যখন রাস্তা ঘাটে পুরুষের শাস্তি দেয়া হত তখন তো আইন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এখন কেন হবে!
আবার ধরো, নারীকে রাস্তা ঘাটেই নির্যাতনের করা হবে, এখন সব নারী তো শক্তিশালী নন যে নিজেকে বাঁচাতে পারবে।
তখনও কিন্তু কোনো শাস্তি হবে না!
এখন বল এমন হলে কি ঠিক হবে?

না.. তা হবে না, কিন্তু..
-কিন্তু কিছুই না আপ, যে শাস্তি দিচ্ছে সে তো ভালো কাজ করছে কিন্তু আইন সম্মত নয়, কিন্তু তাকে দেখে অসাধু রা আরো পার পেয়ে যাবে। তখন নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে!

হুম।বুঝেছি।
তাহলে একটা কাজ করবেন ভাইয়া?
যারা এমন করল তাদের বেশি শাস্তি দিবেন না ঠিক আছে?
তারা অনেক ভালো!

আচ্ছা আপু তা না হয় ঠিক অাছে, সেটা পরেও ভাবা যাবে।
আগে তো তাকে খুঁজে বের করতে হবে!তোমাকে সাহায্য করতে হবে আমাকে, কি পারবে না?

আমি কিভাবে সাহায্য করব?
আমি তো কিছুই জানি না!
-আমি তোমাকে যা যা বলব তার সব সত্যিটা বলতে হবে তোমাকে। কি বলবে তো?

হ্যাঁ বলব
-গুড!
এখন বল তোমার নীলা আপু তোমাকে কি কি বলল?

বলল আমরা কেমন আছি, কিভাবে দিন যায়, প্রিন্সকে মারা হয়েছে ইত্যাদি

তোমাকে আর কিছু বলে নি সে?

হ্যাঁ বলল আমরা খুশি নাকি এতে, বাবা-মা খুশি নাকি।
আমি বলেছি হ্যাঁ খুব খুশি!

আচ্ছা, সে কোথায় থাকে তুমি জানো কি?

আমাদের স্কুল যেখানে সেখান থেকে একটু দূরে। তবে আপু মনে হয় এখন এখানে থাকে না, হোস্টেলে থাকে।

আচ্ছা মাইশা, যারা এমন করল তাদের তোমার কি করতে ইচ্ছে করে?

তাদের কে জড়িয়ে ধরে পাপ্পি দিব, আইসক্রিম দিব, ফুল দিব! খুবই ভালো কাজ করেছে, একদম আমার মনের মত করে শাস্তি দিয়েছে!
আমি একবার নীলা আপুকে।কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, আপু আমাকে সেদিন জড়িয়ে ধরে বলেছিল হবে তাদের শাস্তি চিন্তা করিস না। আসলেই তাদের শাস্তি হল!
উফ কি যে খুশি লাগছে আমার!

কে এমন করল তাদের দেখতে ইচ্ছা হয় না তোমার?
জানতে ইচ্ছা হয় না?
-ইচ্ছা তো হয় ই, কিন্তু উপায় যে নাই!

আচ্ছা মন খারাপ করো না, ভাইয়ার সাথে আজকে ঘুরতে যাবে?

বাবা যেতে দিবে না

আমি রাজি করাতে পারলে যাবে তো?
-আগে করুন না, করতে পারলে তো যাবই!
.
রায়ান সাহেব রহমত স্যারকে ডেকে বলল মাইশা নিয়ে একটু ঘুরতে যেতে চান।
স্যার তো রাজি ই না উপরন্তু তার মা ও না!
মেয়েকে তারা একা কিছুতেই ছাড়বে না।
এক মেয়েকে হারিয়েছে, এবার এর কিছু হলে তারা আর বাঁচবেই না!
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে রাজি করে মাইশাকে নিয়ে বের হলেন রায়ান।
মাইশাকে বেশ ঢেকে বোরকা পড়িয়ে নিয়ে পাঠালেন বাসা থেকে।
পথিমধ্যে ফুল,আইসক্রিম ইত্যাদি নিল রায়ান, মাইশা এগুলো দেখে বেশ অবাক!
কার জন্য নিচ্ছে জিঙ্গেস করলে রায়ান বলেন আগে তো চলো!
রিক্সা এসে থামল নীলাশা জান্নাত তথা সেই বোরকা পড়া মহিলার বাড়ির সামনে। কলিং বেল বাজাতে থাকলে নীলাশা দেখল রায়ান এসেছে কিন্তু সাধারণ পোশাকে সাথে একটি মেয়ে।
বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে, তারপরও একটা বড় হিজাবে মুখ ঢেকে খুলে দেয় দরজা।
দুজন ঘরে ঢুকে পড়ে।
কিছুই বুঝে উঠতে পারে না মেয়ে দুটো!
রায়ান সাহেব মাইশাকে বলল, “আইসক্রিম আর ফুলটা ওনাকে দাও!”
মাইশা কিছু না বুঝেই দিয়ে দিল। নীলাকা বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেল। হুট করে বাসায় না জানিয়ে চলে এল আবার আইসক্রিম দিচ্ছে!
রায়ান সাহেব কে উদ্দেশ্য করে নীলাশা জান্নাত বললেন-
-“আপনি হুট করে বাসায় কেন? না জানিয়ে বাসায় আসা টা উচিত নয় এটা কি আপনার জানা নেই?
আর আইসক্রিমই বা কেন এনেছেন? আমার বাসায় ফ্রিজ নেই এগুলো ফেরত নিন!”
রায়ান সাহেব বলেন, “বাসায় মেহমান আসতে পারে না? আসলে কি এমন ব্যবহার করতে হয়?
আসুন আগে আইসক্রিম টা খেয়ে নিন, নইলে গলে যাবে।
পড়ে না হয় এ নিয়ে কথা বলা যাবে!”
নীলাশার কন্ঠ বেশ চেনা চেনা লাগছে মাইশার। কিন্তু পরিবেশটা যেন কেমন!
বেড়ানোর কথা বলে এ কার বাড়িতে নিয়ে আসল! আবার ঝগড়াও করছে!
.
রায়ান সাহেব অনুরোধ করলেও খেতে চান না নীলাশা, তবুও আইসক্রিম গলে যাবে জন্য দুটা বাটি আর চামচ নিয়ে এসে বলল আপনারা খেয়ে নিন।
রায়ান বলেন, “আপনি না খেলে আমরাও খাব না! এই যে দেখছেন আমার ছোট বোন, ও কিন্তু আপনার জন্যই এনেছে আইসক্রিম টা!”
কথাটা বললে মাইশা বাঁকা দৃষ্টিতে রায়ানের দিকে তাকায়!
সে আবার কখন বলল এ কথা? তার নামে বানিয়ে বলা দেখে রাগ হলো তার।
নীলাশা কথা না বাড়িয়ে তাদের দুজনকে আইসক্রিম এগিয়ে দিয়ে বলল আপনারা খেয়ে নিন, আমি ভেতরে খেয়ে নিচ্ছি, আপনাদের সামনে মুখ খুলতে পারব না!
রায়ান কোনো অাপত্তি করলেন না।
নীলাশা চলে যাবার পর মাইশা যেই প্রশ্ন করতে যাবে ওমনি রায়ান বললেন, “আগে খেয়ে নাও পরে সব শুনব!”
দুজনের আইসক্রিম খাওয়া শেষ হলে দু গ্লাস পানি নিয়ে ভেতর থেকে আসে নীলাশা।
খাওয়ার কারণে মাইশার মুখ খোলা ছিল, ওকে দেখে নীলাশা একদম চমকে যায়। পর্দার আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছে তার চোখের কোণা টা ভিজে গেছে। রায়ান সাহেব বললেন-
“এবারও কি আমাদের এখন যেতে বলবেন?”
নীলাশা চুপ করে থাকে।
মাইশা কিছুই বুঝতে পারছে না এসবের!
এবার মাইশাকে রায়ান সাহেব বললেন, কি যেন বলতে চাচ্ছিলে?
ওহ্ হ্যাঁ কেন এখানে এনেছি?
যাও তো, ভিতরে গিয়ে এনার মুখ দেখে আসো, চিনতে পারো না কি তোমার নীলা আপু কে!”
মাইশা পুরো থ হয়ে গেল!
তার নীলা আপুকে কিভাবে চিনলেন রায়ান?
কিছুক্ষণ আগেই মাত্র তার কথা বলল আর তাতেই কিভাবে খুঁজে বের করল?
মাইশা আর দেরি করল না। দৌড়ে গিয়ে পেছনে ঘুরিয়ে নিকাব খুলে দিল নীলাশার।
এ কি!
এতো সত্যিই তার নীলা আপু। কোনো কিচ্ছু আর না ভেবে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিল মাইশা।
নীলাশাও নিজেকে আর সামলাতে পারল না, নিজেও কেঁদে দিল।
দৃশ্যটা দেখে বেশ স্বস্তি পায় রায়ান সাহেব..
.
অভিমানী সুরে মাইশা কাঁদতে কাঁদতে নীলাশা কে অভিযোগ করতে থাকে রাইশা আপুও চলে গেল আর তুমিও আমাদের কোনো খোঁজ রাখলে না, তুমি পঁচা নীলা আপু, তুমি শুধু রাইশা আপুকেই ভালোবাসতে!
দেখলে তো তোমাকেও ফাঁকি দিল রাইশা আপু।
আমার খুব কষ্ট নীলা আপু, কেউ নেই আর আমাদের!
নীলাশা কিছুই বলছে না, আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে মাইশা কে…
.
বেশ কিছুক্ষণ কাঁদার পরে নীলাশা মুখ ঢেকে রায়ান সাহেবের দিকে মুখ ঘুরায়। তাকে প্রশ্ন করে মাইশা কে কিভাবে জানল? আর এ ই বা কিভাবে জানল নিলাশার পরিচিত মাইশা!
রায়ান মুচকি হেসে বলল, আবেগের বশে হয়ত ভুলেই গিয়েছেন আমি একজন আইন রক্ষক! আর সব কিছু ক্ষতিয়ে বের করাটাই আমাদের কাজ।
নীলাশা চুপ করে গেলেন।
তাকে জিজ্ঞেস করলেন কেন এসেছেন।
রায়ান মাইশাকে ইশারা করে বললেন, “তুমি না পাপ্পি দিতে চেয়েছিলে? এই নাও তোমার সেই মানুষের কাছে নিয়ে এসেছি, এবার প্রাণ ভরে ভালোবেসে নাও!”
মাইশা আগা মাথা কিছু না বুঝে প্রশ্ন করে, “আমি আবার আপনাকে কখন বললাম আমি নীলা আপু কে পাপ্পি দিতে চেয়েছি? “
রায়ান বলেন, “বাসায় ই তো বললে, আর তুমি তো বুদ্ধিমতী মেয়ে, তোমার তো এতক্ষণে বুঝে যাবার কথা!”
মাইশা থ হয়ে গেল। তারমানে কি রায়ান সাহেব বোঝাতে চাচ্ছেন প্রিন্স কে খুন আর বাকিদের মেরেছে তার নীলা আপু?
মাইশা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নীলাশার দিকে তাকালো। কি যেন জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছে কিন্তু তার মুখ আঁটকে আছে। অনেক কষ্টে মুখ থেকে বের করল, “কিভাবে নীলা আপু?”
নীলাশা বুঝেও না বুঝার ভান ধরে বলল- “কী কিভাবে? কি বলতে চাচ্ছো তোমরা?”
এবার রায়ান সাহেব বললেন- “ম্যাম আপনিও যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, আমরা কি বলতে চাচ্ছি তা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন এতক্ষণে!
এবার বলুন তো কিভাবে সব করলেন?”
নীলাশা বলল- “কি করেছি?”
মাইশা বলল- “আপু তুমি প্রিন্সদের মেরেছো তাই না, আমি খুব খুব খুশি হয়েছি” এই বলে নীলাশার গালে একটা চুমু দিল নিকাবের ওপর থেকেই।
সবাই চুপ হয়ে আছে।
রায়ান নিরবতা ভেঙ্গে বলল-
“আপনি আত্মসমর্পণ করুন, আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করব আপনার শাস্তি সর্বোচ্চ কমানোর।”
মাইশা হাউ মাউ করে কেঁদে রায়ানের পায়ে পরে পা ধরে বলল- “ভাইয়া এমনটা করবেন না ভাইয়া, আপুকে ধরিয়ে দিবেন না, আমার নীলা আপুকে ছেড়ে দিন, আমি কথা দিচ্ছি আমি আমার নীলা আপুকে বুছিয়ে বলব আর যেন এমন না করে, কোনো অন্যায়ের যেন আর প্রতিবাদ না করে। আমি আমার রাইশা আপুকে হারিয়েছি, আমি চাই না আমার নীলা আপুও আমার কাছ থেকে চলে যাক।
আপনি তো সেদিন বললেন আপনি আমার বড় ভাইয়ের মত, আমি আপনার কাছে ছোট বোন হয়ে এই আবদার করছি ভাইয়া, আর কিচ্ছু চাইব না আপনার কাছে। আপনি ছেড়ে দিন আমার নীলা আপু কে” এক নাগাড়ে বলতে থাকলো কথা গুলো।
এদিকে নীলার হয়ে এভাবে মাফ চাওয়ায় নীলাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না, নিরবে কাঁদতে থাকল..
রায়ান মাইশা কে পা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মাইশাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
মাইশার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল চুপ করতে, তিনি সব ঠিক করে দিবেন..
রায়ান সাহেব বললেন-
“আপনি তো একা এসব করেন নি, বাকি রা কোথায়? কিভাবে করলেন এসব? কেনই বা করলেন?”
নীলাশা নিরব থাকে, কিছু বলে না মুখ দিয়ে…

রূপসীনা খুকু

আসসালামু আলাইকুম, আমি খুকু, অদক্ষ হাতে হাবিজাবি লিখি আর সেটাই শেয়ার করছি আপনাদের সাথে! আশা করি ভালো লাগবে! :-D

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close