নন ফিকশন

প্রত্যাশিত নারী (পর্ব- ১০)

এবার লাবণ্য তার মুখ খুলল,তার মুখ দেখে নিলয় যেন জমে গেল।
এই সেই লাবণ্য, যে কিনা ছিল নিলয়ের ভালোবাসা।
নিলয় আর লাবণ্যের ভালোবাসা লাবণ্যের বাবা-মা মেনে নেন নি, তারা ছিল কোটিপতি।
সমস্যা ছিল নিলয়ের চাকরি নিয়ে। ঘর জামাই করে রাখতে পারবে তারা, কিন্তু পুলিশ জামাই তাদের চাই না। একমাত্র মেয়ের লাইফের সিকিউরিটি থাকবে না, আর তারা সেখানেই বিয়ে দিবে? অসম্ভব!
চাকরিটা ছাড়া নিলয়ের জন্যও অসম্ভব ছিল কারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের হাল ধরার সময় এসেছিল,আর অনেক কষ্টে পেয়েছে এ চাকরি টা। ছেড়ে দিয়ে আর পাবে কি না তার নিশ্চয়তা ছিল না।
লাবণ্য বলেছিল অবশ্য পালিয়ে যেতে, কিন্তু দুজনের পরিবারের মান সম্মান যাবে জন্য নিলয় আর তা করেনি।
আর তাছাড়াও লাবণ্য তার বৃদ্ধ বাবা-মার একমাত্র সন্তান, সে পালিয়ে গেলে তাদের কি হবে, এ চিন্তায় তাদের বিয়েটা আর হয়নি..
কিন্তু সে এখানে কেন? কিভাবে?
মনে মনে প্রশ্ন করতে করতেই লাবণ্য বলে,
” আমার স্বামী ছিল ভন্ড আর প্রতারক, শুধুমাত্র সম্পত্তির লোভ আমার বাবা-মাকে পটিয়ে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত সাজিয়ে এসে আমাকে বিয়ে করেছিল।
বছর না ঘুরতেই আমার মা কে কফির মধ্যে কিছু একটা খাইয়ে মেরে ফেলে যাতে মনে হয় সে হার্ট এ্যাটাক করেছে। মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী তাই এসেছিল।
তার দুইমাস না যেতেই সে আমার বাবার গলায় বাতাস ইনজেক্ট করে বাবাকে মেরে ফেলে, ফলে তারও সেইম রিপোর্ট আসে।
বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সব সম্পত্তি যখন আমার হয়ে গেল তখন সে স্ট্যাম্প রেডি করে বেশ কয় দিন আমাকে সিগনেচার করতে বলেছে।
আমার সন্দেহ হলে আমি নীলাকে জানাই।
সেদিন নীলা আমার বাসায় মিট করতে আসে, সে যাওয়ার পথে আমি যখন তার সাথে ফোনে কল করি, আমার স্বামী পেঁছন থেকে আমার মাথায় ফুলদানি দিয়ে জোরে মারে এবং মা-বাবাকে যে সে ই মেরে ফেলেছে এ কথা স্বীকার করে। এবং বলে আমি যদি এখন সিগনেচার না করি তাহলে আমারও সেইম পরিণতি হবে। আর আমারও রিপোর্ট আসবে হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যু!
আমি শরীরের আঘাতে যতটা না তখন কাবু হয়েছিলাম সেদিন, তার চেয়েও বেশি কাবু হয়ে গেছিলাম আমার মা-বাবার খুনের কথা শুনে।
আমার কপাল ভালো ছিল নীলা তখন ফোন রিসিভ করেছিল আর ফোনটা পড়ে গিয়েও ভাঙেনি,যার ফলে নীলা সব শুনতে পেয়ে আবার দ্রুত ব্যাক করে।”
কথাগুলো বলে আবেগ প্রবণ হয়ে পরে লাবণ্য।
তারপর আবার শুরু করে নীলাশা।
“আমি ফোনে সবটা শুনে দ্রুত সেখানে যাই, গেইট আমি আর বর্ণা আপু মিলে ভেঙে ফেলি। ঐ পশুটাকে এমনভাবে ঘায়েল করি যে তিনমাস বেডে ছিল।
লাবণ্য যখন রিলিজ পায় হাসপাতাল থেকে, সেদিন হাসপাতালে মায়াকে পাই, ওর মা,ভাই মারা গেছে কিন্তু সে তখনও জীবিত ছিল।
টাকা আর আত্মীর জন্য তার চিকিৎসা হচ্ছিল না,আমি তার দায়িত্ব নিয়ে সুস্থ করিয়ে তার গল্প শুনি।
ব্যাস তাকেও আমার গ্রুপে নিয়ে নেই।
তারপর সুমাইয়ার সাথে দেখা হয় যখন সে ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল।
তার করুণ কথা আমাকে যেমন কাঁদিয়েছে তেমনই রাগিয়েও তুলেছিল।
তার ঝলসানো মুখ ঠিক করা বাদ দিয়ে তাকেও ট্রেইনিং দিতে থাকি।
কি শিখেনি আমার টিম!
সব, সব জানি এখন আমরা। আমরা যেখানে বাই সাইকেল ঠিকমত চালাতে পারতাম না, সেখানে আমরা বড় বড় বাইক চালাতে জানি।
মার্শাল আর্ট,ক্যারাটে সব পারি।
না খেয়ে তিন দিন বেঁচে থাকাও শিখে গেছি।
ঘন্টার পর ঘন্টা জিম করি।
আমরা সবাই এতটাই পারদর্শী যে একাই ৪-৫ জনকে মারতে পারি!
শুধু তাই নয়, রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার,তথ্য প্রযুক্তি সবটাই মোটামুটি পারে আমার টিমের মেয়েরা।
এই যেমন ধরুণ, ঐ রিক্সাচালককে কিন্তু একদম লঘু এসিড ছুঁড়েছি, যদি তীব্র এসিড দিতাম তাহলে তার সেনসিটিভ পার্ট নষ্ট হয়ে সে মারা যেত, তাই আমি তাকে বাঁচিয়ে রেখে শাস্তি দিয়েছি মাত্র!
সবাইকেই শুধু শাস্তি দিয়েছি, যে যেমন করেছে তাকে সেভাবেই শাস্তি দিয়েছি।
প্রিন্সকেও মারতাম না যদি না সে রাইশা কে মারত।
আপনাদের জ্ঞাতার্থে বলি, লাবণ্য আসার পর সব খরচ সে ই দিয়েছে, নিজেও সবটা শিখেছে আর আইটি এক্সপার্ট হয়ে সব অপারেশন কন্ট্রোল করেছে।
“লাবণ্যের স্বামী তাহলে কোথায়?” -রায়ান
“তাকে মেরে তিনমাস একটা ঘরে রেখেছি, সুস্থ হওয়ার পর তাদের ডিভোর্স করিয়ে তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছি। তার ডান হাত আর বাম পা অকেজো। ওভাবেই ভিক্ষা করে দিন পার করছে।
এর আগেও নাকি দুজনের সাথে এমন করে পালিয়েছে, তার পেশা ছিল ওটা”- নীলাশা।
-কিন্তু লাবণ্যের বাবা-মার উচিত ছিল খোঁজ নিয়ে তারপর বিয়ে দেবার।
-দেখুন মি. রায়ান তারা দুজন আর কতই বা খেয়াল করতে পারে,আর তাছাড়াও যথেষ্ট ধান্দাবাজ ছিল ঐ লোক।
আঙ্কেল- আন্টি তাদের কৃতকর্মের শাস্তি পেয়েছে তার হাতে খুন হয়ে।
এখন আর তাদের দায়িত্বের কথা না বলাটাই শ্রেয়।

আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু রিক্সাচালক কেও কি আপনারা মেরেছেন?
-হুম, মারিনি, শাস্তি দিয়েছি।
আমিই দিয়েছি।আমরা সব সময় নিজের সেইফটির সব রকম জিনিস ব্যাগে নিয়ে ঘুরতাম।এসিড ও থাকত,চাকু-ছুরি সব, সব থাকত।
আমাকে সেই দিন ঐ রিক্সাচালক বাজে একটা কথা বলেছিল তার নিম্নাঙ্গ সম্পর্কে।
হুট করেই যেন চলে গেলাম আমি আমার অতীতে, যে কষ্ট আমি এতবছর বয়ে নিয়ে বেরিয়েছি, রাগে কষ্টে চিৎকার দিয়ে সেদিনের সহ আজকের প্রতিশোধ নিয়েছি, তার নিম্নাংশে এসিড ছুঁড়ে দিয়েছি। তার হয়ত শান্তিই হয়েছে, খুব শখ ছিল না!
-তাই বলে আপনি সোজা এসিড ছুঁড়বেন?
এটা বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে না আপনার?
-বাড়াবাড়ি?
কিসের বাড়াবাড়ি?
আপনি মানুষের স্বভাব সম্পর্কে জানেন?
ঐ রিক্সাচালক রোজই কোনো না কোনো মেয়ে,নারী অথবা মা কে এভাবেই হ্যারাজ করে যাচ্ছে, তাইতো সে খুব ইজিলি বলে দিয়েছিল সেদিন, আর বলে খুব গর্ব নিয়ে হাসছিল। সে হয়ত ভেবেছিল আমিও আর পাঁচটা মেয়ের মত চোখে জল আর বুকে কষ্ট নিয়ে নিঁচু মাথায় চলে যাব, যে নিঁচু মাথা তার আরো গর্বের হবে।
কিন্তু না, একসময় আমিও তেমন কষ্ট নিয়ে মাথা নিঁচু করে চলে এসেছি।
সে তো জানত না বর্তমানের নীলাশা প্রতিবাদের বিষের নীলে একম নীল হয়ে আছে।
তাই তাকে এসিড দিয়ে তার সেই বিজয়ের হাসিটা আমি হেসেছি!
.
কথাগুলো বলতে বলতে নীলাশাে চোখগুলো আগুনের মত হয়ে গেল, কান্নার সাথে হেসেও ফেলল। কেমন যেন ভয়াবহ মনে হচ্ছিল তাকে।
এরপর আবারো তাকে জিজ্ঞেস করল, তাহলে বাইকার অনার্স পড়ুয়া ঐ ছেলের এমন দশা কেন করল?
এবার মায়া বলল,
-আমি করসি, ক্যান ভালো হয় নাই?
ঐ পোলা শিক্ষত হইতে পারে না, কুলাঙ্গার একটা।
আমি সেদিন মাথায় ওড়না দিয়া যাচ্ছিলাম, সে আমাকে কইসিলো চলো চিপায় গিয়ে আমি তোমাকে ভালোভাবে দেখি আর তুমিও দেইখো।
তাই আমিও চইলা গেছিলাম।
সে তো চিপায় গিয়া কাপড় খুলতে ব্যাস্ত আছিল আর আমি পিন বের করতে, আমার দিকে হাত বাড়াতেই ভইরা দিসি তার চোখে পিন। তার বিশেষ জায়গার খুব তেজ আছিল না?, দিয়া দিসি খুব তেজের সাথে সেইখানে লাত্থি মাইরা, পিনও দিসি!
তার খুব সখ আছিল না পথে ঘাটের মাইয়াদের দেখতে?
তার সখ মিটায়া দিসি, এই জন্মে হের আর এমন সখ হইব না আমি লিক্ষা দিতে পারুম।
-বাপরে!
এত ডেন্জারাস তোমরা!
আইনি পদক্ষেপ নিলেও তো পারতে তোমরা।

হাসাইলেন ছার, আপনারা কিছু করতে পারেন?
আপনারা ট্যাকা চেনেন শুধু।
অবশ্য সেই দিন যদি আমি টাকা দিতাম তাইলে মনে হয় কেইস লিখতেন।

আচ্ছা এসব বাদ দাও। পুলিশ কে আর মুরুব্বি কে আক্রমণ করল?
নীলাশা বলল, “ঐ পুলিশ রাইশার কেইস না নিয়ে উল্টা বাজে বাজে কথা বলেছে রাইশার সম্পর্কে, স্যারকে অপমান করেছে। তাই যে মু্খ দিয়ে সে ওসব কথা বলেছে সেই মু্খে আমি নিজ হাতে থানায় গিয়ে গরম পেট্রোল ঢেলে এসেছি!
এবার নিশ্চয়ই আমার সাহস নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকবে না!”
এদিকে বর্ণা বলল, “আমরা রাস্তায় ঠিকই ঘোরাঘুরি করতাম, কখনো বাইকে, কখনো বা স্কুটিতে। সেদিনের বাইকার আমি ছিলাম, ঐ মুরব্বি বলছিলো চায়ের দোকানে, মেয়েদেরই নাকি এসব নির্যাতন মানায়। একটা পুরুষকে কোন আক্কেলে নির্যাতন করে এই প্রশ্ন করে হেব্বি ভাষণ দিচ্ছিলো।
তার ভাষ্যমতে, একটা পুরুষের এমন নির্যাতন হলে তার বৌ-বাচ্চাদের কে খাওয়াবে! মেয়েরা হলে তো আর কারো ক্ষতি হবে না। আমার মাথা বিগড়ে গেল, দিয়ে দিলাম তার ঐ মুখে গরম তেল!
আচ্ছা মেয়েদের কেন মানাবে নির্যাতন বোঝান তো আমাকে!
একটা মেয়ে যখন ধর্ষিত হয় তখন তার সাথে যেন ধর্ষিতার ট্যাগ লেগে যায় তার পুরো পরিবারে।
সবাই আলাদা করে রাখে তাদের, এটা তারা জানে মেয়ের দোষ নেই তবুও বাজে কথা, বাজে ব্যবহারটা করে পুরো সমাজ তাদের সাথে। একজন নারী শুধু কখনো নারী হয় না, সে একজন মা-বাবার মেয়ে, কারো বোন, কারো স্ত্রী অথবা মা হয়।
সেই ধর্ষিতার সাথে এই এতগুলো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়।
তাহলে কেন সবার কথা ‘আহা পুরুষটার ক্ষতি না হলেও পারত’
এইযে আমাদের জন্য এখন পুরো দেশের মানুষ প্রতিবাদী হইসে,তাতেও অনেকে এই উক্তি করেছে, পুরুষের নাকি পরিবার অসহায় হবে, কেন নারীদের হয়না?
যখন তার পরিবারকেও এসব শুনতে হয় তখন তারাও ক্ষেপে গিয়ে নিজেদের মেয়ের সাথে বাজে ব্যবহার করে, তখন না মরে আর উপায় থাকে না।
এত এত যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় মেয়েদের।
“আচ্ছা বুঝেছি, এগুলো আসলে মনের ব্যাপার, নৈতিকতার ব্যাপার।”- বললেন রায়ান।
সাথে আরো বললেন,

সবই তো বুঝলাম শুধু।নাসিমা বেগমের স্বামীর কথা বাদে!
নীলাশা বলল, “আন্টিকে রোজ যেভাবে নির্যাতন করত, তাকেও সেভাবেই মেরেছি, বুঝুক কেমন লাগে।
আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধুর মা নাসিমা আন্টি।
যখনই তাদের বাসায় যেতাম আন্টির হয় কপাল ফাটা, নয়ত গালে চড়ের দাগ, কখনো হাত ফেটে যাওয়া, অথবা ঠোঁট কাটা এসব দেখতাম।
একদিন তো আমরা ওদের বাসায় থাকতেই রুমের দরজা বন্ধ করে তার স্বামী তাকে বেধড়ক পেটালো। অাঙ্কেল বের হওয়ার পর গিয়ে দেখি সারাপিঠে বেল্ট দিয়ে মেরেছে।
এতদিন আন্টিকে জিজ্ঞেস করলে আন্টি বাহানা দিয়ে মিথ্যে বলত। সেদিন আর লুকাতে না পেরে সবটাই বলেছিল আমাকে।
সংসার আর সন্তানের মায়ায় কাউকে কোনদিন নালিশ দেন নি।

আমার ইচ্ছা করছিল সেদিনই ঐ পশুটাকে দেই,কিন্তু আমার উপায় ছিল না। যখন আমি সুযোগ পেলাম তখন হাতছাড়া করিনি।
আমি জানতাম আন্টি জেগে থাকলে কখনোই তার স্বামীকে মারতে দিত না,দয়ার শরীর তার।
তাই বাসার সব মেম্বারদের সাময়িক অজ্ঞান করে তাকে দিয়েছি ধোলাই।
একদিনের ধোলাইয়ে তার এত কাহিল অবস্থা তাহলে সে ভাবুক নাসিমা আন্টির কেমন লাগত?
সারাদিন গাধার মত খাটা খাটনি করে আবার প্রতিদিন উনিশ থেকে বিশ হলেই এত অত্যাচার করত।
আন্টি এও বলেছেন, তার কোনো কারণ থাকত না মারার। ইচ্ছে হলেই মারত, বাইরে কিছু হলেও মারত।
এখন বলেন ভুল কিছু করেছি?
আমি আমার ঐ পশু ফুফাতো ভাইকেও ছাড় দেইনি।
তারও দুহাত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে একদম থেঁতো করে দিয়েছি। আমি জানি বেঁচে থাকতে সে আর এমন কারো সাথে করার দুঃসাহস পাবে না!”
এবার কাশেম স্যার জিজ্ঞেস করলেন কে এসিড দিয়েছে ঐ লোকের মুখে এবং কেন?
সুমাইয়া মুখের পর্দা সরিয়ে তার ঝলসানো চেহারা দেখালো। সবাই ভয় পেয়ে গেল।
আর কিছু প্রশ্ন থাকল না, সবাই বুঝে গেল সুমাইয়া তার প্রতিশোধ নিয়েছে..
.
নোয়েল বলল তারা বাসা থেকে ডিরেক্ট কেন বাইক নিত না?
অন্য খানে গিয়ে কেন চেইন্জ করত?
নীলাশা হেসে বলল, “সতর্কতার জন্য,যাতে কেউ ধরতে না পারে কোথাকার বাইকার। আর আমরা বুঝতে পেরেছিলাম আপনারা সন্দেহ করেছেন, তাই জায়গা বদলেছি।
যখন বুঝতে পেরেছি আপনারা হাসপাতালে সিসি ফুটেজ লাগিয়েছেন, তখন আর যাই নি হাসপাতালে।
কিন্তু আমরা লাস্টবার জানতাম না, তাই আপনারা ধরতে পেরেছেন।
তবে রায়ান সাহেব আপনার প্রশংসা সত্যি না করে পারছি না!
আপনি আমাদের পুরাণ বাসাটা কেন সন্দেহ করেছিলেন?”
রায়ান হেসে বলল, “শুধু নিজেরাই চালাকি করবেন তা তো হয় না!
যদিও আপনাদের আমি তদন্তের ব্যাপারে বলতে বাধ্য নই আর জানানোর প্রয়োজনও নেই তবুও বলছি।
‘আমি নারী বলছি’ এই ফেসবুক আইডি টা নিশ্চয়ই অাপনাদের মধ্যে কারোর?
আমি খুব ভুল না করলে, এটা নীলাশা জান্নাতের, রাইট?
প্রিন্সদের ঘটনার পরই আপনাদের লোকেশন ট্র্যাক করে আপনাদের ওপর নজর রেখেছি। অতঃপর আমার সন্দেহ ই সঠিক হলো!
আচ্ছা মিস নীলাশা, আপনি একা এক বাড়িতে কেন থাকতেন?”
” যেদিন থেকে আপনাদের কাছে হাজিরা দিতে হত সেদিন থেকেই।
আমরা ফুললি প্রিপারেশন নিয়ে তবেই মাঠে নেমেছি।
শুধু একটা না, তিন চারটা বাড়ি আমরা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছি যাতে আমাদের কেউ ধরা পড়লে বা আমাদের ওপর নজর পড়লে আলাদা থাকতে পারি, যাতে পুরো টিম না ধরা পড়ে।
তাই একা ছিলাম।
আমি জানতাম আপনি অনেক চতুর, আর আমার ওপর সম্পূর্ণ নজর রাখতে পারেন, এইজন্য যাতে আপনার সন্দেহ না হয় তাই সবার আশা যাওয়া বন্ধ করেছিলাম, একদিন অবশ্য বর্ণা আপু বাইকে করে আমাকে রেখে গেছিল, সেদিনই মানা করলাম, কারণ এতে বাকিরাও ফেঁসে যেতে পারে।
আমাদের টার্গেট ফুল না হওয়া পর্যন্ত আমরা খুব সতর্ক ছিলাম, যার জন্য আপনারা কেউ ধরতে পারেন নি!”-বলল নীলাশা।
.
সব রহস্য উন্মোচন হলো, সবাই সবটা জেনে গেল।
কোর্টে নীলাশা সহ সবার কেইস উঠল।
তাদের নামে কেইস হওয়ায় পুরো দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। সারাদেশব্যপী আন্দোলন করল নারী সমাজ, গুটি কয়েক পুরুষও ছিল, যাদের মধ্যে রহমত স্যার এবং তার মত অনেকেই। সবার একটাই দাবী তাদের বিনা শাস্তিতে সসম্মানে মুক্তি।
কোর্টে যেদিন তাদের বিচার হবে সেদিন তাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তাদের কি মত।
মায়া বলেছিল- আমার প্রতি সব অন্যায়ের বিচার করেন, আমার মরা মা, ভাইরে ফিরায়া দেন, আমার ইজ্জত ফিরায়া দেন।
যদি দিতে পারেন তাইলে আমাকে শাস্তি দেন, আর যদি তা না পারেন তাহলে আমাকে সহ নীলা আপারেও ছাইড়া দেন।
কন জজ সাহেব, দিবেন?
পারবেন আমার মা ভাইরে ফিরায়া দিতে?
.
লাবণ্য বলল- আমারও একই কথা, আমার মা-বাবকে ফিরিয়ে দিন ইউর অনার!
তারপর না হয় শাস্তি দিবেন!
.
সুমাইয়া তার মুখ থেকে কাপড় ফেলে বলল- হয়ত আমার ঝলসানো মুখ সার্জারি করে ঠিক করতে পারবেন, তবে আমার আগের চেহারা, আমার মনবল, আমার কষ্ট, আমার প্রতি অবিচার এসব কিছুই ফেরাতে পারবেন না মাই লর্ড।
আমি বিচার চেয়ে অাপনাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলাম, সেদিন তো আমাকে আপনারা আমার প্রতি অন্যায়ের বিচার দেন নি, ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
তবে আজ যখন আমি নিজে নিজের বিচার করে নিয়েছি তখন কেন এসব বিচার হচ্ছে?
আগে কেন হয়নি?
অপরাধীদের শাস্তি হলেই আপনাদের আইন কেন ভেসে ওঠে?
মজলুমদের সময় আপনাদের আইন কোথায় থাকে মাই লর্ড?
জজ সহ পুরো কোর্ট থমকে গেছে। কারো কাছে এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর নেই।
.
জাজের কাছে রাইশা, নাসিমা বেগম এবং অনান্য সব ডিটেইলস্ জানানোর পর জাজ নিজেও বেশ ইমোশনাল হয়ে পড়ে।
লাস্টবার নীলাশা জান্নাতকে জিজ্ঞেস করা হয়, ওনার মন্তব্য কি এবং উনি কি চান।
নীলাশা বলে- আমার কিছুই বলার নেই।
এমন নয় আমি আগেই সবাইকে শাস্তি দিয়েছি, সব গুলোই আগে আইনি ভাবে বিচার চেয়েছি, যখন পাই নি, আইনের কাছে হতাশ আর ঘৃণা থেকেই করেছি।
আপনারা আইন ঠিক করুন, অপরাধীদের শাস্তি দিন, ভিক্টিমদের কথা শুনুন।
স্বচ্ছতা সৃষ্টি করুন আইনে।
আর কেউ যেন পশুদের কুনজরে না পরে।
শাস্তি দিন সব রকম ধর্ষকদের। যারা চোখ, মুখ এবং শরীর দিয়ে ধর্ষণ করে।
আমার শেষ কথা একটা, মেয়েরা তোমরা নিজেদের এমন ভাবে তৈরি কর যেন ৫-৬ জনকে তুমি একাই প্রতিহত করতে পার। নিজেকে এমন ভাবে গড়ে তোলো যেন সবার প্রত্যাশিত নারী হতে পার। যাকে সব সময় মানুষ স্মরণে রাখবে, আদর্শ হিসেবে মানবে।
প্রিয় পরিবার গুলো, আপনারা আপনাদের ছেলেদের সুশিক্ষিত করুন, শুধু পড়ালেখায় নয়, সবাই যেন প্রকৃত মানুষ হয়, প্রত্যেক নারীকে যেন সম্মান করে।
আর মেয়েদের সাপোর্ট করুন প্রতিটি মুহূর্তে।
দেশে যেন একটাও ধর্ষক না থাকে।
মমতায় ভরে থাকুক আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
সোণার বাংলা যেন সত্যিকার অর্থেই সোণার হয়,শান্তির এবং স্বাধীনতার হয়..
জাজ নিজেই বলে, “তোমার মত মেয়েরই প্রত্যাশা করি আমি, পুরো দেশ।
তুমি ই আমাদের সেই প্রত্যাশিত নারী!
ওয়েল ডান নীলাশা!
তবে আমি তোমাকে এই স্পেশাল পাওয়ার দিচ্ছি, শাস্তির পর জেল খেটেও চাইলেই তুমি সরকারি চাকরি করতে পারবে।”
.
রায়ান সাহেব যেহেতু উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা,তাই উনিও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন যেন তাদের শাস্তি না হয়।
এদিকে পুরো দেশের নারী শক্তি। কাজের লোক থেকে বড় বড় ডাক্তার, উকিল মহিলা জাজ সবার চাওয়াতে অবশেষে তাদের শাস্তি মওকুফ করা হয়।
তবুও আইন নিজের হাতে তুলে প্রিন্সকে মেরে ফেলার জন্য তাদের দু’মাস কারাদন্ড দেয়া হয়।
সেই সাথে প্রিন্সের বাবা কাউন্সিলর ও ঐ থানার পুলিশকে বহিঃস্কার করা হয় সারাজীবনের জন্য।
প্রতিটি ভিক্টিমের আবার শাস্তি হয়। তারা সুস্থ হওয়ার পর তাদের সবাই কে জেলে আনা হয়।
সাথে রহমত স্যারক সসম্মানে আবার চাকরি ফিরিয়ে দেয়া হয়, সুমাইয়ার চেহারা ঠিক করা হয়, মায়ারও পড়ালেখা এবং নির্বাসন ব্যাবস্থা করা হয়।
.
নীলাশারা সবাই শান্তিমত কারাদন্ড কাটায়, কারণ তাদের প্ল্যান সব সাকসেস হয়েছিল ঠিকমত।
উপরন্তু দেশের প্রতিটি মেয়েই শক্তিশালী হয়ে গেছে,প্রতিবাদ করছে।
ধর্ষণ কমে এসেছে দেশে।
.
নীলাশা নতুন করে নারী শক্তি জাগরণের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হয়,এবং অনন্য দৃষ্টান্ত হয় অপরাধী ছাড়া আর কারো ক্ষতি না করে।
.
দুমাস জেলে থেকে ছাড়ার পর সবাই ফুল নিয়ে তাকে বরণ করে, স্পোশালি রায়ান।
সে চকলেট,আইসক্রিম দিয়ে মাইশার সাথে করে তাকে রিসিভ করে।
নীলাশার সাহসিকতা এবং স্বচ্ছতার জন্য রায়ান তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এবং সাথে কথা দেয় সারাজীবন তার সাথে থাকবে,তার প্রতিটি কাজে সাহায্য করবে।
নীলাশা না করে কারণ তার দলের মেয়েরা একা হয়ে যাবে তাই সে বলে বিয়ে না করার সিধান্ত নিয়েছে সে।
রায়ান বলে বিয়ের পরও সে তার কার্যক্রম চালাতে পারবে নির্দিধায়।
তাই অবশেষে নীলাশা রাজি হয়ে যায় এবং বিয়ে হয় তাদের দুজনের।
মাইশা সবচেয়ে বেশি খুশি হয় তাতে।
এদিকে লাবণ্য আর নিলয়ের বিয়ে দেয় নীলাশা। ফলে তারাও সুখে শান্তিতে থাকে।
.
এতকিছুর মাঝেও বাদ যায়নি তাদের কার্যক্রমের।
প্রত্যাশিত নারী তৈরির কারখানা নামে তারা ট্রেইনিং সেন্টার খুলে যাতে বিনামূল্যে প্রতিটি নারী শিক্ষায়,দীক্ষায় নিজেদের গড়ে তুলে।
জয় হয় প্রতিটি নারীর, সবাই হয়ে যায় সেই প্রত্যাশিত নারী..
_সমাপ্ত

রূপসীনা খুকু

আসসালামু আলাইকুম, আমি খুকু, অদক্ষ হাতে হাবিজাবি লিখি আর সেটাই শেয়ার করছি আপনাদের সাথে! আশা করি ভালো লাগবে! :-D

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close