রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

দূরত্ব

দূরত্ব

         

ছাদ থেকে আকাশটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে।স্বচ্ছ,নীল আকাশ।কিছু কিছু মেঘকে উড়ে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে আকাশের এদিক হতে সেদিক।সুভা এতক্ষণ অপলক চোখে তাই দেখছিলো,মেঘেদের খেলা।হাতে ছিলো এক কাপ চা,গরম চা।আনমনেই চায়ের কাপে ঠোঁট ছোয়ালো সুভা।ঠোঁট  ছোঁয়াতেই চায়ের গরম স্পর্শে সুভার ধ্যান ভাঙ্গল।তখনই তার মনে হলো কেউ তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।সেদিকে তাকাতেই দেখলো সাদ তার দিকে তাকিয়ে আছে।

সুভা জিজ্ঞেস করলো কী দেখছো এভাবে!

সাদ বললো -তোমাকে!

তারপর আবার কিছুসময় পিনপতন নীরবতা। কিছুক্ষণ পর  নীরবতা ভেঙে হঠাৎ সুভা বলে উঠল,জীবন কত অদ্ভুত, তাই না?

যাকে ছাড়া কখনো বাচতে পারবে না বলে মনে হয়,তাকে ছাড়াই একসময় মানুষ দিব্যি বাচে।যাকে ছাড়া বেঁচে থাকার কথা চিন্তাও করা সম্ভব হতো না,তাকে ছাড়াই দিব্যি বেঁচে থাকে মানুষ।

একসময় যার চোখে চোখ রেখে কথা হতো

কিছুসময় পার হওয়ার পর সেই চোখে চোখ রাখার ও ইচ্ছে জাগেনা আর।

জানতে ইচ্ছে করে না,কেমন আছে সে!

যেই চোখের গভীর মায়ায় কখনো কেউ আটকে পড়েছিলো বলেছিলো,তার আর একটিবারের জন্য ও ইচ্ছে জাগে না সেই চোখে চোখ রাখার,আগ্রহ থাকে না সেই চোখে চোখ রেখে জানার কেমন আছে সে!

সাদ ছোট করে উত্তর দিলো,হুম।

সুভা আবার বলতে শুরু করলো, মানে কখনো যেই মানুষ টা তোমার সবচেয়ে পরিচিত ছিলো, সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলো, হুট করে সে একেবারেই অপরিচিত হয়ে যায়।তাকে কি আসলেই অপরিচিতদের তালিকায় ছুড়ে ফেলা যায়?এতোই সহজ!

জানো সাদ,বড্ড জানতে ইচ্ছে করে,কখনো যেই পরিচিত মুখ দেখার জন্য হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হতো, মরণদশা এসে গ্রাস করতো, দিন কাটতো না

আজ সেই মুখের দিকে না তাকিয়ে কীভাবে তার দিন কাটছে।এখন কি একটিবারের জন্য ও তার ইচ্ছে হয় না তাকানোর?

আজ বুঝি আর সেই অবসর তার নেই।

সুভার কথায় সাদের বুকের মধ্যে কেমন যেনো নাড়া দিয়ে উঠলো! ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির ঝলক নিয়ে সে বলে উঠল আজ তার ইচ্ছে হয় না, কারণ অভাব ছিলো ভালোবাসার,অভাব ছিলো বিশ্বাসের।

কারণ ছিলো দুজনের মধ্যে চলে আসা তৃতীয়জনের।

সুভার চোখ  পানিতে ছলছল করে উঠলো।সে বলে উঠলো,এখন দুরত্ব এতোটাই বেড়েছে যে

ফিরে দেখার আগ্রহই বাকি রয় নাই তার।

আজ দুরত্ব দুটো মনের,দুরত্ব ভালোবাসার

নিকটে শুধু বাস্তবতা আর কিছু দীর্ঘশ্বাস।

শুধু দুরত্ব দুজনার।

তখন সাদ বলে উঠল, আচ্ছা সুভা দূরে থেকে যে দুরত্ব সৃষ্টি হয় সেটা বেশি কষ্ট দেয় না দুজন মানুষ পাশাপাশি থাকার পর ও যে দুরত্ব সৃষ্টি হয় সেটা বেশি কষ্ট দেয়?

সুভা সাদের দিকে তাকালো।সাদ আবার তার ঠোঁটে সেই স্বভাবসুলভ হাসিটা ফিরিয়ে আনল।

সুভা বললো-কেন কষ্টটা সয্য করতেছ?কেন ছেড়ে চলে যাচ্ছো না?

সাদ বললো -তুমি যে কারণে আজও কষ্টটা পাচ্ছ,এখনো স্মৃতিগুলো  বয়ে বেড়াচ্ছ সেই কারণেই।

সাদের কথা শুনে সুভা আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ক্ষানিক নিরবতা। নিরবতা ভেঙে ছোট্র একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুভা সাদ কে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল-তুমি আমায় এতো ভালোবাসো কেন?

সাদ এতক্ষণ অপলক চোখে আকাশের মেঘেদের  খেলা দেখছিলো, সুভার হঠাৎ এই প্রশ্নে তার বুকের মধ্যে কষ্টটা আবার নাড়া দিয়ে উঠল।তার কানের কাছে বারবার কথাটি ভেসে আসতে লাগলো -“তুমি আমায় এতো ভালোবাসো কেন!

নিজের প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে সাদের মুখোমুখি গিয়ে দাড়ালো সুভা।তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলো, কি হলো? বললে না?

সাদ ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা টেনে সুভার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো – সুভু,তুমি এখনো আমাকে ভালোবাসতে পারো নি!তাই না?

সাদের কথায় সুভার মনের মধ্যে কেমন ব্যথা যেন নাড়া দিয়ে উঠল!দলাপাকিয়ে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। এই মানুষটির চোখে চোখ রেখে আর এক সেকেন্ড ও তাকানোর সামর্থ্য নেই তার।চুপচাপ চোখ নামিয়ে পিছিয়ে গেলো সে।

‘নীল রঙ্গের শাড়িটিতে আজ বেশ লাগছে তোমাকে।আনমনেই বেরিয়ে এলো কথাটা।

সাদ আর পিছু ফিরে তাকালো না।সে জানে,ঘরের   দুয়ার এখন ঘন্টাখানিকের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।এই সময়টিতে আর কেউ সুভার কাছে যেতে পারবে না।সুভা এখন কাঁদবে,আপন মনে!এ সময় একান্ত সুভার!

সাদ আবারো সেই স্বভাবসুলভ মুচকি হাসিটা মুখে ফিরিয়ে আনলো।

আকাশে মেঘেরা খেলা করছে।হয়তো বৃষ্টি নামবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।ঝুম বৃষ্টি।

সাদ চেয়ে রইল আকাশপানে।কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝমা বৃষ্টিকণা পড়তে শুরু হলো।বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো সাদের শরীরে । সাদের চোখ থেকেও বৃষ্টি ঝরা শুরু হয়েছে,যে বৃষ্টিতে জড়িয়ে আছে  অপ্রাপ্তি,কষ্ট!

সুভার দুচোখ ও পানিতে টলমল।জানালার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে চেয়ে বলতে লাগলো

কোনো একসময় ভালোবাসায় সিক্ত হতো যে চিবুক

একই স্বপ্ন দেখতো যে দুজোড়া চোখ

হাত হাত রেখে কথা হতো, আবেগের বিনিময় হতো

আজ খুব বিষাক্ত মনে হয়।

দুজনার মধ্যে দুরত্ব আজ এতোটাই বেড়েছে যে

অনুভুতি রা আজ মৃতপ্রায়

হৃদয়ে খুব করে একজন কে চেয়ে

আজ তাকেই মনে হয় অপরিচিত, খুব অপরিচিত

খুব ভালোবাসা হতো যাকে একসময়, আজ তাকে দেখতেও মানা,ছুতেও মানা!

সে ধরাছোঁয়ার বাহিরে।

মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক অদৃশ্য দুরত্বের,

অধিকারের দেয়াল!

কথাগুলো বলতে বলতে সুভার দুচোখ পানিতে ভরে আসলো। ক্রমাগত ফুপিয়ে কান্নার বেগ বাড়তে লাগলো।কান্নার  শব্দ শুনা যাচ্ছে।এ শব্দ যন্ত্রণার,গভীর যন্ত্রণার!

সুভা সেই কালো, গভীর অতীতের ছোঁয়া থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই তবুও যেনো আসেনি।অতীত যেনো এখনো তার পিছু ঘুরছে।

তাইতো আজ ও এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো না,”তুমি এখনো আমাকে ভালো……”

সাদ দরজার বাইরে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়।ভেতর থেকে সুভার কথাগুলো  আর ফুপিয়ে কান্নার শব্দ শুনে আবারো ফিরে যায় বৃষ্টির কাছে, চুপচাপ।হঠাৎ তার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাটি বেরিয়ে আসে- আজ সব পেয়েও আমি শুন্য,কিছুই পাইনি!কারণ তুমি তো এখনো আমাকে ভালোইবাসোনি….।

ভালোইবাসোনি…..।

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close