গল্প

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে,রয়েছ নয়নে নয়নে!

কাল্পনিক ঘটনা-

মৃত্যুশয্যায় হুমায়ূন! পাশে শাওন আর পুত্র নিষাদ! একটু পর পর নিষাদ বাবার পায়ের আঙ্গুলের মধ্যে সুঁতো বাঁধার খেলা করছে।নুহাশ পল্লীর ম্যানেজারের ঘর থেকে সুঁতোর সাথে ছোট একটা কাঁচি নিয়ে এসে তা দিয়েও কাটাকুটি খেলা চালিয়ে যাচ্ছে!
শাওন কেমন যেন একদৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটুকরো রোদ তার মুখে এসে পড়ছে।দেখতে ঠিক যেন স্বর্গের অপ্সরাদের মত লাগছে! মানুষের সৌন্দর্য বয়স হওয়ার সাথে সাথে একটু একটু করে কমতে থাকে। আর এই মেয়েটা! এই মেয়েটা যেন দিনকেদিন পাল্লা দিয়ে আরও সুন্দর হয়ে উঠছে! ইশশ! এই সবকিছু ছেড়ে কত দ্রুতই না তাকে চলে যেতে হচ্ছে! আর কয়েকটা দিন বেঁচে থাকলে কি-ই বা এমন ক্ষতি হত? শুধু একটু অক্সিজেনই যা অপচয় হত আরকি!

– তোমার মনে আছে,প্রথম যেদিন নুহাশপল্লীতে বেড়াতে আসি সেদিন কি বৃষ্টিটাই না হয়েছিল!
– উঁ!
– কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে?
– একটু একটু।
– বুকের ব্যথাটা কি এখনো হচ্ছে?
– বুঝতে পারছি না। একটু পর পর কেমন যেন খালি খালি লাগছে বুকটা!
– ঠিক আছে! তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো! আমি ম্যানেজারকে দিয়ে সবার কাছে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি! ওরা এক্ষুনি চলে আসবে হয়তো!
– শাওন! আমি যে মারা যাচ্ছি তুমি বুঝতে পারছো?(কেমন শ্লেষা জরিত কন্ঠে বললো হুমায়ূন)
– কে বললো তুমি মারা যাচ্ছো? তুমি তো মারা যাচ্ছো না! তুমি একটা নতুন চরিত্রের জন্ম দিতে যাচ্ছো!
– বুঝলাম না!
– কি বলেছে আমিও ঠিক বুঝলাম না!
দুজনেই শব্দ করে হো হো করে উঠলো! তবে শাওন ঠিক হাসছে না কাঁদছে তা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। মেয়েটা এখনও জানালা থেকে মুখ ফেরায়নি!

– হুমায়ূন চাচা!
(দরজার সামনে রূপা দাঁড়িয়ে আছে।তার ডাক শুনেই শাওন আর সে দুজনেই তাকাল। রূপার হাতে একটা আইসক্রিমের বক্স!)
– রূপা মা! এসো,এসো! হিমু আসে নি?
(কথাগুলো বলতে গিয়ে প্রচন্ড বেগ পেতে হচ্ছে!)
– জ্বি না চাচা! তবে ও এসে যাবে। মাজেদা খালাকে ফোন করেছিলাম। বাদল নাকি ওর রুমে কাপড়-জামা খুলে একপায়ে দাঁড়িয়ে কিসব ধ্যান করে যাচ্ছে! ওকে ঠিক করতেই হিমু গেছে!
– তোমার হাতে ওটা কি গো মা?
– চাচা আপনি যে কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ খেতে চেয়েছিলেন তাই রেঁধে নিয়ে এসেছি!
– ঠিক আছে! আমি ওটা খাব। তুমি আপাতত শাওনের হাতে দাও।

রূপার ঠিক পেছন পেছন নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো আনিস।
-আরে আনিস যে! বসো বসো।
(ঘরে একটাই মাত্র চেয়ার তাও সেখানে রূপা বসে আছে।আনিস আর কিছু না ভেবে খাঁটের কোণায় গিয়ে বসে পড়ল।
– আপনার শরীর কেমন আছে চাচা?
– দেখতেই তো পাচ্ছো! এজন্যই তো তোমাদের সবাইকে খবর দিয়ে আনা।যাবার আগে সবাইকে একবার দেখে যায়!
(একনাগাড়ে এতগুলো কথা একসাথে বলে গেল। এখন আর কথা বলতে তেমন কষ্ট হচ্ছে না। বরং কথা বলতেই তার এখন ভালো লাগছে।)

দরজার সামনে আরও দুটো অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।নীলু আর মিসির আলী সাহেব!

– একি অবস্থা আপনার হুমায়ূন সাহেব? আপনি তো একেবারে জলজ্যান্ত কংকাল হয়ে উঠেছেন।
( রূপা চেয়ার ছেড়ে মিসির আলীকে বসার জায়গা করে দিল।)
-কি আর করা বলুন! এখন দেহ থেকে প্রাণটা গেলে শরীরটা আরও হালকা হবে বৈকি।
– আপনার ধারণাটা তো ঠিক না হুমায়ূন সাহেব! মৃত্যু হলেই যে মানুষের ওজন কমে এমনটা তো কথা না। গবেষণায় কিন্তু দেখা গেছে মৃত্যুর পর কিছু মানুষের ওজন বাড়েও! এই দেখুন না! মানুষ ছাড়া ভেড়ার ও তো মরার পর ওজন অনেকখানি বেড়ে যায়!
– রেহাই দেন আমাকে! আপনার সাথে যুক্তিতর্কে পারে কার সাধ্যি!
(মুচকি হাসলেন দুজনেই।নীলু রূপার সাথে ঘরের এককোণে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে আর একটু পরপর চোখ মুছছে। মেয়ে দুটো আজ নীল শাড়ি পড়েছে। তবে নীলুর টা আকাশী হবে হয়তো।ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। চোখও এখন কেমন জানি ঝাপসা হয়ে আসছে।)

– আরে হুমায়ূন চাচা! আপনার এই অবস্থা আর আমাকে একবারও খবর দেয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না! নাকি আমাকে আপনার কাছের বলে ভাবেন না?
(একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে উঠেছে বাকের। বোঝাই যাচ্ছে খুব তাড়াহুড়ো করে এসেছে সে!)
– বাকের যে! আগে একটু বসো তো!
– কি বলেন চাচা! আপনার শরীরের এই অবস্থা আর আপনি আমাকে জানাবেন না! আমি কিন্তু বিরাট মাইন্ড খেয়েছি চাচা!
– আহা! উত্তেজিত হচ্ছো কেন? মুনা কোথায়? ওকে দেখতে পাচ্ছি না!
– ও এসেছে চাচা। বাইরে নিষাদকে চকোলেট দিচ্ছে।
(বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো মুনা। কি মায়াকারা চেহারার-ই না মেয়ে! শ্যামলা বলেই কি ওর মধ্যে আলাদা একটা সৌন্দর্য এসে ভীড় করেছে?)

মুনা কোনো কথাই বললো না। সে একদৃষ্টিতে বিছানায় শোয়া মৃতপ্রায় মানুষটাকে দেখছে আর হাত দিয়ে চোখের জল মুছছে। মেয়েটার চোখের কাজল গালে লেপ্টে একাকার হয়ে যাচ্ছে!

এবার একই সাথে ঘরে ঢুকলো নবনী আর কঙ্কা। দুজনেই ছুটে এসে পাশে বসলো! কিন্তু কারও মুখে কোনো কথা নেই।

– কিগো মা-রা! কেমন আছো তোমরা?
– আমরা ভালো আছি চাচা! কিন্তু আপনাকে দেখে এখন বড্ড খারাপ লাগছে।
– ধুর পাগলি! এইতো আমি! তোদের সাথেই আছি।

-হ্যালো! আমি কি আসতে দেরি করে ফেললাম?
(দরজার সামনে চশমা ঠিক করতে করতে বলল কানাবাবা মানে আমাদের শুভ্র। পাশেই মৃন্ময়ী আর অনীল।)
– আসলে রিক্সায় উঠতে গিয়ে চশমাটা পড়ে ভেঙে গিয়েছিল। তারপর ওদের সাথে দেখা। নতুন চশমা কিনে আসতে আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে।
(একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল শুভ্র।)
– ঠিক আছে! ঠিক আছে! বসো তোমরা।

(ঘরে কোথাও বসার জায়গা নেই! অগত্যা দাঁড়িয়েই রইল সবাই!)
– শাওন!
– বলো!
– আমার কথা বলতে আবারও কষ্ট হচ্ছে! তুমি ওদের বসার একটু ব্যবস্থা করো!
– আমি দেখছি! তুমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকো!
( দুচোখ বন্ধ করতেই রাজ্যের ঘুম যেন ছুটে এলো! কিন্তু কেমন যেন অজানা ভয় ভেতরে উঁকি দিল। এ ঘুম শেষ অব্দি ভাঙবে তো!)

ঘুম ভাঙলো ঠিকই কিন্তু সন্ধ্যা মেলাবার পর।ঘরে আলো থাকা সত্ত্বেও সবকিছু কেমন যেন অন্ধকার অন্ধকার লাগছে।শুনতে পেল কানের কাছে কেউ কথা বলছে!
– চাচা, আমি মীরা! চিনতে পারছেন?
– মীরা? তুমি কি আমার উপন্যাসের কোনো নায়িকা?
(চোখ বন্ধ করেই কথাগুলো বললো)
– জ্বি চাচা! এখন চিনেছেন?

হ্যাঁ বা না কিছুই বললো না। সারা শরীর কেমন অবশ হয়ে আসছে! দু’চোখের পাথা শত চেষ্টা করেও খুলতে পারছে না! একেই কি মৃত্যু বলে? এভাবেই কি মৃত্যু হয়?
কিন্তু উপন্যাসে তো কত সহজ কিন্তু কঠিনভাবেই না সে বর্ণনা করেছে মানুষের মৃত্যুর কথা! হয়তো নায়িকা পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার হাত ধরেই নায়ক মারা যাচ্ছে।কিন্তু মারা যাওয়ার আগে একটি পুরনো ঘটনা মনে পরে যাওয়াই দুজনেই হো-হো করে হেসে উঠলো!

চোখ দু’টো যখন একটু মেলতে পারছে তখন দেখতে পেল দরজার সামনে হিমু দাঁড়িয়ে আছে। অবশেষে এসেছে সে তাহলে! পাশে একটা ছেলেও আছে। বাদল হবে হয়তো!
– হিমু!
– জ্বি!
– কেমন আছো?
– ভালো!
– আমি কেমন আছি জিজ্ঞাস করবে না?
– আপনাকে তো দেখে মনে হচ্ছে আপনি বেশ আরামেই আছেন! তবে দেখতে একটু শুটকি মাছের মত লাগছে বলে আমার হাসি পাচ্ছে!
– কি করব বলো! মরেই তো যাচ্ছি!
– সেজন্যই তো বললাম! মাছ মরার পরে শুটকি হয় আর আপনি মরার আগেই শুটকি হয়ে আছেন!
(হিমুর কথা শুনে রূপা কাছে এসে কনুই দিয়ে পেটে একটা খোঁচা দিয়ে চুপ থাকার ইঙ্গিত করলেন!)
– হিমু!
– জ্বি!
– আমার মনে হচ্ছে আমি আজই মারা যাব!
– সে কি! আজ তো জ্যোৎস্না! একটু পরেই আকাশে সুকান্তের ঝলসানো রুটি উঠবে! আমি তো আপনাকে সাথে নিয়ে তা দেখব বলেই ঠিক করে এসেছি!

এবার আর কোনো কথার জবাব দিলেন না তিনি। বুকের ভেতরটা আবার কেমন হাহাকার করছে! মাথায় বিপবিপ করে একটা শব্দ হচ্ছে! চোখ মেলে রাখতে প্রচন্ড ইচ্ছে করলেও এখন আর মেলে রাখতে পারছেন না।

– শাওন!
– বলো! কষ্ট হচ্ছে অনেক?
(শাওনের গলার স্বর কেমন অস্পষ্ট)
– হ্যাঁ! আর মনে হয় বেশি সময় নেই।নিষাদকে একটু ডাকবে?
– ও তোমার পায়ের কাছেই আছে!

ছেলেকে কাছে ডেকে তার কপালে চুমু খেলেন তিনি।নিষাদ এখনো বুঝতে পারছে না সবাই আজ কেন তাদের বাড়িতে এসেছে! তবে তার বেশ আনন্দই লাগছে!

– শাওন!
– হু!
– চাঁদটা কি পুরোপুরি উঠেছে?
– হ্যাঁ!
– তুমি সবাইকে বাইরে চলে যেতে বলো! আর ঘরের বাতিগুলো নিভিয়ে দাও!
– দিচ্ছি! তুমি চুপচাপ শুয়ে থাকো!

চারদিকে শুনশান নিরবতা! অন্ধকার ঘরে জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে কি রহস্যময়ই না একে করে রেখেছে! মানুষ যে কেন নশ্বর জীবন নিয়ে এ পৃথিবীতে আসে! প্রকৃতি কখনোই চাই না মানুষ তার সবরূপ উপভোগ করে নিক! তার জন্য সে আফসোস তৈরি করে রাখে!

– শাওন!
– বলেছি না! এখন কথা বলবে না!
– আজকের পর থেকে তো আর কখনোই কথা হবে না! এখন একটু বলিই না!
(শাওনের ফুপিয়ে কান্নার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে! তবে সে এখনো জানালার দিকে মুখ করে আছে!)
– একটা শেষ অনুরোধ করছি রাখবে?
শাওন এবারও কোনো জবাব দিল না!
– একটা গান গাইবে প্লিজ?
– কি গান?
– এই মুহূর্তে ঠিক তোমার মনে যে গান টা আসবে তাই গাইবে!

মেয়েটার কান্নার শব্দ আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে!
খোলা গলায় গান গাইতে শাওন সবসময় পছন্দ করে! তবে এখন কাঁদছে কেন?

আকাশে ভরা জ্যোৎস্না! প্রকৃতি যেন সবরূপ নিয়ে আজ পৃথিবীতে হাজির হয়েছে! সবাই দিঘির ঘাটে এসে বসেছে! চাঁদের অবয়ব দিঘির জলেও আরেকটি প্রকৃতি তৈরি করেছে! দূর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে আসছে! কার গলা বুঝতে কারও অসুবিধা হল না! আহা!
কি চমৎকার গানের প্রত্যেকটা লাইন! প্রকৃতির সাথে যেন এবার লাইনগুলো মিশে প্রকৃতি নিজেই গাইছে,
“নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে হে।।”

টপিকঃ

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close