রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

ঘুমু ( সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার)

কাজের মেয়ে ফুলটুসিকে চুলের মুঠি ধরে ধাম ধাম করে দেয়ালে বাড়ি দিলাম কয়েকটা। মেয়েটা ব্যাথায় চিৎকার করে উঠলো,
-” ও আল্লাহ গো.. ও আল্লাহ গো…।”

কপাল ফেটে রক্তাক্ত হয়ে গেছে সাথে দেয়ালও। কপাল থেকে চোখ, গাল, চিবুক বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে রক্ত পড়ছে টপ টপ করে মেয়েটার অনুউন্নত বুকের উপর। এবার আমি রাশি রাশি চুল টেনে টেনে ছিঁড়ে উপড়ে ফেলতে শুরু করলাম মেয়েটার মাথা থেকে। মেয়েটা পাগলের মতো আমার পা ধরে কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলছে,
-” আপা ছাইড়া দেন। ছাইড়া দেন আ-পাআআআ। আর ভুল করুম না। আর ভুল হইবো না আপাআআআ। এইডাই শেষ। এডাই শেষ… আর করুম না। ছাইড়া দেন। ও আপা…।”

মেয়েটা চিৎকার করছে? করুক! কাঁদছে? কাঁদুক! তাতে আমার কি? উঁহুম… আমি তো ছেড়ে দিবো না। একদম না।

আমি টেনে টেনে মেয়েটার মাথার চুল ছিঁড়ে উপড়ে ফেলছি কিন্তু কিছু চুল এখনও রয়ে গেছে। ব্লেজার দিয়ে বাকি চুল গুলোও দিয়েছি ছিলে। এখন মেয়েটার চুলহীন টাক মাথা বেলের মতো চকচক করছে। কি সুন্দরই না দেখতে লাগছে! আমি খুশিতে আপ্লূত হয়ে মেয়েটার টাকলা মাথায় তলার মতো ধিম তানা না… ধিম তানা ধিম তানা না… বাজালাম কিছুক্ষণ হাতের আঙুল দিয়ে। শেষে কয়েকটা গাট্টি মেরে দিলাম ডান হাতের মধ্যমা আঙ্কুলের উল্টো পিঠ দিয়ে।

মিউজিক বক্সে লাউড স্পিকারে গান ছেড়ে দিয়ে ফুলটুসিকে টেনে হিঁচড়ে দাঁড়া করিয়ে চিৎকার করে বললাম,
-” ফুলটুসি নাচ!”

মেয়েটা পড়ে যাচ্ছে মাথা ঘুরে। ধপাস করে মাটিতে পড়েই গেলো এবার মাথা ঘুরে। আমি সজোরে মেয়েটার পেট বরাবর কয়েকটা লাথি দিলাম। কুঁকিয়ে উঠলো ব্যাথায়।

আমি আবারও চিৎকার করে বললাম,
-“টসটসে ফুলটুসি নাচ শালী! নাচ! “
‌ ‌ মেয়েটা এবার পেটে হাত রেখে কোনো মতে উঠে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করলো। ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বাজছে,

  • “দিলবার দিলবার …
    চাদা জো মুঝপে সুরুর হ্যায় …
    আসর তেরা ইহ জুরুর হ্যায়
    তেরি নজের ক্যা কাসুর হৈ ..
    দিলবার দিলবার … “

মেয়েটা নাচছে না তো। শুধু শুধু হাত পা একেকটা একেক দিকে ছুঁড়ছে। কিছুক্ষণ নাচার মতো হাত পা একেকটা একেক দিকে ছোড়াছুড়ির পর মেয়েটা আবার ধপ করে মাটিতে পড়ে গেলো। কাঁদছে আর হেঁচকি দিচ্ছে। আমি মেয়েটার পাজরে সজোরে আরো কয়েকটা লাথি দিয়ে এগিয়ে গেলাম রান্না ঘরের দিকে। রান্না ঘর থেকে ফ্রীজের সবগুলো ডিম, চিনির প্যাকেট আর তিনটা আটার প্যাকেট নিয়ে নিলাম।

রুমে এসে বিছানার উপর এক এক করে উপকরণ গুলো রেখে ফুলটুসির কান টেনে ধরে টেনে হিঁচড়ে আবার দাঁড়া করিয়ে মুচকি হেঁসে বললাম,
-” টুসটুসে… ফুলটুসি নাচ! “
আমি আবার গিয়ে বিছানায় পায়ের উপর পা তুলে বসলাম। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজতে লাগলো,
-” ওওও সাকি সাকি রে ওওও সাকি সাকি… “

ফুলটুসি নাচছে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আমি বিছানা থেকে নেমে ওর ঘাড়ে হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে নাক বরাবর দিলাম তিনটে ঘুষি। একটু পরেই রক্ত পড়তে শুরু করলো নাক দিয়ে। মেয়েটা সম্ভবত চোখে অন্ধকার দেখছে এখন নাকে ঘুষি খেয়ে।

আমি ফুলটুসিকে মুচকি হেঁসে বললাম,
-” নাচ তাহলে ছেড়ে দিবো। “

ফুলটুসি কাঁদতে কাঁদতে আবার নাচতে শুরু করলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাত পা একেকটা একেক দিকে ছুঁড়ছে। ওর নাচের তালে তালে আমি আটার প্যাকেট খুলে মুঠো ভরে ভরে আটা মারছি ছুঁড়ে ছুঁড়ে। কিছু আটা ওর গায়ে গিয়ে লাগছে আর কিছু আটা বাতাসে উঠছে। বাহ্! দেখতে দারুণ লাগছে তো!

ড্যান্স বারে যে মেয়েগুলো নাচে ওদের মতো ফুলটুসির নাচ দেখে আমি মুখে আঙ্গুল দিয়ে শিটি বাজালাম। ড্যান্স বারে মেয়েদের নাচ দেখে টাকা ছুঁড়ে মারে আর আমি আটা মারছি ছুঁড়ে ছুঁড়ে। আটার সাথে চিনিও মুঠো ভরে ভরে মুখে ছুঁড়ে মারছি। এবার ডিম ছুঁড়ে মারার পালা! সব শেষে নাচের তালে তালে ডিমও ছুঁড়ে মারছি। অনেকগুলো ডিম ফুলটুসির গায়ে ছুঁড়ে মারার পর সেগুলো শরীরে লেগে ফেটে ওর শরীর থেকে গড়িয়ে ফ্লোরে পড়ছে। ফলাফল স্বরূপ ডিমে পা পিছলে আবার ধপাস করে ফ্লোরে পড়ে গেলো ফুলটুসি। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা ফ্লোরে শুয়ে নাগিন ড্যান্স দিতে লাগলো সাকি সাকি গানের সাথে। আহা! সাকি সাকি গানের সাথে সে কি নাগিন ড্যান্স! আপনারা না দেখলে বুঝতেই পারবেন না! ফুলটুসিকে নাগিন ড্যান্স দেওয়ার জন্য অস্কার ছুঁড়ে মারা উচিত।

বেশ কিছুক্ষণ পর মিউজিক অফ করে দিয়ে ফুলটুসির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। ও কেমন ভয় আর করুণ চোখে আমার দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছে। ভয়ে ঠিকমতো চোখ তুলেও তাকাতে পারছে না বেচারি। খুব মায়া লাগলো আমার এখন মেয়েটাকে দেখে।

ফুলটুসির বাম হাতে একটা ডিম দিয়ে বললাম,

  • ” টুসি…. টসটসে ফুলটুসি ডিমটা খা। “
    -” কাঁচা ডিম! “
    -” হ্যাঁ। কাঁচা ডিমটাই খা। এখনই খা। এখানে দাঁড়িয়েই খা। “
    -” আপা ও আপা ছাইড়া দেন। আর করুম না। কসম করতাছি। আর করুম না। ” কাঁদতে কাঁদতে বললো।
    -” তোর খুব কষ্ট হয়েছে না রে? “
    ‌ ‌ ফুলটুসি ইশারায় মাথা উপর নিচ দুলালো। যার উত্তর স্বরূপ সে অনেক কষ্ট পেয়েছে।
    -” ডিমটা খা তারপর তোকে ছেড়ে দিবো। “
    -” সত্যি কইতাছেন? “
    -” আগে ডিম খা। “
    -” আচ্ছা। “

মেয়েটা খুশি মনে কি ভেবে ফ্যানের দিকে মুখ তুলে হা করে ডিমটা ফাটিয়ে মুখের ভেতর পুরে দিলো। যেই না ডিমটা গিলতে যাবে ঠিক তখনই মেয়েটা ডিমটা আর গিলতে পারলো না। কারণ আমি আমার কাজটা সেড়ে ফেলেছি এই ফাঁকে।

এক ফালি উষ্ণ রক্ত ছিটকে এসে আমার নাকে মুখে পড়ে। আমি মুচকি হেঁসে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি মেয়েটার ঘাড় থেকে মাথাটা চার ভাগের তিন ভাগ আগলা হয়ে একভাগ গলার বাম পাশে ঝুলে আছে। গলা থেকে ফিনকি দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। ডিমটা মেয়েটার গলার নালি দিয়ে বের হয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে বুক বেয়ে ফ্লোরে পড়ছে।

আমি মুচকি হেঁসে বললাম, ” বোকা মেয়ে! “

আমি কতোবার মেয়েটাকে বলেছি আমি ঘুমু করলে আমাকে কখনো না জাগাতে। যতোক্ষণ না আমি ঘুমু থেকে নিজে জেগে উঠবো। কারণ সারারাত হাসপাতালে নাইট ডিউটি করার পর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে সকাল ১১টায় বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে মুখে কিছু দিয়েই আমি ঘুমুতে যাই আবার সন্ধ্যার আগে জেগে ফ্রেশ হয়ে হাসপাতালে নাইট ডিউটিতে দৌঁড় লাগাই। কিন্তু মেয়েটা কি আর শুনে সে কথা! আমি ঘুমুলেই রোজ একটা একটা কাহিনী বলতে আমাকে ঘুমু থেকে জাগাবেই। জাগিয়ে আবার বলবে,
” আপা ভুল হইয়া গেছে আর করুম না। “

মানুষ এক ভুল কতোবার করে? আজও একই কাজ করেছে। আমি ঘুমুচ্ছি আমার রুমে এসে চিৎকার করতে করতে বললো আপা ও আপা জানেন পাশের বিল্ডিং এর চার বছরের বাচ্চাটা ছাদে খেলতে গিয়ে ছাদ থেকে পইরা গেছে! “

আমি ঘুমে ঢুলুঢুলু আধ খোলা চোখে ফুলটুসির দিকে তাকাতেই সে রসিয়ে কসিয়ে সম্পূর্ণ ঘটনার বিবরণ আমাকে বলতে শুরু করলো। তারপরই আমি ফুলটুসির চুলের মুঠি ধরে ধাম ধাম করে দেয়ালে বাড়ি দিয়েছিলাম কয়েকটা। তারপরের ঘটনা আপনাদের জানা।
আরেএএএ! কে বেঁচে আছে? আর কে মরে গেছে? আর কার কি হয়েছে? সেটা দিয়ে আমি কি করবো! আমি কি জানতে চেয়েছি!
মেয়েটা এ পর্যন্ত আমাকে একশ দিন ঐ কথাটা বলেছে। আজকে সেটার সেঞ্চুরি ইনিংস ষোল আনা পূর্ণ করলো আর জানপাখিটাও উড়ে গেলো।
চুহ্ চুহ্ চুহ্ চুহ্ চুহ্…..
ঠিকই আছে! আমার কথা শুনেনি কেন? আমার চাকরি কি ও করে দেয় নাকি ওর বাপ এসে করে দেয়? নাকি আমার ঘুমু ঐ মেয়ে ঘুমিয়ে দেয়? আর সব বড় কথা মেয়েটা মিথ্যা কথা বলে। মেয়েটা বার বার আমার ঘুমু ভাঙ্গিয়ে বলে,
” আর করুম না। ভুল হইয়া গেছে। “
কিন্তু মেয়েটা বারংবার আমার ঘুমু ভাঙ্গায়ই। আমাকে কি মগের মুল্লুক পেয়েছে? তাইতো ডিমটা গিলে খাওয়ার সময় পিঠের পেছনে হাতে থাকা চাপাতিটা দিয়ে গলায় এক কোপ বসিয়ে দিয়েছি। কথা দিয়ে কথা রাখেনি মেয়েটা! তাই, আর করবে না বলে, না করার দেশে পাঠিয়ে দিলাম একেবারে আমি। ওখানে গিয়ে যতো খুশি আর করবো না বলুক।

আরেকটা কোপ দিয়ে গলা থেকে পুরো মাথাটা আলাদা করে হ্যাঙ্গারের সাথে দেয়ালে ঝুলিয়ে দিলাম। মেয়েটা চোখ দুটো বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমার এখন খুব ঘুমু পাচ্ছে। আমি এখন ঘুমুবো।

~ নীলাদ্রি মেহেজাবীন নীল

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close