ফিকশন

গল্পঃ ” কার্তিক মাসের প্রেম “

-“ভাড়া কত মামা?”

-“৪০ টেকা।”

-“ধরো, নাও!”

এই বলে রিকশা ভাড়াটি দিয়ে রিকশা থেকে নেমে শিল্পকলা একাডেমীর ভেতরে গেলো রাতুল।এই দিকে দূর থেকে একাডেমীর গ্যালারী হতে ভেসে আসছে সুমধুর একটি মেয়েলি কন্ঠস্বরঃ-

” নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে

রয়েছ নয়নে নয়নে,

হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে

হৃদয়ে রয়েছ গোপনে……”

 

গ্যালারির খুব কাছাকাছি যেতেই হঠাৎ রাতুল দাঁড়িয়ে গেলো এবং সেই মেয়েলি কন্ঠস্বর শোনার চেষ্টা করলো।কিছুক্ষন মুগ্ধভরে কবিতার লাইনগুলো শোনার পর মনে মনে রাতুল বলতে লাগলো,” বাহ্! কি অসাধারণ কন্ঠস্বর!কি অসাধারণ আবৃত্তি! মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি, ভিতরে গিয়ে শুনতেই হবে!”এটি বলে গ্যালারির ভেতরে ঢুকে পড়লো রাতুল।

 

একাডেমীর গ্যালারীতে ঢুকতেই রাতুল দেখতে পেল গ্যালারীতে বসার জায়গা নেই, আর বসার জায়গা-ই বা থাকবে কীভাবে?আজ তো উপমহাদেশের কয়েকজন বিখ্যাত আবৃত্তি শিল্পীদের “আবৃত্তি অনুষ্ঠান”।তাই আবৃত্তিপ্রেমী মানুষদের ভীড় তো থাকবেই,স্বাভাবিক।তার মধ্যে রাতুলও একজন আবৃত্তিপ্রেমী।সেও গান এবং আবৃত্তি শুনতে খুব পছন্দ করে।

কিছুক্ষণ বসার সিট খোঁজাখুঁজি করে সিট না পাওয়ার পর অবশেষে এক কোণে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে সেই মেয়েটির আবৃত্তি শুনতে লাগলো রাতুল।

 

আবৃত্তি শুনতে শুনতে হঠাৎ রাতুল সেই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো,”কি সুন্দরী একটা মেয়ে!শ্যামলা গায়ের রং,হরিণী চোখ,লম্বা ঘন চুল,পড়নে পুরানো টাইপের একটা জর্জেট শাড়ী,নাকে নথ এবং কোকিল কন্ঠী সুমধুর কন্ঠস্বর! সব মিলিয়ে এই নারী ভীষন সুন্দরী বলা যায়!” 

 

এতক্ষণ অন্যমনষ্ক হয়ে এটি ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রাতুল মাইকিংয়ে খেয়াল করলো অন্য একজন নারীর কন্ঠস্বর,

“ধন্যবাদ নীলিমা! এতো চমৎকারভাবে আমাদের আবৃত্তি শোনানোর জন্য!” 

এটি শোনার পর রাতুল ভাবতে লাগলো ” ওহ!আচ্ছা মেয়েটির নাম তাহলে নীলিমা!” মিষ্টি একটা নাম।ইস!মেয়েটির শেষের লাইনের আবৃত্তিটুকু শোনা হলো না! রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটি আমার ভীষণ প্রিয়! যাইহোক,মেয়েটিকে বলতেই হবে তার আবৃত্তির কন্ঠস্বর বেশ সুন্দর!” এটি বলে রাতুল গ্যালারী থেকে বের হয়ে গেলো।আজ তার কি হলো সে নিজেও বুঝতে পারছে না।তার চোখে কেন জানি ঐ মেয়েটির চেহারা এবং কানে সেই মেয়েটির সুমধুর সেই কন্ঠস্বরের কথা বারবার মনে পড়ছে।সেও অবাক! কি হলো আজ!এমন তো তার কখনও হয় নি!এইসব ভাবতে ভাবতে রাতুল শিল্পকলা একাডেমীর বাইরের বাদাম গাছতলার নীচে বসে অপেক্ষা করছে নীলিমার জন্য। 

 

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর হঠাৎ রাতুল খেয়াল করলো,নীলিমা গ্যালারীর পাশের রুম থেকে বের হয়ে একাডেমীর বাইরের গেইটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। এটি দেখা মাত্রই রাতুলও খুব দ্রুত নীলিমার পেছন পেছন যেতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে নীলিমার অনেকটা কাছাকাছি যেতেই রাতুল হঠাৎ পেছন থেকে নীলিমাকে ডাক দিয়ে বলতে লাগলোঃ

– “এক্সকিউজ মি! মিস নীলিমা। শুনছেন!”

নীলিমা এটি শুনে দাঁড়িয়ে গেলো।এবং পেছন ফিরে রাতুলের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলোঃ

– “জ্বি, বলুন।” 

– ” হাই! আমি রাতুল ঘোষ।”

-“হ্যালো, আমি নীলিমা সাহা।”

– “আপনি খুব সুন্দর আবৃত্তি করেন।আপনার আবৃত্তির গলাও মিষ্টি!রবীন্দ্রনাথের নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে এই কবিতাটি আমার খুব প্রিয়।”

এটি শুনে নীলিমা হেসে উত্তর দিলোঃ

– “অনেক অনেক ধন্যবাদ!আমি জানি না আমার আবৃত্তি কেমন হয়।তবে চেষ্টা করি।”

– “চেষ্টাতেই এতোটা সুন্দর হয়! তার মানে অসাধারণ আপনার চেষ্টা!শুভকামনা রইল”

– “আবারও,ধন্যবাদ! এখন আসি।আবার দেখা হবে।আমার আজ একটু তাড়া আছে,কিছু মনে করবেন না প্লিজ !”

– “স্বাগতম।

 আরে না! মনে করার কিছু নেই! অন্য একদিন আবার কথা হবে।আমি শিল্পকলায় প্রায় সময় আসি।আপনিও কি আসেন?”

-” হ্যাঁ, আসি। মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার বিকালে। অঙ্গনের আবৃত্তি শেখার ক্লাসে।”

– “ঠিক আছে।তবে যদি কিছু মনে না করেন আপনার ফেইসবুক আইডি বা আপনার কন্ট্র্যাক নাম্বারটি কি দেয়া যাবে?” 

– “দুঃখিত,আমি অপরিচিত কাউকে আমার কন্ট্র্যাক্ট নাম্বার দিই না। তবে ফেইসবুকে এড হতে পারেন। নীলাম্বরী নীলিমা আইডি।”

রাতুল মৃদু হাসি দিয়ে বলে উঠলোঃ

– ঠিক আছে,ধন্যবাদ। তবে,আপনাকে কীভাবে চিনবো?”

– “কেনো,আমাকে এখন যেভাবে দেখেছেন, সেইভাবে! এখন,আসি হ্যাঁ, ভালো থাকবেন।”

– “ঠিক আছে এবং দুঃখিত আপনাকে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে রাখলাম।”

তার কথা শুনে নীলিমা হাসি দিয়ে বলতে লাগলোঃ

-” ঠিক আছে,সমস্যা নেই!”

এটি বলে নীলিমা শিল্পকলা একাডেমীর বাইরের গেইটের দিকে গেলো এবং একটি রিকশা নিয়ে চলে যেতে লাগলো।

অন্যদিকে রাতুল ঠাঁই দাঁড়িয়ে, মুগ্ধভরে নীলিমার চলে যাওয়া দেখতে লাগলো।মনে হচ্ছিলো যেন নীলিমা তার পূর্ব পরিচিত কেউ।এতো সাদামাটা একটি মেয়ে,এতো সাবলীল ভাষা দিয়ে মুগ্ধ করতে পারে,রাতুল যেন এই প্রথম-ই সেটা অনুভব করলো।

 

আসলে,একজন মানুষ যখন অন্য মানুষের প্রেমে পড়ে যায়,তখন সেই মানুষের মুখে “হ্যাঁ” বা “না” বলাটাও শুনতে বেশ সাবলিল বলেই মনে হয়। রাতুলের ক্ষেত্রেও তা। তবে,অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে,রাতুল যে নীলিমার প্রেমে পড়ে গিয়েছে,সেটা সে এখনও বুঝতে পারে নি। এই যেন কার্তিক মাসে শীত বা গরম,এই দুটো নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ার মতো! তবে,রাতুলের মতো এই পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে,যারা নিজেও জানে না,প্রেমের রহস্য সম্পর্কে। এই মানুষগুলো ভীষণ সহজ সরল হয়। একদম ঠিক কার্তিক মাসের বিকেল এর মতো।

 

অবশেষে,রাতুলও শিল্পকলার গেইট থেকে বেরিয়ে তার টিউশনীতে যাওয়া জন্য রিকশা খুঁজতে লাগলো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর অবশেষে একটি রিকশা পেলো। রিকশায় যাওয়ার পথে সে গুন গুন করে রবীন্দ্রনাথের “নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে” কবিতাটির শেষের চারটি লাইন আবৃত্তি করতে লাগলোঃ

” তুমি ছাড়া কেহ সাথি নাই আর

সমুখে অনন্ত জীবন বিস্তার,

কাল পারাপার করিতেছ পার

কেহ নাহি জানে কেমনে..।”

 

নীলিমার প্রতি রাতুলের আগ্রহ যেন বেড়েই চলছে।তাই সে টিউশনীতে গিয়ে তার ছাত্রকে পড়ানোর এক ফাঁকে দিয়ে সে ফেইসবুকে ঢুকলো।তারপর “নীলাম্বরী নীলিমা”নামে সার্চ দিলো। নীলিমাকে খুঁজতে রাতুলের অবশ্য বেশি দেরী হয় নি।কারণ,নীলিমার পড়নে শাড়ি এবং এক চিলতে হাসিটুকু রাতুলের মুখস্থ হয়ে গিয়েছে।তাই নীলিমার আইডিটি পাওয়া মাত্রই রাতুল তাকে রিকোয়েস্ট পাঠায় এবং মেসেঞ্জারে “হাই! নীলাম্বরী” লিখে তাকে নক দেয়।

প্রায় পাঁচ মিনিট পর রাতুলের ফোনে হঠাৎ একটা মেসেজ আসে। রাতুল ফোন অন করতেই দেখে নীলিমার মেসেজের রিপ্লাই ” হ্যালো,মিঃ রাতুল”।এটি দেখে রাতুল খুব খুশী হতে দেখা যায়।

 

এভাবেই  চলতে থাকে তাদের কথোপকথন।সপ্তাহে দুইবার শিল্পকলায়  দেখা-সাক্ষাৎ,শুরু হয় বন্ধুত্ব,শুরু হয় প্রেম,সম্পর্কের একটি নতুন নাম হয়,যার নাম “কার্তিক মাসের প্রেম।

 

                             লিখেছেনঃ কামরান চৌধুরী

টপিকঃ

Kamran Chy

Junior Content Writer

এই রকম আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close