রাইটার্স ক্লাব স্পেশাল

গল্প- আমিও মা



.
.
আমি একটি হাতি।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই সবাই ই শুনেছেন আমার কথা। আমি তীব্র ক্ষুধায় এসেছিলাম মানুষদের লোকালয়ে।
শুনেছি মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তাই বিশ্বাস করে আপনাদের মাঝে কারো একজনের দেয়া আনারস খেয়ে নিলাম। জানেন তখন মানুষের উদারতায় মুগ্ধ আমি!
খাবার সময় চোখে জল আসছিল এই ভেবে যে কি সুন্দর খেতে দিল মানুষ আমায়।
আমিও খুশি মনে খেয়ে নিলাম।
কিন্তু একি!
কি ফুটছে আমার পেটে!
ইশ কি ভয়াবহ যন্ত্রনা! শরীর কেটে রক্ত গড়ছে, নাহ্ আমি আর পারছি না!
উফ কি যন্ত্রণাবোধ করছি আমি!

কোনো দিশা না পেয়ে পানিতে নেমে গেছি।
ওহ্ আপনাদের তো বলাই হলোনা, আমি অন্তঃসত্ত্বা। আমার গর্ভে আছে আমার সন্তান।
দুদিন ধরে খাবার পাইনি আমি,আমার তো ক্ষুধা লেগেছে, আমার পেটের বাচ্চারও যে পেয়েছে!
আমি একা থাকলে আরও দুদিন অপেক্ষা করতাম।
কিন্তু নিজ সন্তানের ক্ষুধা সহ্য করি কিভাবে বলুন?
আপনার মা পারবে?
আপনি যে মানুষ,আপনার মানুষ মা কি কখনও পারবে আপনাকে ক্ষুধায় না খাইয়ে রাখতে?
না, পারবে না।
তেমনি আমিও তো একজন মা। কি করে পারতাম নিজে না খেয়ে থেকে বাচ্চাকে ক্ষুধায় রেখে দিতে?
তাই না পেয়ে চলে এসেছিলাম আপনাদের কাছে, একটু মাত্র খাবার আশায়।
কিন্তু আপনাদের মধ্যে একজন আমাকে খাবারের মধ্যে বাজি-পটকা ঢুকিয়ে খেতে দিল। সরল মনে তার কাছে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে খেয়ে নিয়েছিলাম খাবারটা।
খাবার সাথেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছিল আমার ভেতরটা!
আমার সন্তান মৃত্যুর কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল।

মানুষের মত আমার পেটের বাচ্চাটাও কাঁদছিল, বাঁচার আকুতি করছিল।
আমি পানিতে নেমে দাঁড়িয়েছিলাম কষ্ট করে যদি আমার বাচ্চাটা বেঁচে যায়!
মানুষের নাকি মনুষ্যত্বের মূল্য নেই, কিন্তু আপনার দলের সেই লোকটি কি করল?
আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল!
সে কি মানুষ ছিল?
পরে অবশ্য আপনার চাইছিলেন আমাকে সেবা দেবার জন্য, কিন্তু একবার যে ভুল করেছিলাম আমি আপনাদের বিশ্বাস করে, দ্বিতীয়বার তা কি করে করতাম?

আমিও তো মা!
আমারও তো কষ্ট হয় আমার সন্তানের জন্য,আমারও তো চিন্তা হয় আমার বাচ্চার জন্য।

জানেন আমার বাচ্চাটা কত ছটফট করছিল?
জানেন আমার কতটা কষ্ট হচ্ছিল?
না, আপনারা জানেন না, কখনও জানতেও চাননি আমার মত অন্য মায়েদের কষ্ট!
আপনারা মানুষ জাতি বড্ড নিষ্ঠুর, খারাপ।আপনারা তো নিজের গর্ভধারিণী মায়ের কষ্টই দেখেন না, বুঝেনও না, আবার বুঝেও আপনাদের মন বিচলিত হয়না আপনাদের মায়ের জন্য।
শুধুমাত্র কষ্টই দিয়ে যান বেশিরভাগ মাকেই।
সেখানে আমার মত মায়েদের কষ্ট আবার কি করে বুঝবেন বলুন!

কই আমি তো কোনো ক্ষতি করিনি সেদিন,তবুও কেন সেদিন আমাকে ওভাবে ধুকে ধুকে মরতে হল?
কেন আমার মত মায়েদের প্রতিনিয়ত মরতে হয়,নির্যাতিত হতে হয়, কেন কেন কেন?

আপনারা তো এখন খুবই দুঃখ প্রকাশ করছেন আমার জন্য, এটা কি মন থেকে?
নিশ্চয়ই না!
কারণ আজ আমার কথা শুনে হা হুতাশ করবেন, তো কাল অন্য কারও কথা শুনে!

আমার মত একটা কুকুরও মা হয়। তার পেটে যখন বাচ্চা আসে তখন সেও খুব অসহায় হয়ে যায়, মানুষের মত শারীরিক জটিলতায় সেও কষ্ট পায়। কিন্তু আপনারা মানুষ কি করেন জানেন?
তাকে খাবার না দিয়ে,তাকে সাহায্য না করে লাঠি দিয়ে তাকে গুঁতোগুঁতি করেন,লাথি মেরে তাড়িয়ে দেন!
আচ্ছা একবার ভাবুন তো আপনি পেটে থাকা অবস্থায় কেউ যদি আপনার মায়ের সাথে এমন করত তাহলে কেমন হত?

হ্যাঁ, অনেক মানুষ এমন করেই আরেকটি গর্ভবতীকে কষ্ট দেয়। কেউ হয়ত ননদের বেশে,কেউ দেবরের বেশে,কেউ হয়ত শ্বশুর, শ্বাশুরী অথবা স্বামীর বেশে এমন নির্যাতন করে।আমার মত বা অন্য পশু পাখি কিন্তু নয়!
কি লজ্জা!
আচ্ছা আপনাদের লজ্জা লাগেনা?
একটা কুকুর,বিড়াল, ছাগল, গরু বা যেকোনো পশু পাখির সাথে এমন করতে?
তারাও তো মা, আপনার মায়ের মত তাদেরও শারীরিক পরিবর্তের জন্য কষ্ট পোহাতে হয়।
পেটের ভেতর টানতে হয় তার সন্তানকে।
আপনার মায়ের মত আমাদের অর্থাৎ পশুদেরও কষ্ট করে প্রসব করতে হয় সন্তানদের।
তাহলে আমাদের কেন কষ্ট দেন আপনারা?
কেন উপলদ্ধি করেন না আমাদের ব্যথা?
কেন বুঝেন না আমাদেরও কষ্ট হয়?

আমার সাথে আমার বাচ্চাটাও মারা গেল পৃথিবীর আলো দেখার আগেই।
কখনও দেখেছেন সন্তান হারানো একজন মানুষ মায়ের যন্ত্রনা?
আমারও তেমনই যন্ত্রনা হচ্ছিল!

আমি মরে গেছি জন্য আপনাদের কথাগুলো বলছিনা।
এই পৃথিবিতে সব সময় কেউ না কেউ মা হচ্ছে।
আবার সেই মাকে নিত্যদিন সহ্য করতে হচ্ছে অসহনীয় কষ্ট।
আর সেই কষ্ট থেকেই আমি বলছি কথাগুলো।
দয়া করে আর কোনো মাকে কষ্ট দেবেন না।তাদের সম্মান করুন, যত্ন করুন।
মা হবার কালে আপনারা সহানুভূতিশীল হউন,তাদের পাশে থাকুন হোক সে মানুষ বা কুকুর বা হাতি অথবা বানর!
আর কখনও যেন কোনো মাকে কষ্ট পেতে না হয়, কোনো মাকে যেন এভাবে মরতে না হয়।
ভালোবাসুন আপনার মাকে,প্রতিটি মাকে।

রূপসীনা খুকু

আসসালামু আলাইকুম, আমি খুকু, অদক্ষ হাতে হাবিজাবি লিখি আর সেটাই শেয়ার করছি আপনাদের সাথে! আশা করি ভালো লাগবে! :-D

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close