রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

প্রত্যাশিত নারী (পর্ব- ৪)

পরদিন সকালে আবার রায়ান সাহেব মাইশাদের বাড়ি যান। কারণ গতকাল রাইশার নির্মমতা শুনে তার আর প্রশ্ন করা হয়নি। আজ তাকে শক্ত হতে হবে। সব টা শুনতে হবে।
মাইশাকে গিয়ে বলে,
-তুমি কি জানো প্রিন্স মারা গেছে তাও আবার খুব যন্ত্রণার সাথে?
তার রিপোর্ট কি বলছে জানো? দুদিন ধরে তাকে কুকুর দিয়ে যৌন নির্যাতন করার হয়েছে। সারা দেহে কুকুরের আঁচরের দাগ। দুদিন ধরে এমন নির্যাতনের পর তাকে খুন করা হয়েছে। শুধু তাকেই। আর বাকিদের ও ওমন নির্যাতন করলেও মেরে ফেলেনি সেই ঘাতক।

কি বলেন এসব? মাশাঅাল্লাহ্! আল্লাহ্ ই আমার বোনের বিচার করেছে। যেখানে মানুষ কোনো ভাবে সাহায্য করে নি সেখানে আল্লাহ্ ই তাকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছে! আলহামদুলিল্লাহ্ আমি অনেক খুশি! যাই আব্বুকে বলে আসি!
-আপু থামো একটু! তুমি সত্যি করে একটা কথা বলবে আমাকে?

জ্বি ভাইয়া বলুন, এত সুন্দর একটা খবর দিয়েছেন, আজ যা বলতে বলবেন আমি সব বলব!

আল্লাহ্ প্রিন্সদের বিচার করেছে এটা ঠিক, কিন্তু কোনো তো মাধ্যম লেগেছে, উসিলা লেগেছে। তুমি কি জানো সেই মাধ্যম টা কি? কে সেই ব্যাক্তি?

মানে?
আপনি কি আমাদের সন্দেহ করছেন?

না আপু মোটেই তা নয়! আমি শুধু জানতে চাচ্ছি কে সেই, নাকি তারা।
বিচার করছে ঠিক, কিন্তু আইন তো নিজের হাতে তোলা ঠিক না আপু। একটু বুঝতে চেষ্টা কর।

আইন? কিসের আইন!
কি করেছে আপনাদের আইন?
কার সুষ্ঠু বিচার করেছে আপনাদের আইন? ও শুধুমাত্র সরকার ও প্রশাসনের মানুষদের জন্য আইন?(রেগে গিয়ে)

আপু একটু শান্ত হও, আইনের প্রতি একটু বিশ্বাস স্থাপন করেই দেখ না!

হাহা!
ঐ আইন কে বিশ্বাস করতে বলছেন যে আইন আমাদের সুখের সংসারটা তছনছ করে দিলো?
আচ্ছা আপনি বলুন সাধারণ একটা কাউন্সিলরের এত পাওয়ার কিসের?
তারা তো মাত্র জনগণের বাধা বিপত্তি দেখার জন্য, কাউকে কষ্ট দেয়ার রাইট কি তাদের আছে?
সেদিন যদি আব্বুর করা নালিশ টা আমলে নিয়ে প্রশাসন একটু তাদের সাবধান করত তাহলে এতদিন আমার আপু ডাক্তারি ভর্তি পরিক্ষার প্রিপারেশন নিত!
তারপরও যেদিন সে মিসিং হয়েছিল সেদিনও যদি তাকে প্রশাসন গুরুত্ব নিয়ে খুঁজত তাহলে তাকে হয়ত জীবিত পাওয়া যেত, হয়ত আমার বোন সর্বস্ব হারিয়ে আসত, তাও সে বেঁচে থাকত!
কিন্তু তারা কিছুই করেনি এমন। উল্টো আপুর চরিত্র নিয়ে কথা তুলেছে।
যে আপু আমার কঠোর পরিশ্রম করত পড়াশুনো করত ভালো রেজাল্ট করতে, যে সব পার্টি, টিভি সব বিসর্জন দিয়েছিল শুধুমাত্র জনসেবার উদ্দেশ্যে,সেই আপুকেই জনগণের দ্বারা কলঙ্কিত হয়ে পরপারে যেতে হয়েছিল!
হায়রে সমাজ! হায়রে মানুষ!
রায়ান সাহেব মাথা নিচুঁ করে থাকে। মেয়েটি তো কিছু ভুল বলেনি!
তাও বেহায়ার মত নিজের দায়িত্বের স্বার্থে আবার বলল

আমি লজ্জিত আপু, আমিও জানি বিচার না পাওয়া এমন হাজারো গল্প। তুমি কি সত্যিই জানো না সে ক্রিমিনাল সম্পর্কে?
না মানে যেহেতু তোমাদের সাথে কেইসটি রিলেটেবল তাই বলছিলাম আরকি!
যদি তুমি কোনো ক্লু দিতে পারো!

শুধু আমাদের সাথেই কি রিলেটেবল? খোঁজ নিয়ে দেখুন আরো কতশত এমন কাজ করেছে!
তবে হ্যাঁ, আপনাকে যেহেতু ভাইয়া ডেকেছি সেহেতু এতটুকু বলতেই পারি, সত্যি আমরা এমন কাউকে চিনি না যে এমন করতে পারে!
তবে বলি কি, যে এমনটা করছে তাকে করতে দিন। আপনাদের আইন আমাদের অসহায়দের জন্য না, সেই ব্যক্তিই না হয় করুক অসহায়দের বিচার!

এভাবে বলো না, আইন কিন্তু এতটাও খারাপ না!

জানেন আমার বাবাও এমন কথা বলত, তার দেশের আইন, জনগন আর দেশকে নিয়ে খুব গর্ব করত। কিন্তু দিনশেষে কি হলো বলুন?
আব্বুর সেই বিশ্বাস খুব বিশ্রী ভাবে ভেঙে গেল!
-আচ্ছা তাহলে আজ আসি,যদি তুমি কিছু জেনে থাকো তাহলে ভাইয়াকে জানাবে কেমন?

আরে আরে যাচ্ছেন কোথায়?
বসুন আজকে না খাইয়ে যেতে দিব না!
মাইশার মাথা বুলিয়ে দিয়ে রায়ান সাহেব বলে,
-আজ আসি, পরে একদিন এসে তোমার হাতে চা খেয়ে যাব! বানাবে তো!
মুচকি হাসি দিয়ে মাইশা তাকে বিদায় জানালো।
মাইশার মুখে হাসি দেখে রায়ান সাহেব বেশ খুশি হলেন, এমন তৃপ্তি পেলেন যেন সত্যিই তার ছোট বোন হাসল!
.
তিনি যেহুতু নতুন জয়েন করেছেন এই থানায় আর রাইশার কেইস টা তাদের থানার না সেহুতু তিনি তৎকালিন অফিসারের সাথে দেখা করতে যান।
তার সাথে তো বোঝাপড়া বাকি আছে। একজন আইন রক্ষক হয়ে তিনি এমনটা কি করে করতে পারেন!
থানার কাছে গেলে তিনি হৈ চৈ শুনতে পান। ভেতরে গিয়ে দেখে এক অফিসারকে কে যেন মুখে আর দুহাতে গরম পেট্রোল ঢেলে পালিয়েছে!
এত বড় দুঃসাহস কার হলো যে থানায় এসে, থানার অফিসারকে এভাবে পেট্রোল ঢেলে পালায়!!
অফিসারকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করে রায়ান সাহেব সেই অফিসার সম্পর্কে খোঁজ নেন থানায়।
রায়ান সাহেব কে অবাক করে দিয়ে সবাই বলেন সেই সময়ের দায়িত্বরত অফিসার আর কেউ নন, মাত্রই যিনি আহত হলেন তিনিই সেই অফিসার!
রায়ান সাহেব মুহুর্তেই চুপসে গেলেন!
তাহলে রাইশার সাথেই কি সম্পৃক্ত সেই অজ্ঞাত ঘাতক!
.
এসবে আর দেরি না করে তিনি সিসি ফুটেজ ঘাঁটলেন। দেখলেন হুডি ওয়ালা জ্যাকেট আর জিন্স এর সাথে মাস্ক পরিহিত কেউ একজন সেই অফিসারের ডেস্কে বসে কিছু একটা বলছিল, এরপর হঠাৎ ই পেট্রোল ঢেলে খুব শান্ত পায়েই চলে গেল। স্যারের চিল্লানোর জন্য তাকে কেউ খেয়াল করে নি।
তবে কি এই একজন ই কি ঘাতক?
কারণ এলাকার মুরুব্বীর মুখে গরম তেল ছিটানো ক্রিমিনাল টাও জ্যাকেট জিন্স পরা ছিল।
কে সেই ছেলে যে দিবালোকে এভাবে সবাইকে আহত করছে?
এত সাহস সে কোথায় পেল?
.
ফাইল ঘেটে তিনি আবার নিজের থানার দিকে রওনা দিলেন।
নাহ্ এবার কিছু একটা বের করতে হবে।
ওপর মহল থেকে চাপ আসছে দ্রুত রহস্য উদঘাটনের। কিন্তু কোনো ক্লু ই পাচ্ছেন না তিনি!
.
“আচ্ছা সমাজের সবাই এত ঘাবড়ে গেছে কেন? শুধুমাত্র দু চারজনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে তাতেই এত আতংকিত কেন হয়ে পড়ছেন পুরো সমাজ? প্রশাসনই বা এত জোর দিচ্ছেন কেন এই ইস্যু তে?
এটাও তো নরমাল ঘটনা, যেগুলো রোজ ঘটে যাচ্ছে একজন নারীর সাথে। কই তখন তো কারো এত চেতনা জাগ্রত হয় না, একটা পুরুষ জন্যই কি এত গুরুত্ব তার সমাজে?
প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি, উত্তর টা আপনারা দিবেন”
এই পোস্টটা রায়ান সাহেবের অনেক নারী বন্ধু শেয়ার করছেন ফেসবুকে।
যিনি স্টাটাস টা দিয়েছেন তার আইডি টার নাম একটু অদ্ভুত, ‘আমি নারী বলছি’
যার স্টাটাস দেখে মনে হচ্ছে উচ্চ শিক্ষিত, তার আইডির নাম এমন কেন?
.
প্রশাসনের লোক হওয়ায় আইটি বিষয়ে তার ধারণা ভালো, আর সন্দেহ ভাজন ব্যাক্তিদের আইডি ঘুরে দেখা তার নিত্য নৈমিত্তিক কাজ। তাই তিনি এই আইডি টা ঘেঁটে দেখেন তদন্তের স্বার্থে।
তার আইডিতে ঘুরে তিনি শুধু নির্যাতনের খবর আর অপরাধী দের শিনা টান করে ঘুরে বেড়ানোর সংবাদ পান।
সবগুলোতেই তার ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে।
তিনি ঘাটতে ঘাটতে একদম বছর খানেক আগে একটা স্টাটাস দেখতে পান এসব ক্রাইমের ভীড়ে। একটা নাম দেখে থমকে যান তিনি কারন তিনি পোস্ট করেছিলেন রাইশা নামের কোনো এক মেয়ের যাকে নির্মমতার সাথে হত্যা করা হয়। বাবার নামের সাথে মিল পেয়ে রায়ান সাহেব সিওর হয়ে যান এটা মাইশার বোন রাইশারই নিউজ।
তিনি পোস্টার লিংক ভালো করে সংরক্ষণ করে স্ক্রিনশট ও রেখে দেন যাতে পরে খুঁজে পেতে সহজ হয়।
.
তারপর তিনি ঐ ডেটের সব ঘটনা খুঁজেন, কে কে প্রতিবাদ করেছে রাইশার ঘটনার।
আশ্চর্যজনক ভাবে তিনি মোট দুটো আইডি ই পেলেন, একটা এই মহিলা আর একটা সাংবাদিক এর টাইম লাইনে।
সেই সাংবাদিকের আইডি অবশ্য রিমেম্বারিং করা অর্থাৎ তিনি জীবিত নন!
শুধু মাত্র দুজন শেয়ার করেছে এ ব্যাপারে! অদ্ভুদ না?
শুধুমাত্র এই সামান্য কারণে কেন যেন রায়ান সাহেবের তাকে সন্দেহ হয়। তার আইডি থেকে প্রসেসিং করে তার লোকেশন বের করে তার ওখানে যান।
যে বাসা থেকে তার লোকেশন দেখাচ্ছে সে বাসা টা যেন কেমন একটু ভূতুড়ে টাইপ, আশে পাশে তেমন কোনো ঘর বাড়ি নেই। শুনশান এলাকা আর বাড়িটাও পুরোনো মনে হচ্ছে।
বাসার ছাদে দুটা মেয়ে দেখতে পাচ্ছেন তিনি। আবার গেইট দিয়ে স্কুটি নিয়ে বোরকা পরিহিতা একজন নারী বেরিয়ে গেলেন।
ব্যাপারটা তার যেন কেমন খটকা লাগল। এক বাসায় তিনটা জোয়ান মেয়ে, জোয়ান কারণ একজন বৃদ্ধা স্কুটি চালাবেন তাও আবার বোরকা পড়ে, ব্যাপারটা ঠিক যায় না বাংলাদেশে!
.
কিন্তু এ ও তো হতে পারে তারা তিন বোন, হয়ত ভেতরে তাদের ফ্যামিলি আছে।
এই সামান্য কারণে এখন তাদের বাসায় হানা দেয়া টা মানায় না। আর কি ই বা বলবে ভেতরে গিয়ে?
সামান্য পোস্টের জন্য তো আর একজনকে সন্দেহ করা যায় না।
এটা নিছকই তার মনের ভুল বলে উড়িয়ে দেয় রায়ান সাহেব, আর ভাবতে থাকে যে তেল আর পেট্রোল ঢেলেছে সে তো ছেলে, অযথা মেয়েদের সন্দেহ করে লাভ নেই। এতে আরো প্যাঁচ লাগবে তদন্তে।
আর তাছাড়াও বাঙ্গালী মেয়েরা এখনো এতো শক্তিশালী হননি যে একা হাতে কোনো পুরুষকে শাস্তি দিবে!
তারা তো লজ্জায় ইভ টিজারদেরই থাপ্পড় দিতে পারে না। অবশ্য দেবেই বা কি করে, একটা থাপ্পড়ের বদলে তো আবার ধর্ষণ ফ্রি এদেশে!
.
রায়ান সাহেবের ধারণা রাইশার সাথেই প্রিন্স আর ঐ পুলিশ অফিসারের যোগসূত্র আছে।
নইলে বেছে বেছে ক্রিমিনাল কেন ওনারই ক্ষতি করল এত গুলো অফিসার থাকতে? আর প্রিন্স আর তিনি একই থানার।
ঠিক এই পয়েন্টেই সে আঁটকে আছে।
আর তার গভীর বিশ্বাস, একবার যদি প্রিন্সের খুনিকে পাওয়া যায় তাহলে হয়ত অন্য কেইস গুলোরও জটলা খুলতে পারে।
যদি রাইশার প্রতিশোধ নেয়া ক্রিমিনাল টাকে ধরতে পারেন একবার, তাহলে বাকিদেরও সন্ধান পাবেন হয়ত!
যেহেতু যারা অন্যায় করেছে তারাই শাস্তি পাচ্ছে,সেহেতু অপরাধী একজনই হতে পারে।
আবার এমনও হতে পারে তাদের একটা গ্যাং আছে, হয়ত তা দিয়েই তারা যোগসূত্র স্থাপন করে ক্রাইম গুলো করছে।
আবার তিনি ভাবেন না না, আলাদাই হবে। কারণ অন্য জেলার একজন পুরুষকে মুখে এসিড ছোড়া হয়েছে।
তার মানে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এক সাথে তো আর করা যাবে না।
আবার এমনও হতে পারে পুরো দেশ ব্যাপী ছড়িয়ে আছে তাদের গ্যাং!
.
এইসব ভাবতে ভাবতে গোলক ধাধায় পড়ে তার মাথা হয়ে যায় হ্যাং!
এত কেইস সলভ করল আর এগুলারই কোনো কিছু বের করতে পারছেন না!
যেসব ভাবছেন সব আবার গুলিয়ে সেই একি জায়গায় ফিরছে, মনে হয় তিনি গোলক ধাঁধায়, বারবার একি জায়গায় ঘুরছেন!
এগুলো ভাবা বাদ দিয়ে তিনি আপাতত মনোযোগ বাইকারের ওপর ফিরান, কে সেই বাইকার?
তাই সে রাস্তার সব হেলমেট ওয়ালা বিবরণের ঐ গেট আপের সবাই কে চেক করছেন।
তার ধারণা,আচ্ছা ঔ বাইকারই আবার এক নয় তো যে গরম তেল আর গরম পেট্রোল ছুঁড়েছে?
.

রূপসীনা খুকু

আসসালামু আলাইকুম, আমি খুকু, অদক্ষ হাতে হাবিজাবি লিখি আর সেটাই শেয়ার করছি আপনাদের সাথে! আশা করি ভালো লাগবে! :-D

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close