অপরাধ জগতের গল্প

ইতিহাসের কুখ্যাত ৮ সিরিয়াল কিলার

 

পৃথিবীতে যতগুলো অদ্ভুত আর নির্মম পেশা রয়েছে তার ভেতর সিরিয়াল কিলিং-কে এক নাম্বার হিসেবে ধরা হয়। কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে আরেকজন নিরপরাধ মানুষকে খুন করা সম্ভব নয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এর গবেষণায় দেখা গেছে, সিরিয়াল কিলাররা সাধারণত রাগ, উত্তেজনা, অর্থের প্রভাব ইত্যাদি কারণে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় সিরিয়াল কিলাররা একই নিয়মে তাদের হত্যার কাজ করে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিরিয়াল কিলারদের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় সিরিয়াল কিলারের সংখ্যা বেশী। আমেরিকার সিরিয়াল কিলাররা বেশীরভাগ সাদা বর্ণের পুরুষ, যাদের বয়স ২০-৩০ এর মধ্যে। সিরিয়াল কিলার পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদেরও হতে দেখা যায়। তবে মেয়েদের সংখ্যা খুবই নগণ্য।

জিল দ্য রাই

জিলকে পৃথিবীতে আধুনিক সিরিয়াল কিলারদের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ১৪০৪ সালে ফ্রান্সে এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের জন্ম হয়। তার পুরো নাম জিল দ্য রাই। জিল নিজ হাতে প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল যাদের বেশিরভাগই ছিল বালক শিশু এবং এরা সবাই ছিল ব্লন্ড চুল ও নীলচোখের অধিকারী। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে জিল নিজেও ছেলে বেলায় এদের মতোই ব্লন্ড চুল ও নীল চোখের অধিকারী ছিলেন। ধারণা করা হয় জিল তার যৌন ইচ্ছা পূরণ করতে এসব নিরীহ শিশুদের উপর পাশবিক অত্যাচার করতো এবং এরপর তাদের হত্যা করতো। হত্যার করার পর সে বেশিরভাগ শিশুকেই আগুনে পুড়িয়ে ফেলত। জিলের শিকারের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি কিন্তু ধারণা করা হয় তার শিকার সংখ্যা প্রায় ৮০ থেকে ২০০ জন বালক ছিল। আবার কারও কারও মতে এর সংখ্যা ৬০০ জনেরও বেশী। তিনি যাদের হত্যা করেছিলেন তাদের বয়স ছিল ৬-১৬ বছরের মধ্যে। জিলের এক চাকর হ্যানরিয়েট, মনিবের জন্য শিশুদের সংগ্রহ করে নিয়ে আসতো। জিলের পাশবিক কাজ শেষে তারা শিশুগুলোকে একটি রুমে নিয়ে হত্যা করতো এবং জিল এই শিশুদের রক্তে গোসল করতো বলে শোনা যায়। হ্যানরিয়েট যখন বাচ্চাদের উপর অত্যাচার করতো তখন জিল বাচ্চাদের চিৎকার ও আর্তনাদ শুনে আনন্দ পেত। জিলের সবচেয়ে আনন্দ হতো যখন অত্যাচারের কারণে বাচ্চাদের শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে যেত। বাচ্চাদের শরীরে আঘাত করার ফলে তাদের শিরা ফেটে রক্ত যখন জিলের গায়ে লাগত তখন জিলের মন আনন্দে ভরে উঠতো। একের পর এক আঘাতে যখন বাচ্চারা মারা যেত তখন হ্যানরিয়েট ঘর পরিষ্কার করে ফেলতো এবং মৃত বাচ্চাদের শরীর তাদের পোশাক সহ আগুনে পুড়িয়ে ফেলতো। সিরিয়াল কিলারে নাম লেখানোর আগে জিল ছিল সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। জিল দ্য রাইকে তার অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে ১৪৪০ সালের ২৬ অক্টোবর বুধবার তার ৩৬ বছর বয়েসে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

জন ওয়েনি গেসি

জন ওয়েনি গেসি দ্য কিলার ক্লাউন নামে পরিচিত। তবে প্রতিবেশীরা তাকে একজন মজার মানুষ ও সম্মানীত একজন ব্যবসায়ী হিসেবেই জানত। ক্লাউনের পোশাক পরে বিভিন্ন উৎসবে সবাইকে মজা দিতে তার জুড়ি ছিল না। অথচ এমন মজার মানুষের ভেতরে যে একটা অমানুষের বাস ছিল তা কারো জানা ছিল না। ১৯৬৮ সালে দুইজন যুবককে যৌন নির্যাতনের জন্য গ্রেফতার হন গেসি। আদালত সে বিচারে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু অতি অমায়িক আচার-ব্যবহারের জন্য মাত্র ১৮ মাসে প্যারোলে মুক্তি পান। অনেকে বলেন হয়তবা জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য এটাই ছিল তার অস্ত্র। জেল থেকে বের হয়েই বিয়ে করেন। কিন্তু নিজেকে ভাল করতে পারেনি সে। সমকামী এ সিরিয়াল কিলার নিজের বাসা ও গাড়িতে তরুণী ও যুবকদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়াতেন এবং কাজ শেষে হত্যা করতেন। বাসায় কাউকে নিয়ে এলে তাকে খুন করে বাসার আঙ্গিনাতেই মাটিচাপা দিয়ে রাখতেন। আর বাইরে কাউকে খুন করে মৃতদেহ নদীতে ফেলে দিতেন। গ্রেফতারের পর তার আঙিনা থেকে বের হয় মানুষের হাড়গোড়। আদালতে গেসি নিজের দোষ স্বীকার করেন। ১৯৯৪ সালে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি দেওয়া হয়।

জেফরি ডামার

জেফরি ডামারের জন্ম ১৯৬০ সালে। কুখ্যাত এ সিরিয়াল কিলার ১৮ বছর বয়সে তার জীবনের প্রথম খুন করেন ১৯ বছর বয়সী স্টিভেন হিকসকে। সে স্টিভেনকে তার বাড়িতে ডেকে আনার পরে তাকে হত্যা করেছিল। জেফরির শিকার সংখ্যা ১৭টিরও বেশি এবং সত্যিকার অর্থেই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল বিভীষিকাময়। তার হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে হতে ১৯৯১ সালের মধ্যে। তবে প্রধান হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছিল ১৯৮৯-১৯৯১ সালের মধ্যে। ১৯৮৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরে ডামারকে যৌন হয়রানির অভিযোগে প্রথম গ্রেফতার করা হয়। বিচারে তার এক বছর সাজা হয় এবং তাকে মেন্টাল থেরাপি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। পরবর্তীতে ৫ বছর সন্তোষজনক আচার-আচরণের শর্তে তাকে প্রবেশনে মুক্তিও দেওয়া হয়। কিন্তু মুক্তির পরপরই সে পুনরায় হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। ১৯৯১ সালের ২৭ মে সকালে দেখা যায় সিনথাসোমফোন নামের ১৪ বছরের এক বালক নগ্ন অবস্থায় দ্বিগবেদিক ঘোরাফেরা করছে। যার শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্নও আছে। পুলিশ আসলে ডামার পুলিশকে জানায় তাদের মধ্যে মদ পানের সময় ঝগড়া হয়েছে। বালকটির প্রতিবাদ সত্ত্বেও পুলিশ বালকটিকে ডামারের পাশ থেকে সরিয়ে দেয়। কারণ তারা ডামারের প্রতি কোনও সন্দেহ অনুভব করেনি। কিন্তু সেই রাতের পরে ডামার সিনথাসোমফোনকে হত্যা করেছিল এবং তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। ১৯৯১ সালে ডামার প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক জনকে হত্যা করেছিল। বিচারে ডামারকে ৯৩৭ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারের সময় ডামার কারাবাসের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ড কামনা করেছিল। ১৯৯৪ সালের ২৮ নভেম্বর জিমে কর্মরত অবস্থায় ক্রিস্টোফার স্কেভার নামক এক কয়েদির মারাত্মক পিটুনিতে ডামার মারাত্নক আহত হয়। হাসপাতালে নেয়ার পথে এম্বুলেন্সে ডামারের মৃত্যু হয়।

জেফরি ডামার
আন্দ্রেই চিকাটিলো

ইউক্রেইনে জন্ম নেয়া এই সিরিয়াল কিলার সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত খুনি। ” বুচার অব রুস্তভ”, এবং “রেড রিপার” শিরোনামগুলো কেবল তার নামের পাশেই মানায়। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫৩ জন নারী এবং শিশুকে নির্মমভাবে খুন করে কসাইখ্যাত এই খুনী। তার খুনের পদ্ধতিও ছিল অতি নির্মম। খুন করার সময় নারীদের ধর্ষণ করত সে। ধর্ষণ করা অবস্থাতেই ভিকটিমদের আস্তে-আস্তে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিত চিকাটিলো। নারীরা যখন প্রাণ ভিক্ষা করত, সেই দৃশ্যটা তাকে আরও উত্তেজিত করে তুলত। তার ভাষায় ওই নারীরাই নিজেদের মৃত্যু ডেকে আনত। ১৯৯২ সালে সোভিয়েত সরকার তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে।

হেনরি লি লুকাস

হেনরি লি লুকাস বিখ্যাত এই লেডি কিলারের জীবনী নিয়ে পোর্ট্রটে অব এ সিরিয়াল কিলার নামের হলিউডে সিনেমা তৈরি হয়েছিল। হেনরি লুকাস নিজের মাকে হত্যা করে ১০ বছর জেলে ছিল। জেল থেকে বের হয়ে আরেকজন সঙ্গী নিয়ে একের পর এক খুন করে গেছে। প্রায় ২০ বছরে ৬০০ জনকে হত্যা করেছে বলে আদালতে স্বীকার করেছে। পুলিশ ৩৫০ জনকে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে। ২০০১ সালে হেনরি কারাগারেই মারা যায়।

টেড বান্ডি

টেড বান্ডিকে বলা হয় আমেরিকার সবচেয়ে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার। ইতিহাসে্র স্বরণীয় এই সিরিয়াল কিলারের জন্ম ১৯৪৬ সালে। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত অসংখ্য নিরপরাধ তরুণীকে খুন করে সে। টেড দেখতে অত্যন্ত সুদর্শন ছিল। তার ভিকটিম তরুণীদের সাথে তার পরিচয় হতো পাবলিক প্লেসগুলোতে। যে তরুণীকে সে টার্গেট করত, তার সামনে গিয়ে অসুস্থ হওয়ার ভান করত কিংবা একজন পুলিশম্যানের অভিনয় করতো সে। তার গাড়িতে সবসময় শাবল থাকত। যার মাধ্যমে ভিকটিমকে মারা হত। মেরে ফেলার আগে ভিকটিমকে টেড ধর্ষণ করত। মেরে ফেলার পর তরুণীর সাথে আবার যৌন সম্পর্ক স্থাপন করত সে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত ৩০ জনের বেশি তরণীকে খুন করে টেড। পরবর্তীতে তাকে ইলেক্ট্রিক্যাল চেয়ারে শক দিয়ে মারা হয়।

ক্যাথরিন নাইট

ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম নারী হিসেবেই গণ্য করা হয় ক্যাথরিন নাইটকে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করে ক্যাথরিন নাইট। পরবর্তীতে যাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় মৃত্যুর বিধান না থাকায়। তার বাবা ছিলেন একজন মদ্যপ। প্রকাশ্যে তিনি তার স্ত্রীকে দিনে ১০ বার পর্যন্ত ধর্ষণ করেছিলেন। বাবার মতো মেয়েও ছিল ভয়ঙ্করী । ক্যাথরিন তার প্রথম স্বামীর দাঁত উপড়ে ফেলার পর তার হিংস্রতার প্রমাণ আসতে শুরু করে। যখন দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয় তখন তিনি তার স্বামীর আট সপ্তাহ বয়সী একটি কুকুরের জিহ্বা কেটে নেন এবং পরে কুকুরের চোখ তুলে ফেলেন। কয়েক মাস পরে জন চার্লস প্রাইস নামে একজনের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রাইস অনেক ধন সম্পদের মালিক ছিলেন। ক্যাথরিনের হিংস্রতা সম্বন্ধে আগে থেকেই প্রাইস অবহিত ছিলেন। প্রাইসের সঙ্গে সম্পর্কের কিছু দিনের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এই ক্যাথরিন। একপর্যায়ে ক্যাথরিন ৩৭ বার ছুরিকাঘাতে প্রাইসকে হত্যা করে। এরপর প্রাইসের মৃতদেহের চামড়া ছাড়িয়ে বেডরুমের দরজার পেছনের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে। শুধু তাই নয়, প্রাইসের মৃতদেহ থেকে মাথা কেটে নিয়ে সেটা দিয়ে স্যুপ রান্না করে বাচ্চাদের জন্য রেখে বাইরে চলে যান ক্যাথরিন। কিন্তু বাচ্চারা বাড়ি ফেরার আগেই পুলিশ এসে হতভাগ্য প্রাইসের মরদেহ উদ্ধার করে। তখন মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় তাকে প্যারল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

হ্যারল্ড শিপম্যান

হ্যারলড শিপম্যান কে বলা হয় ড. ডেথ। ইতিহাসের এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার পারিবারিক জীবনে বিবাহিত ছিলেন। এবং তিনি ব্রিটেনের একজন জনপ্রিয় চিকিৎসকও ছিলেন বটে। কিন্তু এই ডাক্তার সাহেব ২১৮ জনকে হত্যা করেন। কারো কারো মতে এর সংখ্যা ২৫০ ও হতে পারে। শিপম্যান তার প্রথম খুন করেন ১৯৭২ সালে। তিনি প্রথমে যেই চেম্বারে প্র্যাকটিস করতে সেখানে তিনি তারই ৭১ জন রোগীকে খুন করেন। সেখান থেকে কিছু বছর পর আরেক জায়গায় চেম্বার খুলে এবং সেখানে তার শিকার হয় আরো অনেকে। তার শিকার হত বয়ষ্ক নারীরা। ২০০০ সালে তাকে ১৫ জনকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার কয়া হয়। এবং আজীবন কারাদন্ডে দণ্ডিত করা হয়। ২০০৪ সালে জেলে তিনি আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনো সে তার হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করেনি।

টপিকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close