নন ফিকশন

দ্য আলকেমিস্ট: জীবন বদলে দেয়া এক উপন্যাস!

বইয়ের নামঃ দ্য এ্যালকেমিস্ট
লেখকের নামঃ পাওলো কোয়েলহো
অনুবাদকঃটাইটান
প্রকাশকঃ মুক্তচিন্তা
প্রকাশকালঃ ২০১৬ সাল বাংলা
(ইংরেজি ১৯৯৩,পর্তুগিজ ১৯৮৮)
মুদ্রিত মূল্যঃ ২০০ টাকা
ক্যাটাগরিঃ আত্ন-উন্নয়নমূলক অনুবাদ উপন্যাস
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১১২
ব্যক্তিগত রেটিং : ৯.৫/১০

…….………………………………………………………….

      "Everything you need will come to                                                      you at the perfect time"

“স্বপ্ন”।আমি,আপনি এমনকি সবাই শব্দটার সাথে পরিচিত। তাই না?স্বপ্ন দেখে না এমন মানুষ কি খুঁজে এনে দিতে পারবেন? পারবেন না।কেননা এ পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষই তাদের স্বপ্ন নিয়ে বেচেঁ থাকে।সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না।
কিন্তু এত সহজেই কি সব সম্ভব হয়? হয়তো বলবেন যে সহজ হয় না।

একটি স্বপ্ন পূরণ কি এত সহজ? একটি লক্ষ্যে পৌঁছানে কি এতই সোজা?যদি আপনার উত্তর হয় ‘না’,তবে আপনি সম্পূর্ণ ভুল।কেননা হাজার বাধা-বিপত্তি থাকলেও আপনার স্বপ্ন পূরণ ঠিক তখনই হবে যখন আপনি আপনার লক্ষ্যে একনিষ্ঠ ও ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।আপনার লক্ষ্যের প্রতি দূরদর্শিতা আর আপনার স্থির দৃষ্টিই আপনাকে আপনার নির্দিষ্ট স্বপ্ন পূরণের দোড়্গোড়ায় পৌঁছে দিবে।
তাহলে কি বলবেন? যে স্বপ্নপূরণ নিতান্তই অতীব কঠিন কাজ??

মানুষ কেন সফল হয়? অথবা মানুষ কেন তার গন্তব্যে পৌঁছুতে পারে না? জানেন?উহু। এটা ফুটপাতে ‘আপনিও সফল হবেন’, ‘সাফল্য লাভের একশ উপায়’, ‘সহজে কোটিপতি হবার কৌশল’ – এ টাইপের কিছু না।হয়তো এতক্ষণে অনেকে এসব ভেবেও বসেছেন এসব।বা অনেকে হয়তো এও ধরে বসেছেন যে ” এই মেসেজ ২০ জনকে পাঠালে আগামীকালই আপনি হবেন শ্রেষ্ঠ ধনী”। তাই না?

কিন্তু আজ যদি আপনাদের সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই যা আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত শুধুমাত্র তার নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য।আর যদি সে হয় সাধারণ এক মেষ পালক? এই মেষ পালকের চরিত্রই আজ পৃথিবীখ্যাত করে দিয়েছেন পাওলো কোয়েলহো। কারণ, পাওলো কোয়েলহো দেখিয়েছেন যে, ‘সাফল্যের কোন শর্টকার্ট নাই।’ শর্টকার্টে লাভবান হওয়া যায় চুরি করে, ডাকাতি করে, জুয়া খেলে। যাবেন সে পথে? যাবেন না।

উপন্যাসের নায়ক হিসেবে আমরা দেখতে পায় এক কিশোরকে। স্পেনের আন্দালুসিয়ায় যার বাস।বই পড়তে জানা ছেলেটি একটু বড় হবার পর চাইল ভ্রমণে বের হবে।কিন্তু তার মা-বাবা চেয়েছিল তাদের সন্তান হবে ধর্মযাজক। তাই তার বাবা বলল, ঘুরে বেড়ানোর জন্য মেষপালক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কই সুন্দর বুদ্ধি তাই না? কিছু ভেড়া কিনে তাই সে হয়েও গেল মেষপালক। তার ভেড়ার পাল নিয়ে সে ঘুরে বেড়াতে লাগল এখান থেকে সেখানে। ভেড়ার সাথে থাকতে থাকতে একসময় সে তাদের ভাষা বুঝতে পারে- তাদের চাহিদা, অভাব, অভিযোগ সে উপলদ্ধি করে। বিনিময়ে সে পায় ধৈর্য্যের শিক্ষা। তার সময় কাটে কিছুদিন আগেই পরিচয় হওয়া ব্যবসায়ীর কন্যাকে নতুন কি গল্প শোনাবে তার চিন্তার আর স্বপ্নিল চোখে সমুদ্রের অপর পাড়ের মূর দেশের দিকে চেয়ে। স্পেনের উপকূল থেকে জাহাজে মাত্র দু’ ঘন্টার পথ। অথচ তার মতো আর কোন মেষপালকই ওখানে যাবার ইচ্ছা করেনি।

হঠাৎ করে একদিন সে স্বপ্ন দেখে গুপ্তধনের। এর মধ্যে তার সঙ্গে দেখা হয়, স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারী এক মহিলা ও নিজেকে সালেমের রাজা দাবি করা এক বৃদ্ধের সঙ্গে। যার নাম মেলসিজেদেক। সে-ও বলে, স্বপ্নকে অনুসরণ করা উচিত। আর, বিদায়কালে দিয়ে যায় সাদা ও কালো রঙের দুটো পাথর। যার প্রথমটার নাম উরিম আর দ্বিতীয়টার নাম থুমিম। যারা তাকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের পথ বাতলে দিতে পারে। এরপর থেকে তার ছুটে চলা সেই গুপ্তধনের রহস্যের সন্ধানে। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কিশোর যায় অচেনা মূর দেশে। স্পেনে আরব মুসলমানদের মূর নামেই ডাকা হয়। এক সময়কার স্পেন বিজয়ী মুসলমানরা এসেছিল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আরব দেশ হতে। সেখান থেকে সমুদ্রের উপর দিয়ে যে বাতাস আসে তাকে তারা বলে ল্যাভানটার। সে আরেক গল্প।

সদ্য আরবে এসে এক ঠগবাজের কাছে অভিযানের জন্য জমানো সব সম্পদ খুইয়ে ফেলে। এরপর সে কাজ নেয় এক ক্রিস্টালের দোকানের কর্মচারী হিসেবে। পরিশ্রমী, ধৈর্য্যশীল এই কিশোর সেখানেও তার বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা দিয়ে চমক লাগিয়ে দেয়। কিন্তু সে ভোলেনা তার স্বপ্বের কথা। সমৃদ্ধির জীবন ছেড়ে সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দেয় দুর্গম সাহারা মরুভূমি। পৌঁছে এক মরুদ্যানে। প্রকৃতির ইশারায় শান্ত, নিরাপদ মরুদ্যানকে বাঁচিয়ে দেয় ভয়ানক শত্রুর আক্রমন থেকে। পরিচয় হয় ফাতেমা নামের বেদুঈন কন্যার সাথে।তাদের ভালোবাসার বন্ধন সেখানে দৃঢ় হয়।

কিন্তু লক্ষ্য মজবুত হলে ভালোবাসা? “ভালোবাসা।” লক্ষ অর্জনের পথে আমাদের অনেকের ধারণানুযায়ী ভালোবাসা শব্দটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে! এটা ভিত্তিহীন ধারণা ছাড়া কিছুই না। কেননা,ভালোবাসা কাউকে কখনো লক্ষ থেকে সরিয়ে দিতে চায় না। কেউ যদি লক্ষ ছেড়ে দেয়, বুঝতে হবে সে ভালোবাসা সত্যি না। সেটাই ভালোবাসা, যা জগতের ভাষায় কথা বলে।আর তাই তাকে বলে বেদুঈন মেয়েরা তাদের স্বামীর জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করে থাকে। সুতরাং, সে যেনো পিছুটান ভুলে গুপ্তধনের সন্ধানে বের হয়।

কিশোর এগিয়ে যায়। পথে পথে আক্রান্ত হয়। এরপরও সে থামেনি। প্রকৃতির ইশারা থেকে ঠিক করে নেয় যাত্রাপথ। তবুও স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা এই কিশোর কখনো বিচ্যুত হয়নি তার বিশ্বাস থেকে। সে জানত তার গুপ্তধনের সন্ধান সে পাবেই। এসকল বাধা-বিপত্তি তাকে সাহস জুগিয়েছে। মরুভূমির নির্জনতা, বাতাসের মুখরতা আর ভেড়ার পালের অপরিসীম ধৈর্য্য তাকে শিখিয়েছে মহাবিশ্বের ভাষা। সে ভাষায় সে কথা বলেছে আকাশের সাথে, সূর্যের সাথে। নিজেকে পরিণত করেছে প্রচন্ড ঝড় সাইমুমে। এসকল কাজে তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে রহস্যময় আলকেমিস্ট।

অ্যালকেমিস্ট হলো এক রহস্যময় ব্যক্তি যে লোহাকে স্বর্ণে রূপান্তর করতে পারে। যে জানে মহাবিশ্বের ভাষা। ইংলিশম্যান তার সন্ধানে বছরের পর বছর ঘুরে ফেরে। লোকে বলে তার বয়স নাকি দু’শো বছর। কিশোর নায়কের লক্ষ্যের প্রতি দৃঢ় মনোবল, প্রতিজ্ঞা অ্যালকেমিস্টকে মুগ্ধ করে। কিশোরকে পথ দেখিয়ে সে পৌঁছে দেয় পিরামিডের কাছে।

দীর্ঘ উত্থান আর পতনের পর কিশোর কি তার গুপ্তধন খুঁজে পায়। তার লক্ষ্যে কি সে ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিল?

প্রেম, ভালোবাসা, যুদ্ধ, বর্বরতা, স্বপ্ন, দর্শন সব মিলিয়ে টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি করতে সক্ষম উপন্যাসের কাহিনী।
যাত্রা পথে অনেকের সাথে নতুন পরিচয় হয় সান্তিয়াগোর। ঘটে বিচিত্র সব ঘটনা। পুরো কাহিনিটি জানতে এখনই বইটি পড়ে নিন। আর যারা হতাশায় ভুগছেন, নতুন করে অনুপ্রেরণা পেতে চান তারা যতটা দ্রুতততততত সম্ভব পড়ে নিন বইটি।

বইটি পড়ার পর আপনি কমপক্ষে ৩০ টি উক্তি পাবেন।অনেকগুলো উক্তির মাঝে এই উক্তি গুলোই প্রায় সবাই দিয়ে থাকে। এই বইয়ের সবচেয়ে পরিচিত আর উল্লেখযোগ্য কিছু দর্শনঃ

১/ সূর্য উদিত হওয়ার আগের প্রহর সবচেয়ে বেশি অন্ধকার
২/ ভোগান্তির ভয় ভোগান্তির চেয়ে কষ্টকর।
৩/ কাল মরে যাওয়া আর যেকোন একদিন মরে যাওয়া একি কথা।
৪/ শিখার একটাই পথ_কাজ করা।
৫/ লোকে চলে যাবার কথা বেশী ভাবে না ফিরে আশার কথা বেশী ভাবে।
৬/ মরুভূমি কে ভালবাসা যায় বিশ্বাস করা যায় না।
৭/ সাধারনত মৃত্যূর হুমকি মানুষের মননে বেঁচে থাকার আশা বাঁচিয়ে রাখে।
৮/ তুমি যা হাতে পাও নাই তা নিয়েই যদি
ওয়াদা দিতে থাক তবে সেটা পাবার আশাই চলে যাবে।
৯/ ভবিষ্যৎ জানতে চাই কারণ আমি একজন মানুষ।
১০/ যখন কেউ অন্যের লক্ষ্যে হস্তক্ষেপ করে তারা কখনো নিজেরটুকু পূরণ করতে পারে না।

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ

অতি সাধারণ ভাবে লেখা অসাধারণ একটি বই “দ্য এ্যালকেমিস্ট”।রোমাঞ্চে ভরপুর পুরো উপন্যাসটি।বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় অংশটি হচ্ছে ‘মুখবন্ধ’।এতে আমাদের প্রায়শই ঘটে যাওয়া ভুল যার কারণে আমরা সফল হতে পারি না তার সুন্দর বর্ণনা করা আছে। যদি সম্ভব হয়, বইটির ইংরেজি ভার্সনটা পড়বেন। বাংলায় বেশ কয়েকটি অনুবাদ হয়েছে কিন্তু কোনটাই ইংরেজির মতো হয়নি। আসলে একেক ভাষার আবেদন একেক রকম। ইংলিশ টেক্সট খুবই সহজ এবং সাবলীল। এমনকি ইংরেজিতে পটু না থাকলেও ত পড়তে মোটেই কষ্ট হবে না। সব মিলিয়ে এক্ কথায় অসাধারণ লেগেছে।

লেখক পরিচিতিঃ

লেখক পাওলো কোয়েলহোর জন্মঃ ২৪ আগস্ট, ১৯৪৭। ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেইরো’তে। ছেলে অল্পবয়সে লেখক হতে চেয়েছিল শুনে তাঁর মা বলেছিলেন, “My dear, your father is an engineer. He’s a logical, reasonable man with a very clear vision of the world. Do you actually know what it means to be a writer?”
অবশ্য, এর পরের ইতিহাস বিস্ময়কর। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তাঁর দ্য এ্যালকেমিস্ট উপন্যাসটি এখন পর্যন্ত ৮০টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। আর, এমন একটি রেকর্ডের কারণে স্বাভাবিকভাবেই জীবিত লেখক হিসেবে গিনেস-বুকে ওঠে গেছে ঔপন্যাসিকের নাম। আর, এই বইয়ের বিক্রি? ৮৩ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে।
পাউলো কোয়েলহো, ব্রাজিলের বিখ্যাত লিখক। দ্য আলকেমিস্ট তার সেরা কাজ। সারা বিশ্বে তুমুল জনপ্রিয় এই বইটি অনুবাদ হয়েছে ৮০ টিরও বেশি ভাষায় এবং আজো সর্বজনে সমাদৃত।উল্লেখ্য যে তিনি “দ্য এ্যালকেমিস্ট” বইটি মাত্র দু’সপ্তাহে লিখেছিলেন বলে জানা যায়।

হ্যাপি রিডিং

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close