রিভিউ

দেয়ালঃ ইতিহাসের মননে গড়া এক ভিন্নধর্মী উপন্যাস

বইয়ের নামঃ দেয়াল
লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
ক্যাটাগরিঃ ইতিহাস আশ্রিত রাজনৈতিক উপন্যাস
প্রকাশনাঃ অন্যপ্রকাশ
প্রকাশকালঃ অমর একুশে বইমেলা, ২০১৩
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৯৭

………………………………………..
” ইতিহাস নেবে তোমরা?
বাংলার ইতিহাস!
সরলা, সুন্দর এক ইতিহাস!

কণ্ঠে কন্ঠে পোড়া বাঁশির ইতিহাস
কত্ত নেবে? তিরিশ লক্ষ ইতিহাস আছে,
আছে নয় মাস গর্ভধারণের ইতিহাস,
আছে মায়ের চোখে জল
বাবার বোবা কান্নার ইতিহাস।
আছে মুক্তির ইতিহাস
আরও কত যে ইতিহাস! ”

হরিশংকর রায়ের ইতিহাস কবিতার প্রথম ২ স্তবকেই জানান দেয় যে,আমাদের এই চিরচেনা বাংলার কত ইতিহাসই না রয়েছে।
কিছু ইতিহাস আজও টিকে আছে,আর কিছু ইতিহাসেরও ইতিহাস হয়ে গেছে। গৎবাঁধা এই ইতিহাস জানতে তেমন আগ্রহী শ্রোতা হয়তো আপনি খুঁজে পাবেন না। তবে পরীক্ষায় নাম্বার তোলার জন্য বাধ্য হয়েই মনে হয় কিছু পড়তে হয়।

৭১ আর ৭৫ সংখ্যা দুটির সাথে বাঙালি বোধহয় একটু বেশিই পরিচিত।থাকবেই না বা কেন? দীর্ঘ ৯ মাস যে যুদ্ধে ৭১ এ বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল এই বাংলার মানুষ,সেই ৭১ চিরকালই বাঙালির হৃদয়ে জায়গা করে নিবেই।৭১-৭৫, বিশ শতকের শেষাংশের এই ৭০ এর দশক একই সাথে বাঙালির আনন্দের আবার বাঙালির বেদনার দশক।
এই সময়টাকে জুড়েই রয়েছে নানা ইতিহাস। কিছু ইতিহাসের আবার বিতর্কও রয়েছে।তবে সেদিকে আমাদের না গেলেও চলবে। জীবনের শেষশয্যায় এসে সেই দশকের সময়টাকে লিপিবদ্ধ করে হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্টি করেছেন একই সাথে আলোচিত ও সমালোচিত ইতিহাস আশ্রিত রাজনৈতিক উপন্যাস “দেয়াল”।

অতীতে ঘটে যাওয়া সত্যের বর্ণনার নাম ইতিহাস হলেও সবসময় সত্যবচন ইতিহাসের পাতায় স্থান পায় না। কখনো কখনো সত্যের আড়ালে আধা সত্য, এমনকি অসত্য পর্যন্ত সত্যের অন্তরালে সগৌরবে মাথা উঁচু করে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে সদা তৎপর থাকে। ইতিহাস এদেরকে নিজ বক্ষে ঠাঁই না দিলেও কখনো কখনো এসব অপ্রিয় সত্য নিজ শক্তির জোরে সকল বৈরিতাকে দূরে ঠেলে প্রভাতের সূর্যের ন্যায় সত্যাকাশে উদিত হয়।

মনজুরুল ইসলাম “দেয়াল” নিয়ে বলেছিলেন, “ইতিহাসকে গল্পের কাঠামোয় নিয়ে আসতে পারাটা একটা জটিল কাজ। ইতিহাসের সত্যগুলো এতে আড়ালে চলে যেতে পারে, কোনো গৌণ চরিত্র অথবা ঘটনা অকারণ গুরুত্ব অর্জন করতে পারে। গল্প-উপন্যাসের আখ্যান এগোয় তার সূত্র ধরে, ইতিহাসের আখ্যান নির্দিষ্ট হয় ইতিহাসের নিজস্ব অনিবার্যতায়। ফলে একজন গল্পলেখকের হাতে ইতিহাস তার গতিপথ হারাতে পারে, তার সূত্রগুলো এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। আবার অন্যদিকে, গল্পের কাঠামোয় ইতিহাসকে স্থাপন করে একজন লেখক ইতিহাসকে অতিরঞ্জন এবং বিকৃতি থেকে রেহাই দিতে পারেন, ইতিহাসের লুকানো সত্যগুলো দিনের আলোয় তুলে আনতে পারেন। গল্পলেখকের শক্তি এবং কল্পনার ওপর নির্ভর করে ইতিহাস তার ওপর আরোপিত শৃঙ্খল ভাঙতে পারে, যে শৃঙ্খল পরাতে পারে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান, অথবা ক্ষমতার রাজনীতি।”

সত্যিই খুব জটিল একটা বিষয় এই ইতিহাসকে গল্পের আকারে রূপ দেয়া। অবে খুব সংবেদী বর্ণনায় হুমায়ূন আহমেদ তাঁর চরিত্রগুলো, ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন “দেয়াল” উপন্যাসে। তাঁর পাঠকেরা তাঁদের পরিচিত দু-একটি চরিত্র অথবা সেগুলোর আদলে তৈরি কিছু মানুষজন পাবেন এই উপন্যাসে। এর গল্পটি অজটিল, কিন্তু বোধ-অনুভূতিগুলো তীব্র এবং তীক্ষ, মন আচ্ছন্ন করা অথবা অশান্ত করা। শফিক এই গল্পের কেন্দ্রীয় এক চরিত্র, অনেকটা হিমুর মতো—সত্যবাদী কিন্তু কিছুটা ভীতু। সে যার গৃহশিক্ষক, যার নাম অবন্তী, বয়স ১৬, সে আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাদের ভেতর একটি সম্পর্ক হয়, আবার পুরো যে হয়, তা-ও নয়। এই কাছে আসা-দূরে থাকার ভেতর একটা রহস্য এবং রোমাঞ্চ আছে, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অটুট থাকে। উপন্যাসে অন্যতম এক চরিত্র জুড়ে আছে এক গদিনসী পীর জাহাঙ্গীর।সম্পর্কে সে অবন্তীর স্বামী বটে কিন্তু স্বামী হিসেবে কোনল অধিকারই সে অবন্তীর উপর ফলাতে পারবে না এটা অবন্তী আর দাদা সরফরাজের কড়া নির্দেশ।তবে দূর থেকেই স্ত্রীর প্রতি তার সকল দায়-দায়িত্ব সে পালন করে যায়। এ উপন্যাসে অবন্তীর বাবা নিরুদ্দেশ, তবে দীর্ঘদিন পর ভেসে ওঠেন স্পেনে, যেখানে অবন্তীর মা ইসাবেলা থাকেন এবং মাঝেমধ্যে মেয়েকে চিঠি লেখেন।উপন্যাসে শফিক-অবন্তী-হাফেজ জাহাঙ্গীর-সরফরাজ খানের গল্পটাই প্রধান, কিন্তু এতে ৭৫ এর বিভিন্ন ঘটনা স্থান পাওয়ার ফলে বঙ্গবন্ধু গল্পের কয়েক জায়গায় আবির্ভূত হন  খুব অন্তরঙ্গ, কিছুটা আমোদপ্রিয় মানুষ হিসেবে। আমরা দেখি, অথচ তাঁকে ঘিরে ভয়ানক যে কূটচালগুলো খেলতে থাকে খলনায়কেরা, সেগুলো যখন বর্ণনা করেন ঔপন্যাসিক, আমরা বুঝি বঙ্গবন্ধু মানুষ চিনতে কখনো কখনো ভয়ানক ভুল করেছেন, ট্র্যাজিক নায়কদের মতো, যেমন খন্দকার মোশতাক আহমদকে, খালেদ মোশাররফকে; হুমায়ূন আহমেদ তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিয়েছেন; কর্নেল তাহেরকে পুনরধিষ্ঠিত করেছেন তাঁর বীরের আসনটিতে। এ দুই চরিত্রের এক আশ্চর্য নিরাবেগ চিত্রায়ণ করেছেন হুমায়ূন আহমেদ ইতিহাসের দায় থেকেই। জিয়াউর রহমানও আছেন এই উপন্যাসে এবং আছেন তাঁর ভূমিকাতেই। জিয়ার প্রাণ রক্ষাকারী বন্ধু কর্নেল তাহেরকে যখন ফাঁসিতে ঝোলানো হলো, দেখা গেল কর্নেল তাহেরের কোনো অভিযোগ নেই কারও বিরুদ্ধে, শুধু অসম্ভব এক স্থিরচিত্ততার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি বীরত্ব এবং দেশপ্রেম কাকে বলে তার এক অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করে গেলেন।

 

পরিশেষে এ কথা বলে   আলোচনার ইতি টানা যায় যে, ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস হিসেবে বইটি এককথায় দারুণ ছিল। এতে ঔপন্যাসিকের কিছুটা ব্যক্তিগত পক্ষপাতদুষ্টতার দরুন কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তা তার পারিবারিক দিক দিয়ে লক্ষ্য করলেই স্পষ্টত বোঝা যায়।তবে এ  সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে অন্যান্য অনুরূপ গ্রন্থের সাথে মিলিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে পড়লে সহজেই এ সীমাবদ্ধতা দূর হবে বলে মনে হয়!

হ্যাপি রিডিং

টপিকঃ

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close