ইতিহাস

ছোটদের বন্ধু বঙ্গবন্ধু : কেমন ছিল তার শৈশব?

সাল ১৯২০।গোপালগঞ্জ জেলার মধুমতি নদীর তীরে একটি ছোট্ট গ্রাম টুঙ্গিপাড়া।গাঁয়ের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার শেখ পরিবার।দিনটি ছিল চৈত্র মাসের ৩ তারিখ।সময় রাত ৮ টা।বাবা শেখ লুৎফর রহমান আর মা সায়েরা খাতুনের কোল আলো করে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে শিশু।বাবা-মা আদর করে নাম রাখে ‘খোকা’।
হ্যাঁ। বলছিলাম এক খোকার কথা যে খোকার হাত ধরে বাঙালি জাতি তার কাঙ্খিত স্বাধীনতা লাভ করে।যে খোকা জায়গা করে নেই ইতিহাসের পাতায়,যে খোকার ইতিহাস আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বলছিলাম সেই খোকার কথা,যিনি কারোও কাছে শেখ মুজিব আবার কারোও কাছে মুজিব ভাই আবার কারোও কাছে বংগবন্ধু নামে পরিচিত।

বাংলার মানুষের সেই চিরচেনা মুজিবের কথাই বলব আজ।তবে বলব তার শিশুকালের কথা,যে মুজিব শিশুদের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন,যে মুজিবের জন্মদিনে আজ পালিত হয় জাতীয় শিশু দিবস।
চলুন তবে জেনে নেয়া যাক সেই শিশু মুজিবের কিছু কথা।

বাল্যকালে পারিবারিক আবহের কারণেই শেখ মুজিব মানবপ্রেমী হয়ে ওঠেন। অন্যায়, অবিচার আর প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা আর ক্লেদ তৈরি হয় সেই কচি মনেই। টুঙ্গীপাড়া গ্রামেই শেখ মুজিবুর রহমান ধন-ধান্যে পুষ্পে ভরা শস্য-শ্যামলা রূপসী বাংলাকে দেখেছেন। তিনি আবহমান বাংলার আলো-বাতাসে লালিত ও বর্ধিত হয়েছেন। তিনি শাশ্বত গ্রামীণ সমাজের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ছেলেবেলা থেকেই গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। গ্রামের মাটি আর মানুষ তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো। শৈশব থেকেই তিনি তৎকালীন সমাজজীবনে প্রজাপীড়ন দেখেছেন, দেখেছেন জমিদার, তালুকদার ও মহাজনদের শোষণ ও অত্যাচারের চিত্র।

বঙ্গবন্ধু ছেলেবেলায় দোয়েল ও বাবুই পাখি ভীষণ ভালোবাসতেন। এছাড়া বাড়িতে শালিক ও ময়না পাখি পুষতেন। সুযোগ পেলেই আবার নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটতেন। বানর ও কুকুর পুষতেন বোনদের নিয়ে। পাখি আর জীব-জন্তুর প্রতি ছিল গভীর মমতা। মাছরাঙা ডুব দিয়ে কীভাবে মাছ ধরে, তা-ও তিনি খেয়াল করতেন খালের পাড়ে বসে বসে। ফুটবল ছিল তার প্রিয় খেলা। তার শৈশব কেটেছে মেঠোপথের ধুলোবালি মেখে আর বর্ষার কাদা পানিতে ভিজে।

গ্রামের মাটি আর মানুষ তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো। তিনি সবার চোখের মণি। সবাই চোখ বুজে তাকে বিশ্বাস করতো। বালকদের দলের রাজা তিনি। সব কাজের নেতা, ভাই-বোনের প্রিয় ‘মিয়া ভাই’। টুঙ্গিপাড়ার শ্যামল পরিবেশে শেখ মুজিবের ছেলেবেলা কেটেছে দুরন্তপনায়। মধুমতির ঘোলাজলে গাঁয়ের ছেলেদের সাথে সাঁতার কাটা, দৌড়-ঝাপ, দলবেঁধে হা-ডু-ডু, ফুটবল, ভলিবল খেলায় তিনি ছিলেন দুষ্টু বালকদের নেতা।

সামাজিক আবহে শেখ মুজিব অসাম্প্রদায়িকতার দীক্ষা পান। আর পড়শি দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে সারাজীবন সাধারণ দুঃখী মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় সিক্ত করে তোলে। বস্তুতপক্ষে, সমাজ ও পরিবেশ তাঁকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম করতে শিখিয়েছে। তাই পরবর্তী-জীবনে তিনি কোনো শক্তির কাছে, সে যত বড়ই হোক, আত্মসমর্পণ করেননি; মাথানত করেননি।
শিশুকাল থেকেই মুজিব ছিলেন ডানপিটে ও একরোখা স্বভাবের। তাঁর ভয়-ভীতি আদৌ ছিল না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সত্য ও উচিত কথা বলার অভ্যাস থাকায় কারো সামনেই তিনি কথা বলতে ভয় পেতেন না। প্রধান শিক্ষক গিরীশ বাবু কিশোর মুজিবের সাহসিকতা ও স্পষ্টবাদিতার গুণেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। প্রথম দিকে তাঁর আচরণে কিছুটা অবাক হলেও তাঁর অন্য গুণের সঙ্গে সাহসিকতা, স্পষ্টবাদিতা ও দৃপ্ত-বলিষ্ঠতার জন্যেই তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন তিনি। মিশন স্কুলে ভর্তি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই শুধু প্রধান শিক্ষককে নয়, সবাইকেই জয় করে নিলেন তিনি। পরিচিত হয়ে উঠলেন সহপাঠী ও বয়ঃকনিষ্ঠদের ‘মুজিব ভাই’ রূপে। এভাবে স্কুলে পড়া অবস্থায়ই তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটতে থাকে।
হাস্যোজ্জ্বল মুখের মিষ্টি কথা, অন্তরঙ্গ ব্যবহার এবং খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবের কারণে অল্পদিনেই স্কুলের শিক্ষক-ছাত্র সবারই প্রিয় হয়ে উঠলেন মুজিব। স্কুলের যে কোনো উৎসব-অনুষ্ঠানে তাঁর থাকতো সক্রিয় ভূমিকা, এমনকি অনেক সামাজিক কাজেও মুজিব সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। যে কোনো ধরনের কাজে মুজিব এগিয়ে গেলে অন্য ছাত্ররাও তাঁর সঙ্গে এগিয়ে যেত সেই কাজে। শৈশবকাল থেকেই মুজিবের খেলাধুলার প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। ফুটবল খেলায় তিনি বেশ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ভলিবল খেলাতে তাঁর বেশ আগ্রহ দেখা যেতো। গুরুসদয় দত্ত প্রবর্তিত ‘ব্রতচারী নৃত্যে’র প্রতি তিনি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন।
পরিণত বয়সে তাঁর মধ্যে যে মহানুভবতা, ঔদার্য, সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিক দরদ, সৎ সাহস, মানুষের বিপদে-আপদে অকুণ্ঠচিত্তে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া, সমাজের যে কোনো স্তর ও পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মেলামেশা প্রভৃতি গুণাবলী দেখা যায়, শৈশবেই তার প্রকাশ ঘটে। ‘উঠন্ত মূলো পত্তনেই চেনা যায়’- প্রবাদের সত্যতা প্রমাণিত হয় মুজিবের জীবনে।

সম্ভ্রান্ত বংশের উত্তরাধিকারসূত্রেই সমাজকল্যাণের ব্রত পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বাড়িতে আনন্দবাজার,
বসুমতি, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাতসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা রাখা হতো। এসব পত্রিকা আর বই-পুস্তকের কল্যাণে কিশোর বয়সেই তাঁর সমসাময়িক দুনিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা জন্মে। সেই বয়সেই এলাকার অসহায় ও দুঃস্থদের উন্নয়নভাবনা তাঁর মাথায় জেঁকে বসলো। সমাজে অমানবিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যে মানুষগুলোর দিনাতিপাত হচ্ছিল, তিনি তাদের সহায়তায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। সমাজের নিষ্ঠুর বর্বরতাকে পেছনে ফেলে দিনবদলের দৃঢ় সংকল্পে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। সমাজবদলের যুদ্ধটাই ছিলো তাঁর মূল লক্ষ্য, যা জীবনযুদ্ধের চেয়েও বড় ও মহৎ। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন ঘটনা। গ্রামের ‘মুসলিম সেবা সমিতি’র দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তিনি। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টির চাউল সংগ্রহ করলেন। বিক্রিত অর্থ ব্যয় করলেন অসহায় ও গরিব পরিবারের সন্তানদের পড়ালেখার পেছনে। সে সময়েই কিশোর মুজিবের মধ্যে ভবিষ্যৎ নেতা হওয়ার লুক্কায়িত নেতৃত্বের গুণাবলির উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।

এভাবেই আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই অসাধারণভাবে কাটে খোকার শৈশব,যে খোকা এনে দিয়েছিল এ জাতিকে তার স্বাধীনতা ও একটি মানচিত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close